কলম্বিয়ায় ৭.৪ মাত্রার ভূমিকম্পে অন্তত ১৩২ জনের মৃত্যু, জরুরি অবস্থা ঘোষণা
কলম্বিয়ায় কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্পগুলোর একটির আঘাতে অন্তত ১৩২ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং দেশটিতে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে।
ধসে পড়া ভবনের নিচে আরও অনেক মানুষ আটকা পড়ে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ফলে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
দেশটির ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা জানিয়েছে, স্থানীয় সময় সকাল ৭টা ৩৪ মিনিটে (গ্রিনিচ মান সময় দুপুর ১২টা ৩৪ মিনিট) চোকো প্রদেশে ভূপৃষ্ঠের ১০৩ কিলোমিটার গভীরে ৭ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্পটি আঘাত হানে।
পশ্চিম কলম্বিয়ার কয়েকশ কিলোমিটারজুড়ে বিস্তৃত বিশাল এলাকায় ভূমিকম্পটির কম্পন অনুভূত হয়।
দেশটির কফি উৎপাদনকারী অঞ্চলের শহর পেরেইরায় সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে। আশপাশের শহরগুলো এবং ভায়েজ দেল কাউকা অঞ্চলও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল চোকো প্রদেশের সান হোসে দেল পালমার গ্রামের কাছে। তবে স্থানীয় মেয়র লেওন ফাবিও মারিন মোনকাদা জানিয়েছেন, ওই এলাকায় কোনো প্রাণহানি বা আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেনি—যা অনেকটা অলৌকিক বলেই মনে হচ্ছে। যদিও গ্রামটির সঙ্গে যোগাযোগের সড়কগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
কলম্বিয়ার রাজধানী শহরগুলোর সংগঠন সোমবার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ভূমিকম্পে ৪৮০ জনের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন।
ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল থেকে প্রায় ৫৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত পেরেইরা শহরটি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর একটি।
বিবিসির যাচাই করা ভিডিওতে দেখা গেছে, শহরটির প্রধান চত্বর প্লাজা বলিভারে অন্তত একটি ভবন ধসে পড়েছে। সেখানে অনেক মানুষ জড়ো হওয়া খোলা জায়গাটিতে ধ্বংসস্তূপ ও ধুলাবালি ছড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।
স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পেরেইরার মহানগর এলাকায় অন্তত ৪০ জন নিহত হয়েছেন এবং ৬৫টি ভবন ধসে পড়েছে। এর মধ্যে ১৫টি ভবনের ধ্বংসস্তূপের নিচে মানুষ আটকা পড়ে থাকতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
শহরের কিছু এলাকায় মঙ্গলবার স্থানীয় সময় ভোর ৫টা পর্যন্ত রাত্রিকালীন কারফিউ জারি করা হয়েছে।
পেরেইরা থেকে প্রায় ১৬০ কিলোমিটার দক্ষিণে এবং ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত কালি শহরে ৩২টি ভবন ধসে পড়েছে।
২৯ বছর বয়সী ড্যান কাটলার লন্ডনের বাসিন্দা। প্রায় দুই মাস আগে সঙ্গীকে নিয়ে দীর্ঘ ভ্রমণের অংশ হিসেবে তিনি কলম্বিয়ায় এসেছেন এবং বর্তমানে কালি শহরে অবস্থান করছেন।
ভূমিকম্পে ঘুম ভেঙে যাওয়ার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বিবিসিকে বলেন, 'আমি জীবনে এর মতো কিছু কখনো অনুভব করিনি।'
তিনি বলেন, 'আমরা পায়জামা পরা অবস্থাতেই দৌড়ে বাইরে বেরিয়ে যাই। আমাদের হোটেলে বড় ধরনের কাঠামোগত ক্ষতি হয়নি। তবে দেয়ালে ফাটল দেখা দিয়েছে এবং রং ও পলেস্তারা খসে পড়েছে।'
মানিজালেস, কুইবদো, মেডেলিন এবং চোকো ও ভায়েজ দেল কাউকা অঞ্চলের বিভিন্ন স্থান থেকেও প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে।
মানিজালেসে অন্তত দুজন নিহত হয়েছেন।
বিবিসির বিশ্বসেবা বিভাগকে অ্যাঞ্জেলিকা আভিলা বলেন, তিনি মানিজালেসের একটি হোটেলে অবস্থান করছিলেন।
তিনি জানান, ভূমিকম্প শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দেয়ালে ফাটল দেখা দিতে শুরু করে।
তিনি বলেন, 'সবাই চিৎকার করছিল... আমি পাশের ভবনগুলো থেকে ধুলা বের হতে দেখেছি এবং দেয়াল থেকে ইট খসে পড়ছিল।'
মানিজালেসের সাংবাদিক ও আবহাওয়াবিদ লুইস ফেলিপে মোলিনা ভূমিকম্পের সময় নিজের বাড়িতে ছিলেন। তার অবস্থান ছিল ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল থেকে প্রায় ১৫০ কিলোমিটার দূরে।
তিনি জানান, অতীতে ভূমিকম্পের অভিজ্ঞতার কারণে শহরটিতে ভূমিকম্প প্রতিরোধী ভবন নির্মাণের জন্য অত্যন্ত কঠোর বিধিমালা রয়েছে। ফলে তার ভবনটি ভূমিকম্পের আঘাত সহ্য করতে সক্ষম হয়েছে।
তিনি বিবিসি মুন্দোকে বলেন, 'আমার ৪৫০টি বই ছিল এবং সেগুলোর মধ্যে মাত্র কয়েকটি তাকের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল। কাচ ভাঙার শব্দ ও মানুষের চিৎকার শোনা যাচ্ছিল।'
তিনি বলেন, 'এটি ছিল ভয়াবহ এবং আতঙ্কজনক এক অভিজ্ঞতা।'
দেশটির বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পেরেইরা, মানিজালেস, কুইবদো, আরমেনিয়া, কার্তাগো ও বুয়েনাভেনতুরাসহ বেশ কয়েকটি আঞ্চলিক বিমানবন্দরে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
রাজধানী বোগোতায় গাছপালা ও ট্রাফিক সংকেতের বাতিগুলো প্রচণ্ডভাবে কেঁপে ওঠে। কয়েকটি ভবনে ফাটল দেখা দেওয়ার খবর পাওয়া গেছে। তবে এখন পর্যন্ত শহরের অবকাঠামোয় বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।
প্রতিবেশী ভেনেজুয়েলা, ইকুয়েডর ও পানামা পর্যন্ত ভূমিকম্পের কম্পন অনুভূত হয়েছে।
কলম্বিয়ায় এই ভূমিকম্পের মাত্র দুই মাসেরও কম সময় আগে ভেনেজুয়েলার উত্তরাঞ্চলে পরপর দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হেনেছিল। ওই ঘটনায় ৬ হাজার ৩০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছিলেন।
কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট আবেলার্দো দে লা এস্প্রিয়েলা জাতীয় দুর্যোগ পরিস্থিতি ঘোষণা করেছেন। এর ফলে জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিশেষ ক্ষমতা কার্যকর হয়েছে, যার আওতায় সরকারের বিভিন্ন বাজেটের অর্থ অন্য খাতে পুনর্বিন্যাস করার সুযোগও তৈরি হয়েছে।
মাত্র শুক্রবার প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ করা নতুন প্রেসিডেন্ট দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই এমন একটি সম্ভাব্য ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছেন, যা তার শাসনামলের অন্যতম বড় ঘটনা হয়ে উঠতে পারে।
নিহতের পাশাপাশি ১ হাজার ৫০০টির বেশি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলেও তিনি নিশ্চিত করেছেন।
ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেতারা সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ভূমিকম্প পরিস্থিতি 'ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে' এবং 'সহায়তার জন্য প্রস্তুত' রয়েছে।
ইউরোপীয় কমিশনের প্রধান উরসুলা ফন ডার লেয়েন জানিয়েছেন, উদ্ধার তৎপরতায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের কোপার্নিকাস উপগ্রহ ব্যবস্থা ব্যবহার করা হচ্ছে।
এল সালভাদরের প্রেসিডেন্ট নায়িব বুকেলে কলম্বিয়ার জনগণের প্রতি সংহতি প্রকাশ করে উদ্ধার তৎপরতায় জনবল ও সরঞ্জাম পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ১৫ লাখ মানুষ সাত মাত্রার কাছাকাছি শক্তিশালী কম্পন অনুভব করেছেন।
সংস্থাটি জানিয়েছে, সোমবারের ভূমিকম্পটির মতো গভীর ভূমিকম্প সাধারণত ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি সংঘটিত ভূমিকম্পের তুলনায় কম বিপজ্জনক হয়ে থাকে।
তবে এ ধরনের ভূমিকম্প এমনভাবে শক্তি নির্গত করতে পারে, যা ভবনগুলোর ব্যাপক ক্ষতি করতে সক্ষম। এ ক্ষেত্রে পরবর্তী কম্পনের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম হলেও সেগুলো আরও শক্তিশালী হতে পারে।
