যুদ্ধ ভুলে নতুন সম্পর্ক চায় আফগানিস্তান, ১ ট্রিলিয়ন ডলারের খনিজ সম্পদে মার্কিন বিনিয়োগের আহ্বান
আফগানিস্তানের খনিজ, কৃষি ও বাণিজ্য খাতে বিনিয়োগের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে তালেবান সরকার। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাবুলের সম্পর্ক পুনর্গঠনের প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে এই প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
তালেবানের অন্তর্বর্তী পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকি এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, খনি, অবকাঠামো, কৃষি ও বাণিজ্য খাতে মার্কিন বিনিয়োগকে আফগানিস্তান 'অবশ্যই' স্বাগত জানাবে।
তিনি বলেন, 'আফগানিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ককে গত ২০ বছরের যুদ্ধের দৃষ্টিতে দেখা উচিত নয়। বরং ভবিষ্যতের সহযোগিতার ভিত্তিতে এই সম্পর্ক মূল্যায়ন করা উচিত।'
মুত্তাকির এ বক্তব্যের বিষয়ে হোয়াইট হাউস তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি।
এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে আফগানিস্তানের বিপুল খনিজ সম্পদের দিকে নজর দিয়েছিলেন। ২০১৭ সাল পর্যন্ত আফগানিস্তানে যুদ্ধ ও পুনর্গঠনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ১১৭ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপের এক গবেষণায় আফগানিস্তানে ১ ট্রিলিয়নের বেশি মূল্যের খনিজ সম্পদের মজুত থাকার কথা বলা হয়েছে। তালেবানের মতে, এসব সম্পদ কাজে লাগানো হলে দেশটির অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার ভিত্তি তৈরি হতে পারে।
আফগানিস্তানে সোনা, রুপা ও প্লাটিনামের পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ লৌহ আকরিক, ইউরেনিয়াম, দস্তা, ট্যান্টালাম, বক্সাইট, কয়লা, প্রাকৃতিক গ্যাস ও তামার মজুত রয়েছে। বিশ্বজুড়ে নতুন সমৃদ্ধ তামার খনির সংকট দেখা দেওয়ায় দেশটির তামার মজুত বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
মুত্তাকি বলেন, 'আমাদের অর্থনৈতিক নীতি উন্মুক্ত।' ২০২১ সালে ক্ষমতা দখল করা কট্টর ইসলামপন্থী গোষ্ঠীটি এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়ার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে আবারও বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহার করার পর ২০২১ সালে তালেবান ক্ষমতায় ফিরে আসে। সে সময় তারা ১৯৯০-এর দশকের শেষ ভাগ ও ২০০০-এর দশকের শুরুর তুলনায় আরও উদারভাবে দেশ পরিচালনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। ওই সময় আফগানিস্তানে প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর, ওসামা বিন লাদেনকে আশ্রয় দেওয়া এবং বামিয়ান বুদ্ধমূর্তি ধ্বংসের মতো ঘটনা ঘটেছিল।
তবে ২০২১ সালে ক্ষমতা দখলের পর নারী ও মেয়েদের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে তালেবান। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, প্রায় ২৫ লাখ মেয়ে মাধ্যমিক স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সুযোগ থেকে বঞ্চিত। নারীদের চলাফেরার স্বাধীনতাও সীমিত করা হয়েছে।
জাতিসংঘের নারী বিষয়ক সংস্থা ইউএন উইমেনের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে আফগানিস্তানের অর্ধেক নারী মাসে মাত্র এক বা দুবার বাড়ির বাইরে যান। তালেবানের দাবি, তারা ইসলামী শরিয়াহ অনুযায়ী নারীদের অধিকারকে সম্মান করে।
ক্ষমতা দখলের পাঁচ বছর পরও তালেবান সরকার আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নয়। এখন পর্যন্ত শুধু রাশিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের সরকারকে স্বীকৃতি দিয়েছে।
তবে চীন, পাকিস্তান, ভারত ও ইরানের মতো কয়েকটি দেশ নিরাপত্তার নিশ্চয়তার বিনিময়ে আফগানিস্তানের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ চুক্তি করেছে। তালেবানের দাবি, গত পাঁচ বছরে চীন ও ইরানসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে তারা ৭ বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের খনি বিনিয়োগ চুক্তি করেছে। এসব চুক্তির আওতায় রয়েছে সোনা, মূল্যবান পাথর ও ইস্পাত তৈরিতে ব্যবহৃত ক্রোমাইটের খনি।
এদিকে, তালেবান সরকারের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র এখনো দূরত্ব বজায় রেখেছে। তবে আফগানিস্তানে ফেলে যাওয়া মার্কিন সামরিক সরঞ্জাম ফেরত পাওয়ার বিষয়ে তালেবানের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে ওয়াশিংটন।
মুত্তাকি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সরঞ্জাম ও অবকাঠামোর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মার্কিন দাবিও প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেন, আফগানিস্তানের সব সামরিক ও বেসামরিক স্থাপনা, এমনকি বাগরাম বিমানঘাঁটিও দেশটির জাতীয় সম্পদ।
তবে কাবুলে মার্কিন দূতাবাস পুনরায় চালুর জন্য ওয়াশিংটনকে স্বাগত জানানোর ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি। মুত্তাকি বলেন, তালেবান কর্মকর্তারা দূতাবাসের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছেন, সড়ক সংস্কার করেছেন এবং সেখানে নতুন গাছ লাগিয়েছেন।
তিনি বলেন, এলাকাটি এখন 'খুবই প্রাণবন্ত ও আকর্ষণীয়'।
