মার্কিন বাহিনীর ব্যবহারে থাকা যুক্তরাজ্যের বিমানঘাঁটিতে হামলার হুমকি ইরানের, ‘আত্মরক্ষায় প্রস্তুত’ ব্রিটেন
মার্কিন বাহিনীর ব্যবহৃত রয়্যাল এয়ার ফোর্সের (আরএএফ) একটি ঘাঁটিতে হামলার হুমকি দিয়েছে তেহরান। এই হুমকির পর ব্রিটিশ সরকার জানিয়েছে, ইরানের যেকোনো ক্ষেপণাস্ত্র হামলা থেকে নিজেদের রক্ষা করতে ব্রিটেন পুরোপুরি প্রস্তুত।
গত বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) ইংল্যান্ডের 'আরএএফ ফেয়ারফোর্ড' ঘাঁটিতে হামলা চালানোর হুমকি দেয়। একই সঙ্গে 'ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের' বিরুদ্ধেও পরোক্ষ হুমকি দেয় তারা।
ব্রিটিশ ঘাঁটি ব্যবহার করে ওয়াশিংটনকে ইরানের ওপর হামলা চালানোর অনুমতি দেওয়ার যে নীতি কিয়ার স্টারমার গ্রহণ করেছিলেন, তা অব্যাহত রাখতে অ্যান্ডি বার্নহাম সম্মতি দেওয়ার ঠিক দুই দিন পর এই হুমকি এল।
আইআরজিসি জানিয়েছে, 'ইরানের ভূখণ্ডে আগ্রাসনের জন্য ব্যবহৃত যেকোনো ঘাঁটি আমাদের জন্য লক্ষ্যবস্তু।' তারা দাবি করেছে, আমেরিকার ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত ফুরিয়ে আসায় তারা এখন 'ইংল্যান্ডের ফেয়ারফোর্ড বিমানঘাঁটি থেকে বি-১ যুদ্ধবিমান ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছে।'
ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে তারা আরও বলে, 'ইসলামি দেশগুলোকে খণ্ডিত করা... স্বৈরাচারী সরকার চাপিয়ে দেওয়া' এবং 'সবচেয়ে খারাপ বিষয়' হিসেবে 'ইসরায়েল নামক বিপর্যয়' সৃষ্টি করে ব্রিটেন 'আমাদের অঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগের' কারণ হয়েছে।
এর জবাবে ব্রিটিশ সরকার বলেছে, নিজ দেশ বা বিদেশ থেকে আসা 'যেকোনো ধরনের হামলা' থেকে ব্রিটেনকে রক্ষা করতে সামরিক বাহিনী '২৪ ঘণ্টা প্রস্তুত' রয়েছে।
তারা আরও যোগ করে, 'এর অংশ হিসেবে রয়্যাল নেভি, ব্রিটিশ আর্মি এবং রয়্যাল এয়ার ফোর্সের সমন্বয়ে একটি বহুমুখী বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় রয়েছে, যা উন্নত সক্ষমতায় সজ্জিত এবং আমাদের ন্যাটো মিত্রদের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে। এই সংঘাতের বিষয়ে যুক্তরাজ্যের অবস্থান অপরিবর্তিত রয়েছে—আমরা আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী আমাদের জনগণ, স্বার্থ এবং মিত্রদের রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং বড় কোনো সংঘাতে জড়াতে চাই না।'
গত বৃহস্পতিবার রাতে ফ্লাইট ট্র্যাকিং ওয়েবসাইটগুলোতে গ্লুচেস্টারশায়ারের আরএএফ ফেয়ারফোর্ড থেকে একটি বি-১ বোমারু বিমানকে ইরানের দিকে উড়ে যেতে দেখা গেছে। এই যুদ্ধবিমানটি ২৪টি ২,০০০ পাউন্ডের বোমা বহন করতে পারে।
যুক্তরাজ্যে এর আগেও হামলা চালানোর চেষ্টা করেছে ইরান। গত বছরের মে মাসে এমন একটি হামলা চালানোর মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে তা নস্যাৎ করে দেওয়া হয়। পার্লামেন্টের গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা কমিটির ২০২৫ সালের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের বর্তমান শাসকগোষ্ঠী ব্রিটেনের অভ্যন্তরে অন্তত ১৫ জনকে হত্যা বা অপহরণের চেষ্টা করেছে। প্রতিবেদনে তারা ইরানের পক্ষ থেকে আসা একটি 'বিস্তৃত, দীর্ঘস্থায়ী এবং অনাকাঙ্ক্ষিত হুমকি'-র বিষয়ে সতর্ক করেছে।
গত বছর যুক্তরাজ্যের বিমানঘাঁটিগুলোর নিরাপত্তা দুর্বলতার চিত্র প্রকাশ্যে আসে, যখন 'প্যালেস্টাইন অ্যাকশন'-এর সদস্যরা আরএএফ ব্রাইজ নর্টন ঘাঁটিতে অনুপ্রবেশ করে দুটি সামরিক জেট ভাঙচুর করে। ওই ঘাঁটির কিছু অংশ মাত্র ৬ ফুটের একটি কাঠের বেড়া দিয়ে সুরক্ষিত ছিল। পরে দ্য টেলিগ্রাফ-এর এক অনুসন্ধানে উঠে আসে যে আরও কয়েকটি আরএএফ ঘাঁটির নিরাপত্তা ব্যবস্থা একইভাবে দুর্বল ছিল (নিরাপত্তার স্বার্থে সেগুলোর নাম প্রকাশ করা হয়নি)।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর চাগোস দ্বীপপুঞ্জের যৌথ ব্রিটিশ-মার্কিন সামরিক ঘাঁটি 'দিয়েগো গার্সিয়া'তে হামলার চেষ্টা করেছিল ইরান। এরপরই সামরিক প্রধানরা জানান, সম্ভাব্য ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার বিরুদ্ধে যুক্তরাজ্যের কোনো প্রতিরক্ষা নেই।
সাবেক এয়ার ভাইস-মার্শাল শন বেল বলেন, স্নায়ুযুদ্ধের সময় ব্রিটেনের এই ধরনের হামলা ঠেকাতে 'ব্ল্যাডহাউন্ড' ক্ষেপণাস্ত্র ছিল, কিন্তু বিনিয়োগের অভাবে পরবর্তীতে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে।
গত মার্চে বিবিসির সাথে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, 'উদ্বেগের বিষয় হলো, ইরান যদি আমাদের দিকে কোনো ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে, তবে ইসরায়েল, আমেরিকা কিংবা দিয়েগো গার্সিয়ার মতো আমাদের এই দেশে তা ঠেকানোর কোনো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নেই। যদিও আমরা এটি ট্র্যাক করতে পারব, তবে এটি আমাদের আঘাত করতে সক্ষম হবে। তবে আমি মনে করি এমনটি ঘটার সম্ভাবনা খুবই কম।'
বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে চলাচলকারী জাহাজে হুথি বিদ্রোহীদের হামলার কারণে গত মে মাসের পর এই প্রথম তেলের দাম আবার ১০০ ডলারের ওপরে উঠেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, ইরান লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল ব্যাহত করতে ইয়েমেনি মিলিশিয়াদের সক্ষমতা বাড়িয়ে তুলছে; যার উদ্দেশ্য হলো এই সংঘাতের নতুন একটি ফ্রন্ট উন্মুক্ত করা।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, গত ১৩ জুলাই জ্যেষ্ঠ কমান্ডার ও সামরিক উপদেষ্টাসহ আইআরজিসি-র অন্তত ১০ জন সদস্য তেহরান থেকে ইয়েমেনে যান। তারা সঙ্গে করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের অংশ এবং বিদ্রোহীদের কার্যক্রমের তহবিলের জন্য সোনা নিয়ে যান।
একটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, 'আইআরজিসি কমান্ডাররা হুথিদের অভিযানে সহায়তা করতে এবং নতুন ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার ওপর প্রশিক্ষণ দিতে সেখানে ভ্রমণ করেছিলেন।' এই সফরের তিন দিন আগে, আমেরিকা যদি ইরানের বিদ্যুৎ অবকাঠামোতে হামলা চালায়, তবে লোহিত সাগরের রুট বন্ধ করার জন্য হুথিদের প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিয়েছিল ইরান।
হুথিদের এই হামলার প্রতিক্রিয়ায় ট্রাম্প গত বৃহস্পতিবার বলেন, প্রক্সি গ্রুপের যেকোনো কর্মকাণ্ডের জন্য তিনি ইরানকে দায়ী করবেন এবং দেশটির ভূখণ্ডে আরও ভারী বোমাবর্ষণ করবেন। এর আগে গত বুধবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট সতর্ক করে বলেছিলেন, হরমুজ প্রণালিতে ইরান প্রতিটি জাহাজ আক্রমণের বিপরীতে তিনি দেশটির একটি করে সেতু বা বিদ্যুৎ কেন্দ্রে আঘাত করবেন।
গত বুধবার রাতে মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরান ও ইরাকের মধ্যকার 'শালামচেহ' সীমান্ত ক্রসিংয়ে হামলা চালায়। এতে ২ জন নিহত এবং ১১ জন আহত হয়েছেন বলে ইরানি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেন, 'যারা এই ধরনের আগ্রাসনে সাহায্য করবে, তা যে কোনো ধরনের সমর্থনই হোক না কেন, তাদেরও বৈধ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচনা করা হবে।'
ইরান বিষয়ক প্রভাবশালী বিশ্লেষক হামিদরেজা আজিজি বলেন, এই হামলার কারণে 'ব্যাপক উত্তেজনার' আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ তিনি লিখেছেন, এই হামলাটিকে ইরানিরা 'বিশেষ অভিযান বা স্থল বাহিনী মোতায়েনের সম্ভাব্য প্রস্তুতিমূলক পদক্ষেপ হিসেবে ব্যাখ্যা করছে।'
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে সূত্রগুলো জানিয়েছে, আমেরিকা তাদের বিশেষ সামরিক দল, চিকিৎসক এবং অস্ত্রশস্ত্র ইরানের কাছাকাছি এলাকায় মোতায়েন করেছে। চারজন মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার পর আহত সেনাদের চিকিৎসার প্রধান কেন্দ্র জার্মানির 'ল্যান্ডস্টুল আঞ্চলিক মেডিকেল সেন্টারে' ১৫০ জনেরও বেশি অতিরিক্ত চিকিৎসক পাঠানো হয়েছে।
ইতিমধ্যে, গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় হরমুজ প্রণালির কেশম দ্বীপে একটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে বলে ইরানি সরকারি গণমাধ্যম জানিয়েছে। কুয়েতের সশস্ত্র বাহিনী জানিয়েছে, তাদের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধেয়ে আসা ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের ওপর গুলিবর্ষণ করেছে, যা আরেকটি সংঘাতপূর্ণ রাতের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতিমধ্যে টানা ১৩ রাত ধরে ইরানে হামলা চালিয়েছেন এবং মার্কিন সামরিক বাহিনী আগামী দিনগুলোতে আরও বড় ধরনের হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। অতিরিক্ত এফ-৩৫ এবং এফ-১৬ যুদ্ধবিমান মোতায়েন করা হয়েছে এবং জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান ইসরায়েলে এসে পৌঁছেছে।
গত বৃহস্পতিবার বিকেলে ট্রাম্প বলেন, তিনি 'আগের চেয়েও বড়' এক 'তীব্র হামলা' চালানোর কথা বিবেচনা করছেন। এক্সিওসকে তিনি বলেন, 'আমি সিদ্ধান্তের খুব কাছাকাছি রয়েছি। আমরা এর জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত।'
মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ সতর্ক করে বলেছেন, কংগ্রেস যদি জরুরি অর্থায়নের অনুরোধ পাস না করে তবে পেন্টাগন 'মারাত্মক ঘাটতির' মুখে পড়বে। তিনি জানান, ইরান যুদ্ধের ব্যয় ইতিমধ্যে অন্তত ৩ হাজার ৭৫০ কোটি ডলারে গিয়ে ঠেকেছে।
