ফিকে হচ্ছে মোদির দেখানো উন্নত ভারতের স্বপ্ন, বাস্তবতার সঙ্গে বাড়ছে ফারাক
চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিক শেষে ভারতের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৭.৮ শতাংশ হয়েছে, বলে জানিয়েছে দেশটির সরকার। এটি বিশ্বের অনেক বড় অর্থনীতির জন্য ঈর্ষণীয়ও বটে। তবে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দেশটিকে 'উন্নত রাষ্ট্রে' পরিণত করার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তা অর্জনে এই প্রবৃদ্ধির হারও যথেষ্ট নাও হতে পারে।
ব্রিটিশ শাসন থেকে স্বাধীনতার শতবর্ষ, অর্থাৎ ২০৪৭ সালের মধ্যে ভারতকে উন্নত দেশের মর্যাদায় নিয়ে যেতে চান মোদি। তবে বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহত্তম এই অর্থনীতিকে সে লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে—আগামী ২১ বছর ধরে টানা প্রতি বছর গড়ে ৯.২৫ শতাংশ হারে জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে। এমনটাই জানিয়েছেন দেশটির শীর্ষ সরকারি থিঙ্ক ট্যাঙ্ক 'নীতি আয়োগ'-এর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা অশোক লাহিড়ী।
'বিকশিত ভারত' বা উন্নত ভারত গড়ার এই উচ্চাকাঙ্ক্ষা মোদির টানা তৃতীয় মেয়াদের মূল এজেন্ডা হয়ে উঠেছে। তবে একাধিক অর্থনীতিবিদের মতে, প্রবৃদ্ধির বর্তমান গতিধারা বজায় থাকলে মোদির এই ভিশন বা স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে।
২০০০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ভারতের গড় জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৬.৩ শতাংশ, যা দেশটির বর্তমান সম্ভাব্য প্রবৃদ্ধির হার (৭.৫ থেকে ৮ শতাংশ) থেকেও কম। অন্যদিকে, বিগত ৫০ বছরে ভারতের অর্থনীতি মাত্র তিনবার ৯.২৫ শতাংশ বা তার বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পেরেছে—১৯৭৫, ১৯৮৮ এবং ২০২১ সালে।
অক্সফোর্ড ইকোনমিক্স-এর অর্থনীতিবিদ আলেকজান্দ্রা হারমান প্রসাদ বলেন, "এই লক্ষ্য অর্জন করতে হলে প্রবৃদ্ধিতে অস্বাভাবিক ও ধারাবাহিক দ্রুত গতি আনতে হবে। তবে অর্থনীতির পরিধি যত বড় হতে থাকবে এবং মূল ভিত্তি প্রসারিত হবে, ততই এই উচ্চ প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।"
গত রোববার শিকাগোয় এক অনুষ্ঠানে ভারতের অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন পুনর্ব্যক্ত করেছেন যে, চলতি অর্থবছরে ভারতের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশ বা তার বেশি বজায় থাকবে, যে হার মহামারির পর থেকেই ধরে রেখেছে দেশটি। এটি রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার (আরবিআই) অনুমিত ৬.৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসের চেয়েও বেশি।
তবে অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলছেন, প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশের নিচে থাকলে ভারত 'মাঝারি আয়ের ফাঁদে' পড়তে পারে। এই অবস্থায়, উৎপাদনশীলতা ও দক্ষতার পর্যাপ্ত উন্নয়ন ঘটার আগেই— মজুরি বেড়ে যাওয়ায় একটি দেশ তার কম খরচ উৎপাদনের প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা হারিয়ে যায়।
ভারতের উচ্চ আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার দৌড়ে ব্যবধান এখনও অনেক। নীতি আয়োগের কর্মকর্তা অশোক লাহিড়ীর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ভারতের মাথাপিছু আয় ছিল ২,৮১৩ মার্কিন ডলার। ২০৪৭ সালের মধ্যে উচ্চ আয়ের দেশের সীমা অতিক্রম করতে—এই আয় প্রায় ছয় গুণেরও বেশি বাড়িয়ে ১৮ হাজার ডলারে উন্নীত করতে হবে।
বিনিয়োগ সংকট ও বৈদেশিক মুদ্রার ঝুঁকি
ওভারসি-চায়নিজ ব্যাংকিং কর্পোরেশনের (ওসিবিসি) অর্থনীতিবিদ লাবণ্য ভেঙ্কটেশ্বরন বলেন, ভারতীয় অর্থনীতিতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি রয়েছে। তিনি ভারতের চলতি হিসাব ও বাজেট ঘাটতির পাশাপাশি বৈদেশিক বাণিজ্যের ভারসাম্য বজায় রাখতে অস্থির মূলধন প্রবাহের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতাকে অন্যতম ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
আর এ কারণেই আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে ভারতের আকর্ষণ কিছুটা কমেছে। চলতি বছরে এশিয়ায় সবচেয়ে খারাপ পারফর্ম করা মুদ্রাগুলোর একটি ভারতীয় রুপি। ব্যাংক অব আমেরিকা কর্পোরেশনের আগস্ট মাসের জরিপ অনুযায়ী, ফান্ড ম্যানেজারদের পছন্দের তালিকায় এশিয়ার সর্বনিম্ন পর্যায়ে থাকা ইন্দোনেশিয়ার স্থান দখল করেছে ভারত।
উৎপাদন খাত ও রপ্তানিতে ২ শতাংশ স্থবিরতা
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই পরিস্থিতি উত্তরণের অন্যতম প্রধান উপায় হলো ম্যানুফ্যাকচারিং বা উৎপাদন খাতের প্রসার ঘটানো। মোদি সরকারের এজেন্ডায় বিষয়টি থাকলেও—এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ভারতের জিডিপিতে এই খাতের অবদান ১৬ থেকে ১৭ শতাংশের আশপাশেই থমকে আছে, যেখানে মোদির লক্ষ্য ছিল এটিকে ২৫ শতাংশে নিয়ে যাওয়া।
অর্থনীতিবিদরা আরও বলছেন, উচ্চপ্রযুক্তির পণ্যের রপ্তানি বাড়ানো, বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত করা এবং আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো—অর্থনৈতিক গতি ত্বরান্বিত করার অন্যান্য উপায়। বৈশ্বিক পণ্য রপ্তানিতে ভারতের অংশীদারত্ব বর্তমানে ২ শতাংশেরও কম, যেখানে চীনের শেয়ার ১৪ শতাংশের বেশি। শিল্পভিত্তিক পরাশক্তিতে পরিণত হতে ভারতকে যে বিশাল ব্যবধান পার হতে হবে, এটি তারই প্রমাণ।
এর পাশাপাশি উৎপাদন খাতে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করা ভারতের জন্য অপরিহার্য। গত সপ্তাহে ভারতের দুজন শীর্ষ মন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও জাপানের আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে দেশের প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা তুলে ধরে নতুন পুঁজি অনুসন্ধানে সফর করেছেন। ভারত রেকর্ড পরিমাণ প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) টানতে পারলেও সেই মূলধন ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো বিদেশে তাদের বিনিয়োগ বাড়িয়েছে এবং ভারতীয় স্টার্টআপে পূর্বে বিনিয়োগ করা বিদেশি উদ্যোক্তারা তাদের মুনাফা তুলে নিচ্ছেন।
অভ্যন্তরীণ সঞ্চয় ও কর্মসংস্থানের সংকট
ভারতের এই উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রবৃদ্ধিতে অর্থায়নের ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ সঞ্চয়ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদিও ভারতের সঞ্চয়ের হার বৈশ্বিক গড়ের চেয়ে বেশি, তবে এশিয়ার অন্যান্য প্রতিযোগী দেশের তুলনায় তা পিছিয়ে এবং চীনের চেয়ে বহুগুণ কম। জনগণের অপেক্ষাকৃত কম আয়ের কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় মেটানোর পর পরিবারগুলোর পক্ষে বড় অংকের সঞ্চয় করা কঠিন হয়ে পড়ে।
এর বড় প্রভাব রয়েছে অর্থনীতিতে; কারণ অভ্যন্তরীণ সঞ্চয় হলো নতুন কারখানা, অবকাঠামো এবং অন্যান্য বিনিয়োগ তহবিলের জন্য অপেক্ষাকৃত সস্তা মূলধনের উৎস। সঞ্চয় অব্যাহতভাবে কমতে থাকলে প্রয়োজনীয় প্রবৃদ্ধির অর্থায়নে ভারতকে ব্যয়বহুল ঋণ বা বৈদেশিক মূলধনের ওপর বেশি নির্ভর করতে হবে।
অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, মানসম্মত কর্মসংস্থান ও দক্ষতার উন্নয়ন না হলে আগামী তিন দশক ধরে পেতে যাওয়া 'ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড' বা তরুণ জনসংখ্যার জনমিতিক সুবিধা হাতছাড়া হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে ভারত। ২০২১ সালের জরিপের ওপর ভিত্তি করে প্রকাশিত নীতি আয়োগের এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী প্রায় ৮ কোটি ৭০ লাখ ভারতীয় কোনো কাজ, শিক্ষা বা প্রশিক্ষণের সঙ্গে যুক্ত নেই। মানসম্মত চাকরির অভাবে কর্মক্ষম জনসংখ্যার প্রায় ৬০ শতাংশ আত্মকর্মসংস্থানে বাধ্য হয়েছে, যার বড় একটি অংশ জড়িয়ে আছে অপেক্ষাকৃত কম আয়ের কৃষি খাতে।
গ্লোবালডাটা.টিএস লম্বার্ড-এর প্রধান অর্থনীতিবিদ শুশমিতা দেবেশ্বর বলেন, "ভারতের ম্যাক্রো-অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং সংস্কারমুখী দাবিদার সরকারের উপস্থিতির পরও—কেন বছরের পর বছর বিনিয়োগ চক্র প্রাথমিক পর্যায়ে থমকে আছে এবং নিট এফডিআই কেন প্রায় শূন্যের কাছাকাছি—এই মৌলিক প্রশ্নগুলো তোলা জরুরি। তরুণ ও ক্রমবর্ধমান কর্মীবাহিনীর জন্য কেন পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না?"
তিনি আরও যোগ করেন, বেসরকারি বিনিয়োগ এবং দ্রুত কর্মসংস্থান সৃষ্টি ছাড়া ৬ শতাংশের বেশি জিডিপি প্রবৃদ্ধি বজায় রাখাই একটি কঠিন পরীক্ষা হবে; আর দেশকে উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করতে প্রয়োজনীয় ৮ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন তো অনেক দূরের কথা।
