হুথিদের হামলায় ইয়েমেনে নিহত ৩০, সৌদিতে আহত ১১; আরও বড় হামলার আশঙ্কা সৌদি আরবের
ইয়েমেনের একটি সামরিক ক্যাম্প ও সৌদি আরবে ইরান-ঘনিষ্ঠ হুথিদের সাম্প্রতিক হামলা মধ্যপ্রাচ্য সংকট আরও অনিয়ন্ত্রিত হওয়ার আশঙ্কাকে বাড়িয়ে দিয়েছে। ইয়েমেনে হুথিদের হামলায় অন্তত ৩০ জন সরকারি সেনা নিহত হওয়ার পর সৌদি আরবে তাদের হামলায় আহত হয়েছেন অন্তত ১১ জন।
ইয়েমেন ক্রমেই ইরান ও মার্কিন-ইসরায়েল যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ছে। দেশের ভেতরের সরকারি বাহিনী এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান মিত্র ও ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের সমর্থক প্রতিবেশী দেশ সৌদি আরব—উভয়ের ওপরই হামলা জোরদার করেছে হুথি বিদ্রোহীরা।
বৃহস্পতিবার ইয়েমেন সরকারের সূত্র জানায়, দেশটির সামরিক ক্যাম্পগুলোতে হুথিদের হামলায় অন্তত ৩০ জন সরকারি সেনা নিহত হয়েছেন। তবে প্রাণহানির সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। কিছু প্রতিবেদনে নিহতের সংখ্যা ৫৮ বলে জানানো হয়েছে।
হুথিদের দাবি, বিপুল সৌদি সামরিক উপস্থিতি লক্ষ করার পর তারা মারিব ও হাদরামাউত প্রদেশে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। এসব হামলায় সামরিক ক্যাম্প, অস্ত্রের গুদাম ও যানবাহন ধ্বংস হয়েছে বলেও দাবি তাদের।
ইয়েমেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, তাদের সশস্ত্র বাহিনী উপযুক্ত সময়ে ও স্থানে এসব হামলার জবাব দেবে।
এদিকে দেশটির স্বাস্থ্যমন্ত্রী আহত সেনাদের চিকিৎসার জন্য চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোকে প্রস্তুতি বাড়ানোর নির্দেশনা দিয়েছেন।
ইয়েমেনি সূত্রগুলোর ধারণা, দক্ষিণ লোহিত সাগরের মাধ্যমে সৌদি আরবের তেল রপ্তানির ওপর হুথিদের যে একচ্ছত্র প্রভাব রয়েছে, তা ভেঙে ফেলার লক্ষ্যে মধ্য ইয়েমেনে নৌপথে এবং সম্ভাব্য স্থলপথে হুথিদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে প্রতিপক্ষ।
সৌদি আরবের একজন কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, শুক্রবার ভোরে এক পৃথক হামলায় হুথিরা নির্বিচারে বেসামরিক এলাকায় গোলাবর্ষণ করেছে।
এ হামলায় চার বছরের এক শিশুসহ ১১ জন বেসামরিক নাগরিক আহত হয়েছেন। ইয়েমেন সরকারকে সমর্থনকারী সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালিকি বলেন, বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষায় জোটে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণ অব্যাহত রাখা হবে।
তিনি আরও বলেন, দক্ষিণ নাজরান প্রদেশে এই হামলা হয়েছে। এতে সাতজন সৌদি, একজন ইয়েমেনি, দুজন মিসরীয় ও একজন পাকিস্তানি নাগরিক আহত হন।
শুক্রবারের এই হামলার বিষয়ে হুথি বা ইরান কোনো পক্ষই তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।
সৌদি আরব ও হুথিরা গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ইয়েমেনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে লড়াই করছে। গত এক মাসে তাদের মধ্যকার ভঙ্গুর স্থিতাবস্থা ভেস্তে গেছে। হুথিরা সৌদি আরামকোর তেল স্থাপনাগুলোতে হামলা বাড়িয়েছে।
ইয়েমেনের রাজধানী সানা ও লোহিত সাগরের উপকূলীয় অঞ্চলের সিংহভাগ নিয়ন্ত্রণকারী হুথি গোষ্ঠী গত মাসে লোহিত সাগরে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নৌ-অবরোধ ঘোষণা করে।
সৌদি আরবের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বৃহস্পতিবার জানান, ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে ইয়েমেনের হুথি ও ইরাকের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো উত্তর ও দক্ষিণ দিক থেকে সমন্বিতভাবে বড় ধরনের হামলা চালাতে পারে বলে তাদের আশঙ্কা।
তিনি আরও বলেন, সৌদি আরব, যুক্তরাষ্ট্র ও এই অঞ্চলের অন্যান্য দেশের গোয়েন্দা প্রতিবেদন থেকে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, তাদের জ্বালানি অবকাঠামো, সমুদ্রবন্দর ও বিমানবন্দরসহ বিভিন্ন বেসামরিক ও অর্থনৈতিক স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে। এছাড়া ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের উপস্থিতির ওপর নজর রাখছে সৌদি আরব। এটি দুই দিক থেকেই অভিযানের প্রস্তুতির ইঙ্গিত দেয়।
বিষয়টি এমন এক সময়ে সামনে এল, যখন ইরান ও ওমান জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি-সংক্রান্ত একটি চুক্তির খসড়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। তবে এই চুক্তি কার্যকর হওয়া সম্ভবত ইরানের বন্দরগুলোর ওপর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ তুলে নেওয়ার ওপর নির্ভরশীল।
বৈশ্বিক নৌপরিবহন ও জ্বালানি সরবরাহের জন্য হরমুজ প্রণালি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ইরানের ওপর মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলার মধ্য দিয়ে সংঘাত শুরু হয়। এর আগে বিশ্বের তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পারস্য উপসাগরের মোহনাযর এই নৌপথ দিয়ে পরিবহন করা হতো।
