দক্ষিণ চীন সাগরে ৪ দিন বিদ্যুৎহীন অবস্থায় মার্কিন ডেস্ট্রয়ার: খাদ্য সংকটে ৩০০ নাবিক
দক্ষিণ চীন সাগরে বড় ধরনের যান্ত্রিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছিল মার্কিন নৌবাহিনীর একটি যুদ্ধজাহাজ। গত মাসে মাঝ সমুদ্রে টানা চার দিন বিদ্যুৎহীন অবস্থায় অচল হয়ে পড়ে ছিল ডেস্ট্রয়ার 'ইউএসএস বেনফোল্ড'।
এই সময়ে জাহাজটিতে থাকা প্রায় ৩০০ জন নাবিক খাবার, পানীয় জল, সচল টয়লেট এবং শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ছাড়াই চরম মানবেতর পরিস্থিতির সম্মুখীন হন।
মার্কিন সপ্তম নৌবহরের মুখপাত্র কমান্ডার ম্যাথিউ কোমারের মতে, 'জেনারেটর সংক্রান্ত কারিগরি ত্রুটির' কারণে ১০ হাজার টন ওজনের এই গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ার 'ইউএসএস বেনফোল্ড' এবং ৩০০ সদস্যের ক্রুকে ফিলিপাইনের বন্দরে নিয়ে যেতে হয়েছে।
জাহাজটি 'জর্জ ওয়াশিংটন ক্যারিয়ার স্ট্রাইক' গ্রুপের সাথে সমুদ্রে যাত্রা করছিল। তবে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর এটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সাগরে ভাসতে থাকে।
কমান্ডার কোমার পরিস্থিতির বর্ণনা দিয়ে বলেন, 'এই প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও জাহাজের ক্রুরা অদম্য ধৈর্য, সাহসিকতা এবং পেশাদারিত্বের পরিচয় দিয়েছেন। এ ঘটনায় কোনো নাবিক আহত হননি।' তিনি আরও জানান, জাহাজটি অচল থাকাকালীন স্ট্রাইক গ্রুপের অন্য জাহাজগুলো থেকে তাদের জন্য খাবারের জোগান দেওয়া হয়েছিল।
মার্কিন নৌবাহিনীতে সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক এমন সংকটজনক পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় উদ্বেগ বাড়ছে। এর আগে 'ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন' নামক অপর একটি এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ারের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ নিয়ে নাবিকদের পরিবারগুলো গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। তাদের অভিযোগ ছিল, জাহাজে পর্যাপ্ত টয়লেট সুবিধা নেই, গোসলের ব্যবস্থা নেই এবং খাবারের মান অত্যন্ত নিম্নমানের।
সংবাদমাধ্যমের বরাতে জানানো হয়, এসব পরিস্থিতির কারণে কিছু নাবিক জাহাজ থেকে সাগরে লাফ দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টাও করেছেন। ইরান যুদ্ধ চলাকালে জাহাজটিকে মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করা হয়েছিল।
এছাড়া গত মে মাসে 'ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড' নামক আরেকটি এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ারে অগ্নিকাণ্ড এবং টয়লেট ব্যবস্থা বিকল হওয়ার ঘটনা ঘটে। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটকের মিশনে ৩০০ দিনের দীর্ঘ মোতায়েন শেষে জাহাজটিকে ভার্জিনিয়ায় ফেরত পাঠানো হয়েছিল।
ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের টাগবোটের সাহায্যে 'ইউএসএস বেনফোল্ড'-কে টেনে ফিলিপাইনের সুবিক বে-তে নেওয়া হয়। সেখানে ৩০ জুলাই মার্কিন সপ্তম নৌবহরের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা 'আমেরিকাস শিপ রিপেয়ার ফ্যাসিলিটি' এবং 'জাপান রিজিয়নাল মেইনটেন্যান্স সেন্টার' জাহাজটিকে গ্রহণ করে।
কমান্ডার কোমারের মতে, দুই দিন পর জাহাজটির বিদ্যুৎ সংযোগ পুনরায় চালু করা সম্ভব হয় এবং ৭ আগস্টের মধ্যে বাকি মেরামতের কাজ শেষ করা হয়। এরপর 'ইউএসএস বেনফোল্ড' কিছুদিনের জন্য জাপানে ফিরে যায় এবং ১৭ আগস্ট পুনরায় নতুন মিশনে নিয়োজিত হয়।
'জর্জ ওয়াশিংটন ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ'-এর অংশ এই যুদ্ধজাহাজটি 'ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন'-এর স্থলাভিষিক্ত হতে মধ্যপ্রাচ্যের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিল।
গ্রীষ্মকালে দক্ষিণ চীন সাগরের তাপমাত্রা ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠতে পারে। ফলে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ছাড়া জাহাজে থাকা নাবিকদের জন্য পরিস্থিতি দুঃসহ হয়ে উঠেছিল।
গাইডেড-মিসাইল ক্রুজার 'ইউএসএস রবার্ট স্মলস' এবং ডেস্ট্রয়ার 'ইউএসএস শৌপ'-সহ 'ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটন' স্ট্রাইক গ্রুপের বাকি জাহাজগুলো গত সপ্তাহে মালাক্কা প্রণালি অতিক্রম করে আন্দামান সাগরে প্রবেশ করেছে।
সংবাদমাধ্যম 'দ্য ওয়ার জোন'-এর মতে, এই স্ট্রাইক গ্রুপটি চলতি সপ্তাহের মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছে যেতে পারে, তবে তাদের পৌঁছানোর নির্দিষ্ট কোনো তারিখ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়নি।
এদিকে, 'ইউএসএস বেনফোল্ড' মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েনরত স্ট্রাইক গ্রুপের মূল বহরে পুনরায় যোগ দিতে পারবে কি না, তা এখনো অস্পষ্ট।
