প্রস্তাব ফিরিয়েও চাপের মুখে সিদ্ধান্ত বদল, উদ্ধারকাজে বিদেশি সহায়তা নেবে নেপাল
আকস্মিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় আন্তর্জাতিক তল্লাশি ও উদ্ধারকারী দলের সহায়তা না নেওয়ার প্রস্তাব প্রথমে ফিরে এলেও পরে সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে নেপাল।
এ দুরযগে নিখোঁজ হয়েছেন বহু বিদেশি পর্যটক। কাঠমান্ডু বিদেশি সাহায্যের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিলে ওই নিখোঁজ পর্যটকদের দেশের তীব্র কূটনৈতিক তীব্র কূটনৈতিক চাপের মুখে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছে নেপাল সরকার।
বুধবার নেপাল সরকার জানিয়েছিল, তল্লাশি ও উদ্ধার অভিযান পরিচালনায় তাদের নিজস্ব উদ্ধারকারীরাই যথেষ্ট সক্ষম এবং তারা অন্য কোনো দেশের উদ্ধারকারীদের কাজের সুযোগ দেবে না। তবে সেই সিদ্ধান্ত একদিনও টেকেনি।
সুড়ঙ্গে উদ্ধারকাজ, ডিএনএ পরীক্ষা ও ফরেনসিক পর্যালোচনার মতো বিশেষ ক্ষেত্রগুলোতে সীমিত পরিসরে বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সহায়তা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দেশটির প্রশাসন।
নেপালের একজন ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তা দ্য কাঠমান্ডু পোস্টকে বলেন, 'বন্যার পর বিভিন্ন দেশের নাগরিক নিখোঁজ হওয়ায় অন্তত তল্লাশি ও উদ্ধারকারী দল এবং কিছু বিশেষজ্ঞকে কাজ করার সুযোগ দিতে আন্তর্জাতিক মহল থেকে আমাদের ওপর ব্যাপক চাপ আসছিল। তাই আমরা নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে সীমিতসংখ্যক বিশেষজ্ঞকে কাজ করার অনুমতি দিচ্ছি।'
ভোটকোশি ও ত্রিশূলি নদীর তীরবর্তী জনবসতিগুলোকে লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছে এই ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা। শুক্রবার পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, দুর্যোগে মৃতের সংখ্যা ৫৭০ ছাড়িয়েছে, এখনও নিখোঁজ রয়েছেন প্রায় ২ হাজার মানুষ। নিখোঁজদের মধ্যে ৩১টি দেশের ৫১৭ জন বিদেশি নাগরিক রয়েছেন।
নেপাল ট্যুরিজম বোর্ডের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, নিখোঁজদের মধ্যে ভারতীয় নাগরিকের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি—১৭৮ জন। এছাড়া ৬৫ জন মার্কিন, ৫৩ জন ইউক্রেনীয়, ৩৫ জন অস্ট্রেলীয় ও ৩৩ জন ব্রিটিশ নাগরিকসহ অন্যান্য দেশের নাগরিকরাও নিখোঁজ রয়েছেন।
জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কেন্দ্রের মূল্যায়নের ভিত্তিতে আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় কমিটির মাধ্যমে ভারত, চীন, অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়াকে তাদের বিশেষজ্ঞ দল পাঠানোর সবুজ সংকেত দিয়েছে নেপাল সরকার। এই দলগুলোতে সুড়ঙ্গে উদ্ধারকাজ, ডিএনএ পরীক্ষা ও ফরেনসিক পর্যালোচনায় অভিজ্ঞ কারিগরি বিশেষজ্ঞরা থাকবেন।
আরও বেশ কয়েকটি দেশ নেপালকে ত্রাণ সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি নিজস্ব বিশেষজ্ঞ দল পাঠানোর ইচ্ছা প্রকাশ করেছলেও নেপাল তাদের অনুরোধে এখনও সাড়া দেয়নি। কাঠমান্ডুতে অবস্থিত অন্তত দুটি দেশের দূতাবাসের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যাদের কয়েক ডজন নাগরিক নিখোঁজ রয়েছেন, তারা উদ্ধার অভিযানে সহায়তা করার জন্য নিজ দেশের উদ্ধারকারী দল পাঠাতে অনুমতি চেয়ে আসছিলেন। কিন্তু নেপালের তরফ থেকে এখনো ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়নি।
এদিকে কিছু দেশ প্রকাশ্যেও নেপালকে তল্লাশি ও উদ্ধার অভিযানে সহায়তার প্রস্তাব দিয়ে আসছে। শুক্রবার ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল জানান, ভারত একটি সুড়ঙ্গ উদ্ধারকারী দল, একটি মেডিকেল টিম ও তাদের ন্যাশনাল ডিজাস্টার রেসপন্স ফোর্সের (এনডিআরএফ) দল পাঠাতে প্রস্তুত রয়েছে।
একই দিনে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করও এই দুর্যোগ নিয়ে নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খনালের সঙ্গে কথা বলেছেন।
জয়শঙ্কর জানান, নেপালে চতুর্থ দফার ত্রাণসামগ্রী পাঠানোর সময় চিকিৎসক, প্যারামেডিক ও সুড়ঙ্গে উদ্ধারকাজে অভিজ্ঞদের নিয়ে গঠিত ১১ সদস্যের একটি দলও পাঠানো হয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়াও প্রকাশ্যে বাড়তি সহায়তা দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। বৃহস্পতিবার দক্ষিণ কোরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী চো হিউন নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খনালের সঙ্গে কথা বলেন। এ সময় নেপালে থাকা তাদের নাগরিকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।
তবে নেপালি কর্তৃপক্ষ বলেছে, তারা কেবল প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রগুলোতেই বিদেশি সহায়তা নেবে। খনাল কাঠমান্ডু পোস্টকে বলেন, 'সহায়তা নেওয়ার জন্য আমরা তিনটি নির্দিষ্ট ক্ষেত্র চিহ্নিত করেছি; সে অনুযায়ী আন্তর্জাতিক সাহায্য চাওয়া হচ্ছে।'
চার দেশের বিশেষজ্ঞ দলকে রাসুয়া ও নুয়াকোট জেলায় জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধারের অনুমতি দেওয়া হবে।
নেপালের ল্যাবরেটরিগুলোতে ডিএনএ পরীক্ষার সক্ষমতা সীমিত হওয়ায় মৃতদেহ শনাক্তকরণে ওই দেশগুলোর পৃথক বিশেষজ্ঞ দল সহায়তা করবে।
খনাল বলেন, 'আমাদেরকে বিপুলসংখ্যক নমুনার ডিএনএ পরীক্ষা করতে হবে। বিদেশি বিশেষজ্ঞরা দ্রুত মরদেহ শনাক্ত করতে আমাদের সহায়তা করবেন, যাতে আমরাসময়মতো সেগুলো স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করতে পারি।'
এর আগে বাংলাদেশ, ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপানের মতো দেশগুলো উদ্ধারকারী পাঠানোর প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিল নেপাল। এর বদলে নেপাল নগদ অর্থ সহায়তা চেয়েছিল। কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, উদ্ধারকারী দল পাঠানোর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের কারণ অতীত অভিজ্ঞতা।
নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছিলেন, ২০১৫ সালের ভূমিকম্পের অভিজ্ঞতার আলোকেই নেপাল সরকার উদ্ধারকারী দল পাঠানোর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। সেবার বিদেশি তল্লাশি ও উদ্ধারকারী দলের ঢল এবং দেশগুলোর মধ্যকার প্রতিযোগিতার কারণে সমন্বয় ও ব্যবস্থাপনায় মারাত্মক সমস্যা দেখা দিয়েছিল।
নেপালের সেনাবাহিনী ও পুলিশের সুপারিশের ভিত্তিতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
