মরক্কো থেকে সীমান্ত দিয়ে হাজার হাজার অভিবাসীর অনুপ্রবেশ, সেউতায় সেনা পাঠাচ্ছে স্পেন
স্পেন উত্তর আফ্রিকায় অবস্থিত তাদের স্বায়ত্তশাসিত ভূখণ্ড সেউতায় নিরাপত্তা জোরদার করতে সেনা পাঠাচ্ছে, কারণ বৃহস্পতিবার মরক্কো থেকে হাজারো অভিবাসী সাঁতরে ওই ভূখণ্ডে প্রবেশ করেছে।
সেউতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করতে গিয়ে অন্তত ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে সীমান্ত অতিক্রমের চেষ্টা বেড়ে যাওয়ায় স্থানীয় কর্মকর্তারা মাদ্রিদের কাছে সহায়তার আবেদন করেছিলেন। তবে বৃহস্পতিবার সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা দৃশ্যত ভেঙে পড়ায় সেখানে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
স্পেনের সুপ্রিম কোর্ট এই মাসে রায় দিয়েছে যে সেউতা বা স্পেনের আরেকটি স্বায়ত্তশাসিত ভূখণ্ড মেলিলায় পৌঁছানোর চেষ্টার সময় সমুদ্রে আটক হওয়া অভিবাসীদের তড়িঘড়ি করে মরক্কোতে ফেরত পাঠানো যাবে না।
স্পেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অভিযোগ করেছে, মানবপাচারকারী চক্র ওই রায়কে কাজে লাগিয়ে 'কাগজপত্রবিহীন অভিবাসীদের সেখানে যেতে উৎসাহিত করছে'।
মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, 'সশস্ত্র বাহিনী সিভিল গার্ডকে তাদের দায়িত্ব পালনে সহায়তা করবে এবং সেউতা শহরের নিরাপত্তা বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় অন্য যেকোনো ব্যবস্থা গ্রহণে সহযোগিতা করবে।'
মরক্কোর উত্তর উপকূলে অবস্থিত সেউতা জিব্রাল্টার প্রণালীর মাধ্যমে মূল ভূখণ্ড স্পেন থেকে বিচ্ছিন্ন। ইউরোপে প্রবেশের আশায় অভিবাসীদের জন্য এটি দীর্ঘদিন ধরেই অন্যতম প্রধান প্রবেশপথ।
এই সীমান্তে অস্থিরতার ফলে ইতালি সরকার স্পেনের সাথে উন্মুক্ত সীমান্ত সংক্রান্ত শেনজেন চুক্তি বন্ধ করাসহ "ব্যতিক্রমী পদক্ষেপ" বিবেচনা করছে বলে জানিয়েছে।
গত কয়েক দিন ধরেই স্পেনের স্বায়ত্তশাসিত ভূখণ্ড সেউতায় প্রবেশের চেষ্টা করা অভিবাসীদের সংখ্যা বাড়ছিল।
এরপর বৃহস্পতিবার হাজারো মানুষ কংক্রিটের ঢাল বেয়ে নেমে সমুদ্রে ঝাঁপ দেয়, যাতে তারা সীমান্ত চিহ্নিতকারী জেটিটি ঘুরে সাঁতরে স্পেনের অংশে পৌঁছাতে পারে।
স্প্যানিশ অংশে সৈকতগুলো শীঘ্রই রাবারের রিং এবং সাঁতারের ফিন দিয়ে ঢেকে যায়। যদিও কিছু অভিবাসী তাদের আগমন উদযাপন করছিল, এক ডজনেরও বেশি মানুষ চেষ্টা করতে গিয়ে ডুবে মারা গেছে।
মরক্কো থেকে হঠাৎ করে অবৈধভাবে সীমান্ত পার হওয়ার এই ঢলের কারণ এখনো স্পষ্ট নয়। এছাড়া মরক্কোর কর্তৃপক্ষ এটি ঠেকাতে কতটা চেষ্টা করেছে, সেটিও পরিষ্কার নয়। এক পর্যায়ে স্পেনের এক কর্মকর্তা বলেন, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়েছে।
স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ শুক্রবার সেউতা সফরে যাওয়ার কথা রয়েছে। তিনি অবিলম্বে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার অঙ্গীকার করেছেন।
অভিবাসীদের জন্য নির্ধারিত আশ্রয়কেন্দ্রগুলো ইতোমধ্যেই ধারণক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ অভিযোগ করেছে, মাদ্রিদ পরিস্থিতি মোকাবিলায় অত্যন্ত ধীরগতিতে সাড়া দিয়েছে।
সেউতার নেতা হুয়ান হেসুস ভিভাস বলেছেন, বিপুলসংখ্যক মানুষের আগমনে স্থানীয় সম্পদের ওপর অসহনীয় চাপ সৃষ্টি হয়েছে। তিনি স্পেন সরকারকে দ্রুত হস্তক্ষেপের আহ্বান জানান।
এই ঘটনা ইতালির সঙ্গে রাজনৈতিক বিরোধও সৃষ্টি করেছে। ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি বলেছেন, তিনি স্পেনের সঙ্গে উন্মুক্ত সীমান্তব্যবস্থা শেনজেন স্থগিত করার বিষয়টি বিবেচনা করছেন।
তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, সেউতার দৃশ্যগুলো ছিল 'অত্যন্ত উদ্বেগজনক' এবং এগুলো 'নিয়ন্ত্রণহীন অবৈধ অভিবাসন ইউরোপের সীমান্ত নিরাপত্তার জন্য বাস্তব হুমকি'।
তার এই মন্তব্যের সঙ্গে দিনের শুরুতে ইতালির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তোনিও তায়ানির দেওয়া বক্তব্যের মিল রয়েছে।
তবে এমন পদক্ষেপ বাস্তবে কার্যকর করা সম্ভব কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে।
স্পেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসে লুইস আলবারেস অভিযোগ করেছেন, তায়ানি রাজনৈতিক স্বার্থে অভিবাসন ইস্যুকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছেন।
তিনি বলেন, এমন মন্তব্য 'একটি অংশীদার ও বন্ধুত্বপূর্ণ দেশের জন্য শোভন নয়', যে দেশের কাছ থেকে স্পেন 'ইউরোপীয় সংহতি প্রত্যাশা করে, দলীয় রাজনৈতিক বক্তব্য নয়'।
শেনজেন এলাকা হলো ২৯টি ইউরোপীয় দেশের সমন্বয়ে গঠিত একটি উন্মুক্ত সীমান্তব্যবস্থা, যেখানে সদস্য দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ সীমান্তে আনুষ্ঠানিকভাবে নিয়মিত সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ তুলে নেওয়া হয়েছে।
সীমান্ত অতিক্রম করে ঠিক কতজন সেউতায় প্রবেশ করেছেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, স্পেনের বিভিন্ন গণমাধ্যমের অনুমান, বৃহস্পতিবার দুই হাজার থেকে তিন হাজার মানুষ সেউতায় প্রবেশ করেছেন। তবে সিভিল গার্ড এ সংখ্যা নিশ্চিত করেনি।
উত্তেজনা বাড়তে থাকায় বৃহস্পতিবার গভীর রাতে সংঘর্ষের খবরও পাওয়া যায়, যদিও সেগুলো এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়নি।
সেউতা সীমান্তসংলগ্ন মরক্কোর শহর ফনিদেকে মরক্কোর কর্তৃপক্ষ অভিবাসীদের সীমান্ত পার হওয়া ঠেকাতে জলকামান ব্যবহার করেছে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা রয়টার্সকে জানিয়েছেন।
উত্তর আফ্রিকায় স্পেনের দ্বিতীয় স্বায়ত্তশাসিত শহর মেলিয়ায় স্থানীয় গণমাধ্যম ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর প্রকাশিত ভিডিওতে বেনি আনসার সীমান্তচৌকিতে সংঘর্ষের দৃশ্য দেখা গেছে বলে মনে হয়েছে।
এই নতুন অভিবাসী ঢলের কারণে ২০২১ সালের মে মাসের ঘটনার সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে, যখন কয়েক দিনের মধ্যে প্রায় আট হাজার মানুষ সেউতায় প্রবেশ করেছিল এবং এতে মরক্কোর সঙ্গে কূটনৈতিক উত্তেজনা বেড়ে গিয়েছিল।
সেউতা ও মেলিয়া আফ্রিকা মহাদেশের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের একমাত্র স্থলসীমান্তের প্রতিনিধিত্ব করে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নজরদারি বাড়ানো, সীমান্তের অবকাঠামো শক্তিশালী করা এবং মরক্কোর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নত করার মাধ্যমে স্পেন এই দুই ভূখণ্ডের নিরাপত্তা জোরদার করেছে। তবুও বহু মানুষ এখনো এসব সীমান্ত দিয়ে ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
