বিকিরণজনিত ক্যানসারে মৃত্যুঝুঁকি সবচেয়ে বেশি পাইলট ও ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্টদের: গবেষণা
নতুন এক গবেষণায় বলা হয়েছে, বিকিরণজনিত ক্যানসারে মৃত্যুর ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্ট ও পাইলটদের। এমনকি তেজস্ক্রিয় পদার্থ নিয়ে কাজ করা মানুষের তুলনায়ও এই দুই পেশাজীবীদের বিকিরণজনিত ক্যানসারে আক্রান্তের ঝুঁকি বেশি।
মহাজাগতিক বিকিরণ মহাকাশ থেকে আসে। এর সামান্য পরিমাণ পৃথিবীর ভূপৃষ্ঠে পৌঁছায়। তবে বেশি উচ্চতায় উড়োজাহাজে চলাচলকারী ব্যক্তিরা এই বিকিরণের বেশি সংস্পর্শে আসেন।
ছোট পরিসরের কয়েকটি গবেষণায় সীমিত প্রমাণ পাওয়া গেছে, এই বিকিরণের সংস্পর্শে ঘন ঘন উড়োজাহাজে চলাচলকারী ব্যক্তিদের, বিশেষ করে পাইলট ও ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্টদের, ক্যানসারে মৃত্যুর হার বাড়তে পারে।
গবেষণাটির সঙ্গে প্রকাশিত এক মন্তব্যে গবেষণাটির সঙ্গে যুক্ত না থাকা অস্ট্রেলিয়ার দুই বিকিরণ বিশেষজ্ঞ লিখেছেন, নতুন গবেষণাটি এ বিষয়ে 'গুরুত্বপূর্ণ নতুন প্রমাণ' সামনে এনেছে।
সোমবার জামা ইন্টারনাল মেডিসিন- এ প্রকাশিত সর্বশেষ গবেষণাটিতে পেশার তথ্যসহ ১ কোটি ২০ লাখের বেশি মৃত্যুসনদের জাতীয় তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে।
গবেষকেরা লিউকেমিয়া, লিম্ফোমা, মাল্টিপল মায়েলোমা এবং ত্বক, স্তন, থাইরয়েড, প্রোস্টেট ও কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের ক্যানসারসহ বিকিরণের সংস্পর্শের সঙ্গে সম্পর্কিত ক্যানসারে মৃত্যুর হার বিশ্লেষণ করেছেন।
গবেষকেরা ৫০০টির বেশি পেশার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, বিকিরণজনিত ক্যানসারে মৃত্যুর হার ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্টদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি এবং পাইলটদের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। এই দুই পেশার ক্ষেত্রে বিকিরণজনিত সব ধরনের ক্যানসারে মৃত্যুর সম্ভাবনাই অস্বাভাবিকভাবে বেশি ছিল।
গবেষণার সঙ্গে প্রকাশিত মন্তব্যে ক্যাথরিন ওলসেন ও কেন কারিপিডিস বলেছেন, বিকিরণের সংস্পর্শের সঙ্গে সম্পর্কিত নয় এমন ক্যানসারে এই দুই পেশার মানুষের মৃত্যুহার স্বাভাবিক।
তাদের মতে, এই তথ্য 'জীবনযাপন বা আর্থসামাজিক কারণের পরিবর্তে পেশাগত বিকিরণের সংস্পর্শই অতিরিক্ত ঝুঁকির কারণ'—এই ধারণাকে সমর্থন করে।
গবেষকেরা দেখেছেন, সাধারণ কর্মজীবী জনগোষ্ঠীর তুলনায় ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্টদের বিকিরণজনিত ক্যানসারে মৃত্যুর সম্ভাবনা প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি। পাইলটদের ক্ষেত্রে এই সম্ভাবনা প্রায় ৩৬ শতাংশ বেশি।
প্রকট ঝুঁকির হিসাবে, ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্টদের মোট মৃত্যুর প্রায় ৬ দশমিক ৯ শতাংশ এসব ক্যানসারের কারণে হয়েছে—অর্থাৎ প্রায় ১৪ জনে একজন। পাইলটদের ক্ষেত্রে এই হার ৬ দশমিক ৭ শতাংশ।
সাধারণ কর্মজীবী জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে এই হার ৫ শতাংশ বলে জানান গবেষণাটির প্রধান লেখক হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের চিকিৎসক বিশাল প্যাটেল।
তবে গবেষণাটির লেখকেরা তাদের গবেষণার কিছু সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করেছেন। প্রতিটি ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্ট ও পাইলট আকাশে বা অন্য কোনো উৎস থেকে কতটা বিকিরণের সংস্পর্শে এসেছেন, তা তারা জানেন না।
কিছু মৃত্যুসনদে পেশার তথ্য ভুলভাবে উল্লেখ করা হতে পারে—এমনেআশঙ্কাও রয়েছে।
পেশা দুটির সঙ্গে বিশেষভাবে সম্পর্কিত আরেকটি সম্ভাব্য কারণও তারা যাচাই করতে পারেননি। তা হলো- শরীরের অভ্যন্তরীণ ঘড়ির ঘন ঘন ব্যাঘাত ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। জেট ল্যাগ, এক সময় অঞ্চল থেকে অন্য সময় অঞ্চলে যাওয়া এবং অনিয়মিত কর্মসূচির কারণে শরীরের এই অভ্যন্তরীণ ঘড়ি ব্যাহত হতে পারে।
গবেষণার লেখকেরা উল্লেখ করেছেন, ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন স্বীকার করেছে যে উড়োজাহাজের কর্মীরা আয়নাইজিং বিকিরণের সংস্পর্শে আসেন। তবে সরকার বিকিরণের মাত্রার কোনো ফেডারেল সীমা নির্ধারণ করেনি এবং বিকিরণের সংস্পর্শ পর্যবেক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক করেনি।
প্যাটেল এক ই-মেইলে জানান, 'যে বিকিরণের সংস্পর্শ পরিমাপ না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।'
৫৫ হাজার ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্টের প্রতিনিধিত্বকারী একটি ইউনিয়নের নেতৃত্ব দেওয়া সারা নেলসন বলেন, প্রতিবেদনটি বিকিরণের সংস্পর্শকে গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তাকে আরও জোরালো করেছে।
অ্যাসোসিয়েশন অব ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্টস-সিডব্লিউএর সভাপতি নেলসন বলেন, 'ঝুঁকি আছে তা জানা সত্বেও ক্রুদের এ বিষয়ে শিক্ষা দেওয়া বা তথ্য জানানো হয় না। এছাড়া কেউ এর দায়ও নিচ্ছে না।'
ওলসেন ও কারিপিডিস লিখেছেন, বেশি উচ্চতায় চলাচলকারী ফ্লাইটে কর্মরত সবার জন্য বছরে একবার ত্বক পরীক্ষা করানো প্রয়োজন হতে পারে। এসব পেশায় কর্মরত নারীরা কম বয়সে বা আরও ঘন ঘন ম্যামোগ্রাম করানোর কথা বিবেচনা করতে পারেন।
তারা আরও বলেন, পাইলট ও ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্টদের চিকিৎসা করেন এমন চিকিৎসকদের এসব রোগীকে মূল্যায়নের সময় ক্যানসারের সম্ভাবনার বিষয়ে 'আরও বেশি সতর্ক' থাকা উচিত।
