আমেরিকা দাবি না মানা পর্যন্ত বন্ধই থাকবে হরমুজ প্রণালি: অনড় বার্তা ইরানের
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের দাবি মেনে না নেওয়া পর্যন্ত কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি উন্মুক্ত করা হবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে ইরান। ওমানের সঙ্গে নিরাপদ জাহাজ চলাচলের বিকল্প পথ নিয়ে আলোচনা চললেও, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আরোপিত শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত এই আন্তর্জাতিক জ্বালানি রুটটি অবরুদ্ধই থাকবে বলে তেহরান জানিয়েছে।
আজ সোমবার (১০ আগস্ট) ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘেই এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা জানান। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি পণ্যের আকাশচুম্বী দাম এবং যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক অস্থিরতার মুখে ইরান যেভাবে হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে, তাকে ওয়াশিংটনের সঙ্গে দর কষাকষিতে তেহরানের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে থাকায়, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য এটি বড় রাজনৈতিক মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের বরাতে জানা যায়, সংবাদ সম্মেলনে বাঘেই বলেন, ওমানের সঙ্গে চলমান আলোচনার মূল লক্ষ্য হচ্ছে পণ্যবাহী জাহাজের নিরাপদ চলাচলের জন্য একটি বিশেষ রুট তৈরিতে ঐক্যমতে পৌঁছানো। ওমানের সঙ্গে আলোচনা সুচারুভাবে এগোচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, ."তবে এই বিষয়টি হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ খুলে দেওয়ার আলোচনা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। প্রণালি পুনরায় চালু হওয়া সম্পূর্ণরূপে নির্ভর করছে যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরানের ওপর আরোপিত শর্তাবলী ও অবরোধ অপসারণের ওপর।"
ইরান ও ওমানের এই দুই দেশের উপকূলের মাঝে অবস্থিত হরমুজ প্রণালি বিশ্বব্যাপী তেল ও গ্যাস বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান সমুদ্রপথ। গত ফেব্রুয়ারির শেষভাগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের ওপর সামরিক অভিযান শুরু করার পর তেহরান কার্যকরভাবে এই প্রণালি দিয়ে জাহাজের চলাচল বন্ধ করে দেয়।
গত সপ্তাহে ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের এক শীর্ষ কর্মকর্তা যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বেশকিছু শর্ত উপস্থাপন করেন। তিনি জানান, প্রণালি পুরোপুরি খুলতে হলে যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্যই বেশ কিছু দাবি পূরণ করতে হবে। এসব দাবির মধ্যে রয়েছে—মার্কিন নৌ-অবরোধ ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, ইরানের আশপাশের এলাকা থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার, যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ প্রদান, অবরুদ্ধ করা ইরানি সম্পদ ছাড় করা এবং মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের মিত্রদের ওপর হামলা চিরতরে বন্ধ করা।
গত জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত একটি অস্ত্রবিরতি চুক্তিতে এসব দাবির অধিকাংশ বিষয়েই আলোচনা হয়েছিল। তবে সেই নথিতে বলা হয়েছিল যে, ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে চূড়ান্ত সমঝোতা হওয়ার পরেই কেবল নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি তুলে নেওয়া হবে। কিন্তু চুক্তি স্বাক্ষরের পরপরই তা ভেস্তে যায় এবং কয়েক সপ্তাহের মধ্যে শর্ত লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠে। পরবর্তীতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প চুক্তিটিকে বাতিল ঘোষণা করেন।
এদিকে গতকাল রোববার মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানের তীব্র অর্থনৈতিক সংকট ও রেকর্ড মূল্যস্ফীতি শেষ পর্যন্ত তেহরানকে নতুন একটি চুক্তিতে আসতে বাধ্য করবে। এ সময় নতুন করে সামরিক হামলার হুমকি না দিয়ে ট্রাম্প বলেন, "আমরা বিষয়টি খুব সাধারণভাবে ও ধীর গতিতে পর্যবেক্ষণ করছি।"
তবে তেহরানের নীতিনির্ধারকদের বিশ্বাস, ট্রাম্পের ক্ষমতার মেয়াদের চেয়ে তারা বেশি সময় ধরে অর্থনৈতিক চাপ সহ্য করতে পারবেন। উল্লেখ্য, আগামী নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যা ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য এক বড় পরীক্ষা।
সোমবারের সংবাদ সম্মেলনে বাঘেই ট্রাম্পের মন্তব্যের জবাবে বলেন, পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করার আগে "আমেরিকান পক্ষকেই তাদের বেআইনি ও ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড বন্ধ করতে হবে এবং এর ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।"
