হরমুজ দিয়ে সৌদির তেল রপ্তানি: জাহাজ থেকে জাহাজে স্থানান্তরে জট, রেকর্ড উচ্চতায় ট্যাংকার ভাড়া
লোহিত সাগরের বন্দর হয়ে তেল রপ্তানির গুরুত্বপূর্ণ একটি পাইপলাইন ড্রোন হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায়—ফের হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল রপ্তানি বাড়াচ্ছে সৌদি আরব। এ বাণিজ্যের বড় অংশই আবার করা হচ্ছে 'শিপ-টু-শিপ ট্রান্সফার' বা এসটিএস (জাহাজ থেকে জাহাজে তেল স্থানান্তর) এর মাধ্যমে। তবে এর ফলে ওমান উপসাগরজুড়ে এসটিএস সুবিধাগুলোর ধারণক্ষমতা প্রায় পূর্ণ হয়ে গেছে। অন্যদিকে জ্বালানি পরিবহনে প্রয়োজনীয় 'ভেরি লার্জ ক্রুড ক্যারিয়ার' বা ভিএলসিসি (বিশাল আকৃতির অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজ) ভাড়া করার প্রতিযোগিতা তীব্র হওয়ায়—সাগরে তেল পরিবহনের ভাড়াও রেকর্ড উচ্চতায় গিয়ে পৌঁছেছে।
গত ২৫ সেপ্টেম্বর বার্তাসংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ১৩ সেপ্টেম্বর সৌদির পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনে হামলার পর লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরের মাধ্যমে তেল রপ্তানি বন্ধ হয়ে যায়। এরপর ওমানের সোহার উপকূলের কাছে জাহাজ থেকে জাহাজে স্থানান্তরের মাধ্যমে চলতি ও আগামী মাসে সরবরাহের জন্য ৬ কোটি ব্যারেেলেরও বেশি অপরিশোধিত তেল বিক্রি করেছে সৌদি আরবের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি আরামকো।
এসটিএস হলো– সাগরের মাঝেই এক জাহাজ থেকে অন্য জাহাজে অপরিশোধিত তেল স্থানান্তরের একটি বিশেষ প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ায় হরমুজ প্রণালির ভেতরের অংশ থেকে তেল বোঝাই করা একটি ট্যাংকার—ওমান উপসাগরে গিয়ে অন্য একটি জাহাজে সেই তেল ভরে দেয়। এতে কমসংখ্যক জাহাজ ব্যবহার করেই বারবার তেল পরিবহন করা সম্ভব হয়।
সৌদি আরব এই পদ্ধতির ব্যবহার ব্যাপক হারে বাড়িয়ে দেওয়ায়—বাজারে তেলবাহী ট্যাংকারের চাহিদাও হু হু করে বাড়ছে। জ্বালানি বাজার বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান কেপলারের প্রাক্কলন অনুযায়ী, চলতি মাসে হরমুজ প্রণালি দিয়ে সৌদি আরবের অপরিশোধিত তেল রপ্তানি দৈনিক ৩৬ লাখ ব্যারেলে গিয়ে পৌঁছাবে—যা গত মাসের দৈনিক গড়ে ৯ লাখ ব্যারেলের তুলনায় প্রায় চারগুণ বেশি।
দৈনিক প্রায় ৩০ লাখ ব্যারেল অতিরিক্ত তেল পরিবহনের জন্য, প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল ধারণক্ষমতাসম্পন্ন অতিরিক্ত আরও ৩৬ থেকে ৪০টি ভিএলসিসি জাহাজের প্রয়োজন হবে বলে ধারণা করছে কেপলার।
পণ্যবাজার ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান 'অয়েল ব্রোকারেজ'-এর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, কেবল সৌদি আরবের বাড়তি তেল আনা-নেওয়ার (শাটল রান) কাজ সামলাতেই অতিরিক্ত ১৫টি ভিএলসিসি প্রয়োজন। অন্যদিকে, ইয়ানবু বন্দরের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার অপেক্ষায়—ভূমধ্যসাগরে অলস বসে রয়েছে আরও প্রায় ২০টি ভিএলসিসি জাহাজ।
জাহাজের এই তীব্র সংকটের তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়েছে সাগরে পণ্য পরিবহন ভাড়ার (ফ্রেইট রেট) ওপর। লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জ গ্রুপের (এলএসইজি) তথ্যানুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্য থেকে চীনে অপরিশোধিত তেল পরিবহনে একটি ভিএলসিসি জাহাজের দৈনিক ভাড়া গত ২১ সেপ্টেম্বর রেকর্ড ১২ লাখ ৭০ হাজার মার্কিন ডলারে গিয়ে ঠেকেছে।
কেবল সৌদি আরবই নয়; ইরাক ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ পারস্য উপসাগরীয় অন্যান্য তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোও হরমুজ প্রণালির বাইরে তেল পাঠাতে এসটিএস পদ্ধতি ব্যবহার করছে। ফলে ওমান উপসাগরে তেল স্থানান্তরের সার্বিক সক্ষমতা একদম চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে গেছে। এর ফলে টাগবোট ও প্রয়োজনীয় কর্মীসহ সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোগত সেবা পেতে অপেক্ষারত জাহাজের দীর্ঘ সারি তৈরি হচ্ছে।
জ্বালানি বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ভোরটেক্সার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত মাসের শেষ দিক থেকে হরমুজ প্রণালির পশ্চিমের বন্দরগুলো থেকে ছেড়ে যাওয়া ভিএলসিসিগুলোয় লোডিংয়ের জন্য দৈনিক প্রায় ৬০ লাখ ব্যারেল তেল এসটিএস পদ্ধতিতে স্থানান্তরিত হচ্ছে।
ভোরটেক্সার বিশ্লেষক এমা লি জানান, "দীর্ঘ এসটিএস জটের কারণে হরমুজ প্রণালির সংলগ্ন এলাকায় জাহাজ জট মারাত্মক আকার ধারণ করছে।" তিনি আরও উল্লেখ করেন, আগে যেসব স্থানান্তরের কাজে পাঁচ থেকে সাত দিন সময় লাগত, বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় ১০ দিনের কাছাকাছি পৌঁছেছে।
এদিকে তেল স্থানান্তরে বিলম্ব বাড়তে থাকায়—এশীয় ক্রেতারাও বিকল্প পথ ও প্রক্রিয়ার সন্ধান করছেন। কিছু চীনা কোম্পানি ভারতের পশ্চিম উপকূল কিংবা মালয়েশিয়ার জলসীমায় অপরিশোধিত তেল হস্তান্তরের জন্য সরবরাহকারীদের অনুরোধ জানাচ্ছে, অথবা সরাসরি শোধনাগারে তেল পাঠিয়ে দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছে।
চলতি সপ্তাহের শুরুতে সৌদি রাষ্ট্রায়ত্ত নৌপরিবহন প্রতিষ্ঠান 'বাহরি' পরিচালিত ভিএলসিসি 'গোল্ড শাইন' রাস তানুরা বন্দর থেকে ২০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল বোঝাই করে, চীনের কুয়ানজু বন্দরের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছে। ওই বন্দরের কাছেই আরামকোর অংশীদারত্ব থাকা একটি তেল শোধনাগার অবস্থিত।
মধ্যপ্রাচ্যের অপরিশোধিত তেলের বাজারের ব্যবসায়ীদের উদ্ধৃতি দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, আরামকো প্রধান শেয়ারহোল্ডার হিসেবে থাকা দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিষ্ঠান 'এস-অয়েল'ও ভারতের পশ্চিম উপকূলের ভাদিনারে এসটিএস পদ্ধতিতে তেল নিতে দুটি ভিএলসিসি জাহাজ পাঠাচ্ছে। তবে এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে এস-অয়েল কোনো সাড়া দেয়নি।
অন্যদিকে, একটি প্রধান ট্রানজিট হাব হিসেবে পরিচিত মালয়েশিয়ার লিংগি উপকূলেও—সম্প্রতি জাহাজ থেকে জাহাজে অপরিশোধিত তেল স্থানান্তর বহুগুণ বেড়েছে। সীমিতসংখ্যক ট্যাংকারের কার্যকর ব্যবহারের লক্ষ্যে, বিশাল জাহাজে করে একবারে উত্তর এশিয়ায় তেল না পাঠিয়ে, সাগরের মাঝামাঝি কোনো স্থানে মধ্যপ্রাচ্যের তেল ছোট ছোট জাহাজে স্থানান্তরের এই বিশেষ পদ্ধতিটি এখন সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ছে।
