বোমা হামলার চেয়ে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাই ইরানের বেশি ক্ষতি করবে—ধারণা মার্কিন কর্মকর্তাদের
ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের অর্থনৈতিক চাপের কৌশল তার সামরিক হামলার তুলনায় অনেক কম আলোচনায় এসেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের ধারণা, শেষ পর্যন্ত এই অর্থনৈতিক চাপই তেহরানের শাসনব্যবস্থার জন্য বোমা হামলার চেয়েও বেশি ক্ষতিকর হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা তথ্য এবং উন্মুক্ত গণমাধ্যমের প্রতিবেদনগুলো ইঙ্গিত করছে যে, বিশ্বের অন্যতম প্রধান তেল সমৃদ্ধ দেশ হওয়া সত্ত্বেও ইরানের ভেতরে তীব্র অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হয়েছে, যার মধ্যে জ্বালানির সংকটও রয়েছে।
প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, 'ইরানিরা বোমাবর্ষণ বন্ধ করতে চায় এবং তারা টাকা চায়। তবে এটি আসলে উল্টো ক্রমে হচ্ছে। তারা মূলত সবার আগে টাকা চায়।'
টানা ১৩ দিন হামলার পর গত সপ্তাহান্তে ইরানে মার্কিন বিমান হামলা সাময়িকভাবে স্থগিত করেন ট্রাম্প। তিনি গত সোমবার দাবি করেন যে, তেহরান একটি চুক্তি নিয়ে আলোচনার জন্য বৈঠকের অনুরোধ জানিয়েছে। তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই এই দাবি অস্বীকার করেছেন।
উভয় পক্ষই ওমান, কাতার এবং পাকিস্তানের মতো মধ্যস্থতাকারীদের সাথে কথা বলছে, যারা এই সাময়িক যুদ্ধবিরতিকে একটি স্থায়ী চুক্তিতে রূপান্তর করার চেষ্টা করছে।
এই আলোচনার একটি বড় কেন্দ্রবিন্দু হলো এমন একটি প্রস্তাব, যা ইরান ও ওমানকে হরমুজ প্রণালিতে নৌ-চলাচল ব্যবস্থাপনায় কিছুটা কর্তৃত্ব এবং সম্ভাব্য রাজস্ব আদায়ের সুযোগ দেবে। এই ব্যবস্থাটি মূলত মালাক্কা ও সিঙ্গাপুর প্রণালিতে মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর এবং ইন্দোনেশিয়া কর্তৃক ব্যবহৃত সমবায় কাঠামোর আদলে তৈরি করা হবে।
ওই জ্যেষ্ঠ প্রশাসনিক কর্মকর্তা বলেন, 'কিছু ইরানি এটি চান, আবার অন্য অনেকে চান না। এটিই এখন একটি অন্যতম বড় সমস্যা।'
ইরান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে নিশ্চয়তা চায় যে তাদের ওপর আর কোনো হামলা চালানো হবে না। এছাড়া তারা তাদের অবরুদ্ধ করা তহবিল ফেরত এবং মার্কিন নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্তি চায়। তবে হরমুজ প্রণালিতে নৌ-চলাচল ব্যাহত করার জন্য ইরানকে কোনো ধরনের সুবিধা দেওয়ার বিষয়ে ট্রাম্প অত্যন্ত সতর্ক এবং তিনি দাবি করছেন যে তেহরানকে তাদের অবশিষ্ট পারমাণবিক উপাদানগুলো হস্তান্তর করতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের আরেক কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন যে, পূর্ণাঙ্গ বোমাবর্ষণের তুলনায় নিষেধাজ্ঞা এবং নৌ-অবরোধের মাধ্যমে তেহরানকে আলোচনার টেবিলে বাধ্য করতে অনেক বেশি সময় লাগবে। ট্রাম্প অবশ্য এখনও পূর্ণাঙ্গ বিমান হামলার অনুমোদন দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।
এই দীর্ঘায়িত সময়সীমা রিপাবলিকানদের রাজনৈতিক ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে; কারণ আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রচারণায় তাদের একটি অপ্রিয় যুদ্ধ এবং জ্বালানির চড়া দাম নিয়ে জনগণের প্রশ্নের মুখে পড়তে হবে।
গত সোমবার সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, 'আমার অনেক ধৈর্য রয়েছে।'
এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, 'গোয়েন্দা তথ্যে জানা গেছে যে ইরানিরা তাদের যোদ্ধাদের অর্থ পরিশোধ করতে পারছে না বলে অভিযোগ করছে। কেন? কারণ এই আর্থিক চাপ। কারণ মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ এবং ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট যা করছেন, তার ফলে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।'
ওই কর্মকর্তা আরও যোগ করেন, 'তাদের ব্যাংকগুলো দেউলিয়া হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এই বিশাল তেল সমৃদ্ধ দেশে তীব্র পেট্রোল সংকট দেখা দিয়েছে। তারা আসলে প্রতিরক্ষা দপ্তরের (পেন্টাগন) চেয়ে ট্রেজারি বিভাগকে বেশি ভয় পাচ্ছে।'
কর্মকর্তাদের মতে, মার্কিন আলোচক জ্যারেড কুশনার এবং স্টিভ উইটকফের সাথে আগের আলোচনাগুলোতে ইরানিরা স্পষ্ট করে দিয়েছিল যে, অর্থের নাগাল পাওয়া তাদের প্রধান অগ্রাধিকার। এক কর্মকর্তা দাবি করেন, 'তারা অর্থের জন্য স্টিভ ও জ্যারেডের কাছে একপ্রকার মিনতি করছে। তারা অর্থের জন্য অত্যন্ত মরিয়া।'
ট্রাম্প প্রশাসন তাদের পুনরুজ্জীবিত 'সর্বোচ্চ চাপ' অভিযানের অধীনে ইরানের তেল বাণিজ্য, ব্যাংকিং ব্যবস্থা, অস্ত্র সংগ্রহ এবং নৌ-পরিবহন নেটওয়ার্ককে লক্ষ্যবস্তু করে ১,০০০-এরও বেশি ব্যক্তি, জাহাজ এবং বিমানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।
ট্রাম্প বলেছেন যে, তিনি কূটনীতিকে সুযোগ দিতে বোমা হামলা সাময়িকভাবে স্থগিত করেছেন। তবে এক্সিওস জানিয়েছে, তার এই সিদ্ধান্তটি জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইনের দেওয়া একটি সতর্কবার্তা অনুসরণ করে এসেছে। কেইন সতর্ক করেছিলেন যে, মধ্যপ্রাচ্যের সেন্ট্রাল কমান্ডের মার্কিন অস্ত্রের মজুত, বিশেষ করে আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের সরবরাহ কমে আসছে।
এক জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা কেইনের এই সতর্কবার্তাকে একটি স্বাভাবিক সামরিক প্রক্রিয়া হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, 'আমাদের সামগ্রিক অস্ত্রের মজুত একদম শূন্য বা শেষ হয়ে যায়নি। তবে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা মজুত থেকে যখন আপনাকে অস্ত্র স্থানান্তর করতে হয়, তখন কিছু ঝুঁকি থাকে। আপনাকে এটি কমান্ডার ইন চিফের কাছে পেশ করতে হবে। তিনিই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন।'
তবে ট্রাম্পের যুদ্ধ নীতির সমালোচকেরা বলছেন যে, প্রেসিডেন্টের সামনে ভালো কোনো বিকল্প পথ নেই। সামরিক হামলা বা অর্থনৈতিক চাপ আসলেই ইরানকে ট্রাম্পের শর্তগুলো মেনে নিতে বাধ্য করবে কি না, তা নিয়ে তারা সংশয় প্রকাশ করেছেন।
'অবসিডিয়ান রিস্ক অ্যাডভাইজার্স'-এর বিশ্লেষক ব্রেট এরিকসনের তথ্য অনুযায়ী, বছরের প্রথমার্ধে ইরান তেল বিক্রি থেকে আনুমানিক ২ হাজার ৩০০ কোটি ডলার রাজস্ব আয় করেছে—যা তাদের বাজেট অনুমানকেও ছাড়িয়ে গেছে।
গত সোমবার এক্স-এ এরিকসন লিখেছেন, 'অর্থনৈতিক যুদ্ধ আসলে ইরান যুদ্ধের জন্য একটি সম্পূর্ণ ত্রুটিপূর্ণ পদ্ধতি।'
হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট এক্সিওস-কে বলেন, ট্রাম্প 'একটি কূটনৈতিক সমাধান পছন্দ করেন, তবে ইরান যদি হরমুজ প্রণালিতে তাদের সন্ত্রাসী কার্যক্রম বা মিত্রদের ওপর হামলা অব্যাহত রাখে, তবে তার সামনে সব বিকল্পই খোলা রয়েছে।'
তিনি বলেন, 'নিষেধাজ্ঞাগুলো ইরানের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিয়েছে এবং তাদের বারবার আগ্রাসনের জবাবে সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে টানা ১৩ দিন হামলা চালানো হয়েছে। এ অবস্থায় ইরানের জন্য একটি সমঝোতায় আসা বুদ্ধিমানের কাজ হবে। অন্যথায় কী ঘটবে তা তারা ভালো করেই জানে।'
যুক্তরাষ্ট্রের আরেক কর্মকর্তা বলেন, 'প্রেসিডেন্টের সামনে একটি সুবিধাজনক পরিস্থিতি রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এটিকে সামরিকভাবে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যেতে সম্পূর্ণ সক্ষম। আবার একই সাথে তারা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রয়োগ করে ইরানকে পঙ্গু করে দিতেও সক্ষম।'
