সিজেপি আন্দোলনের নারী বিক্ষোভকারীদের ট্রল-বুলিং করছে উগ্রপন্থিরা, ছড়িয়ে দিচ্ছে বিকৃত ছবি, জানাচ্ছে গ্রেপ্তারের দাবি
'ককরোচ জনতা পার্টি' (সিজেপি) নেতৃত্বাধীন ছাত্র আন্দোলনের সমাপ্তির তিন দিন পর এর পরবর্তী পরিস্থিতি এক আপত্তিকর দিকে মোড় নিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একাধিক অ্যাকাউন্ট আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত জেন জি তরুণীদের লক্ষ্য করে তাদের কেটে নেওয়া (ক্রপ করা) ছবি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি ভুয়া ছবি এবং 'ওকে খুঁজে বের করুন। সে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে গালাগাল করেছে'—এমন ক্যাপশন দিয়ে ছড়াতে থাকে।
২৫ জুলাই আন্দোলন প্রত্যাহারের আগে যন্তর মন্তরে অবস্থান নেওয়া তরুণ ও শিক্ষার্থীরা ২০ জুলাই জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের ঘটনায় দৃশ্যত ক্ষুব্ধ ছিলেন। হতাশ আন্দোলনকারীরা অশালীন ভাষায় স্লোগান দেন। যদিও এসব স্লোগান নারী-পুরুষ উভয় আন্দোলনকারীই দিয়েছিলেন, কয়েক দিন পর উগ্রপন্থিরা শুধু নারীদেরই লক্ষ্যবস্তু বানাতে শুরু করে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে 'দ্য জয়পুর ডায়ালগস' একাধিক পোস্টে নারী আন্দোলনকারীদের মুখের কাছ থেকে তোলা কেটে নেওয়া (ক্লোজ-আপ ক্রপ করা) ছবি প্রকাশ করে তাদের পরিচয় তুলে ধরে এবং আক্রমণ করে। তারা প্রধানমন্ত্রী মোদিকে ক্যামেরার সামনে গালাগাল করতে থাকা এক জেন জি তরুণীর একটি ভিডিও প্রকাশ করে ক্যাপশন দেয়—'দিল্লি পুলিশ... তাকে শিক্ষা দিতে কারাগারের পেছনে পাঠান।'
'তাদের গ্রেপ্তার করুন'
আন্দোলন প্রত্যাহারের কয়েক দিন পর, কেন্দ্রের সঙ্গে 'ককরোচ জনতা পার্টির' সমঝোতা সত্ত্বেও বিহারে ৩০০ জনের বেশি শিক্ষার্থী, আসামে ১৩ জন এবং পশ্চিমবঙ্গে ১৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তবে সোমবার বিহার ও আসামের রাজ্য সরকার আশ্বাস দেয় যে, তারা তরুণ আন্দোলনকারীদের মুক্তি দেবে এবং তাদের বিরুদ্ধে নেওয়া সব আইনি পদক্ষেপ প্রত্যাহার করবে।
এদিকে দিল্লি পুলিশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন অ্যাকাউন্টে নোটিশ পাঠিয়ে প্রধানমন্ত্রী মোদি ও অন্যান্য জ্যেষ্ঠ নেতাদের বিরুদ্ধে করা 'অপমানজনক' বা 'অবৈধ' পোস্ট মুছে ফেলার নির্দেশ দিয়েছে।
কর্তৃপক্ষের এসব পদক্ষেপের পরও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন অ্যাকাউন্ট নারী আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে আক্রমণ চালিয়ে যেতে থাকে।
চার লাখেরও বেশি অনুসারী রয়েছে এমন 'বিয়িং হিউমার' নামের একটি অ্যাকাউন্ট পোস্ট করে, 'সিজেপির আন্দোলনের সবচেয়ে বড় বিদ্রূপ ছিল, সবচেয়ে নারীবিদ্বেষী গালাগালগুলো দিয়েছিলেন নারীরাই।'
ওই অ্যাকাউন্টে এমন একটি ভিডিও প্রকাশ করা হয়, যেখানে এক নারী ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনিকে গালাগাল করছেন।
অ্যাকাউন্টটি লিখেছে, 'আন্দোলনটি যখন শিক্ষার্থীদের জন্য এবং শিক্ষার্থীদের দ্বারাই পরিচালিত হচ্ছিল, তখন জর্জিয়া মেলোনিকে টেনে এনে গালাগাল করার কী প্রয়োজন ছিল?'
সাত হাজারেরও বেশি অনুসারী রয়েছে এমন 'লেফটেন্যান্ট কর্নেল সুশীল সিং শেখাওয়াত' নামের একটি অ্যাকাউন্ট প্রধানমন্ত্রী মোদিকে অশালীন ভাষায় গালাগাল করার জন্য নারী আন্দোলনকারীদের সমালোচনা করে।
অ্যাকাউন্টটিতে প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, এক তরুণ আন্দোলনকারী অন্যদের সঙ্গে—যাদের মধ্যে পুরুষও ছিলেন—স্লোগান দিচ্ছেন এবং শোনা যায় যে, পুরো জনতাই প্রধানমন্ত্রী মোদিকে গালাগাল করছে।
শেখাওয়াত পোস্টে লেখেন, 'যন্তর মন্তরে নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগগুলোর একটি ছিল নারীদের সঙ্গে অন্যায় আচরণ করা। ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ, যখন আমাদের নারীদের সম্মান করতে শেখানো হয়, তখন আমাদের মনে কী আসে? সৌন্দর্য, ত্যাগ, অঙ্গীকার, আনুগত্য, কোমলতা, অফুরন্ত ভালোবাসা। আর তখনই আমাদের বলা হয় নারীদের সম্মান করতে। সমতা নিয়ে বিতর্ক যাই থাকুক না কেন, যেদিন নারীরা এসব গুণ হারাবে, সেদিনই আমাদের সমাজে নৈতিকতার অবসান ঘটবে। এটি অত্যন্ত লজ্জাজনক।'
'এটি ভারতীয় জনতা পার্টির তথ্যপ্রযুক্তি সেলের কাজ'
অল্ট নিউজের সহ-প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ জুবায়েরের মতে, প্রায় প্রতিটি আন্দোলনের পরই এমন ঘটনা দেখা যায়।
তিনি দ্য প্রিন্টকে বলেন, 'শাহিনবাগ এবং কৃষক আন্দোলনের পরও আমরা একই ঘটনা দেখেছি। বিকৃত ছবি, বিভ্রান্তিকর ভিডিও, বানানো গল্প এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা ইনস্টাগ্রাম থেকে নেওয়া ব্যক্তিগত ভিডিও ব্যবহার করে নারী আন্দোলনকারীদের আলাদা করে নিশানা করা হয়। এর উদ্দেশ্য হলো তাদের চরিত্রে আঘাত করে আন্দোলনকারীদের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করা।'
তিনি আরও দাবি করেন, ভারতীয় জনতা পার্টির সমর্থকেরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি এক নারীর ছবি ছড়িয়ে তাকে আন্দোলনকারী বলে দাবি করছেন।
এদিকে আন্দোলনের মুখ হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠা বেশ কয়েকজন নারীকে লক্ষ্য করেও বিভিন্ন অ্যাকাউন্টে আক্রমণ চালানো হয়েছে।
গত সপ্তাহে মুম্বাইয়ে সিজেপির আন্দোলনের সময় একটি পুলিশবাহী গাড়ি থামিয়ে আলোচনায় আসা রিয়া যাদব আহির সাইবার নিপীড়ন ও অনলাইন ট্রলের অভিযোগ এনে একটি অভিযোগ দায়ের করেছেন।
তিনি দাবি করেন, তাকে অনলাইনে হয়রানি করা হচ্ছে এবং অনুসরণ করা হচ্ছে।
এটিকে ভারতীয় জনতা পার্টির তথ্যপ্রযুক্তি সেলের কাজ বলে অভিযোগ করে ভারতীয় লেখক হুসাইন হায়দরি লিখেছেন, 'তারা দিল্লি ও উত্তর প্রদেশের পুলিশকে এসব তরুণীকে গ্রেপ্তার করতে বলছে। তারা মানুষকে উসকানি দিচ্ছে, যাতে এসব তরুণীকে হুমকি দেওয়া হয় এবং গালাগাল করা হয়। গত এক দশক ধরে নারীদের প্রকাশ্যে গালাগাল করে আসা তারাই আজ এসব করছে।'
