সস্তা চীনা প্রতিদ্বন্দ্বীদের হুমকিতে যুক্তরাষ্ট্রের এআই ল্যাবগুলো
যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নির্মাতাদের অবস্থার কথা একবার ভাবুন। প্রতিবার নতুন প্রজন্মের কোনো ফ্রন্টিয়ার মডেল উন্মোচনে তারা বিপুল অর্থ, শ্রম ও সময় বিনিয়োগ করে, অথচ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার আগেই প্রতিদ্বন্দ্বীরা তাদের ধরে ফেলে।
শুধু অর্থের বিনিময়ে প্রযুক্তি বিক্রি করা প্রতিদ্বন্দ্বীরা যদি তাদের পিছু নিত, তবু বিষয়টি একরকম ছিল। কিন্তু অ্যানথ্রপিক ও ওপেনএআইয়ের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে এখন এমন সব গবেষণাগারের সঙ্গেও প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে, যারা নিজেদের এআই মডেল বিনা মূল্যে সবার জন্য উন্মুক্ত করে দিচ্ছে।
গত ১৬ জুলাই চীনা স্টার্টআপ 'মুনশট এআই' তাদের তৈরি 'কিমি কে৩' মডেলটি বাজারে এনেছে। এই মডেলটি অ্যানথ্রোপিক-এর 'ফেবল' এবং ওপেনএআই-এর 'সল' মডেলের চেয়ে সামান্য পিছিয়ে রয়েছে। চলতি মাসের শেষের দিকে এর প্যারামিটারগুলো (যা এআই-এর ভাষায় 'ওয়েটস' নামে পরিচিত) সম্পূর্ণ বিনামূল্যে সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে। এর অর্থ হলো, যেকোনো শক্তিশালী সার্ভারে এটি ডাউনলোড করে চালানো যাবে। এরপর গত ১৯ জুলাই চীনের ইন্টারনেট জায়ান্ট আলিবাবা তাদের 'কিউয়েন' মডেলের নতুন একটি সংস্করণ উন্মোচন করেছে, যা কোম্পানির মতে ফেবলের পরেই দ্বিতীয় সেরা মডেল।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান 'ইপক এআই'-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সবচেয়ে শক্তিশালী ওপেন-ওয়েট মডেলগুলো মূলত চীন থেকেই আসছে এবং এগুলো ফ্রন্টিয়ার প্রযুক্তির চেয়ে মাত্র কয়েক মাস পিছিয়ে রয়েছে। এসব মডেলের ব্যবহার অত্যন্ত দ্রুত গতিতে ছড়িয়ে পড়ছে। গত মে মাসে এআই মডেলের জনপ্রিয় মার্কেটপ্লেস 'ওপেনরাউটার'-এর গ্রাহকদের টোকেন ব্যবহারের হার বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, তারা আমেরিকার শীর্ষ ল্যাবগুলোর মডেল এবং চীনের শীর্ষ ল্যাবগুলোর মডেল প্রায় সমান পরিমাণে ব্যবহার করেছেন। তবে পরের মাসেই মার্কিন মডেলগুলোর ব্যবহার দুই-তৃতীয়াংশ বাড়লেও চীনা মডেলগুলোর ব্যবহার বেড়েছে তিন গুণ।
এই পরিস্থিতি কেবল আমেরিকার নেতৃস্থানীয় মডেল নির্মাতাদের মধ্যেই নয়, বরং মার্কিন সরকারের মধ্যেও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। তাদের ভয়, এআই প্রযুক্তিতে আমেরিকা তার আধিপত্য হারাতে পারে এবং সাইবার হামলার নতুন ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরের কেউ কেউ চীনা মডেলগুলোর বিস্তার ধীর করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছেন বলে জানা গেছে; যার মধ্যে রয়েছে চীনা ল্যাবগুলোকে বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞার তালিকায় যুক্ত করা বা মার্কিন কোম্পানিগুলোকে এসব মডেল ব্যবহারে সতর্ক করা। এছাড়া চীনা ল্যাবগুলো নিজেদের সিস্টেম প্রশিক্ষণের জন্য মার্কিন মডেল ব্যবহার করছে—যা 'ডিস্টিলেশন' নামে পরিচিত—এমন অভিযোগ নিয়েও ক্ষোভ রয়েছে। তবে ফেবল এবং সল-এর মতো উন্নত মডেলগুলোর ব্যবহারের ওপর মার্কিন সরকারের অনাকাঙ্ক্ষিত বিধিনিষেধ প্রকারান্তরে চীনের ওপেন-ওয়েট বিকল্পগুলোর ব্যবহার আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
কে৩-এর আগেও চীনের ওপেন-ওয়েট মডেলগুলো বিশ্বজুড়ে আগ্রহ তৈরি করেছিল। গত জুনে চীনের আরেকটি ল্যাব 'জেড.এআই' তাদের 'জিএলএম-৫.২' মডেলটি বাজারে আনে। এটি সফটওয়্যার তৈরির মতো জটিল 'এজেন্টিক' কাজে আমেরিকার আরেক শীর্ষ ল্যাব গুগলের যেকোনো বর্তমান মডেলের চেয়েও ভালো পারফর্ম করে। এছাড়া 'ডিপসিক' এবং 'মিনিম্যাক্স' নামের আরও দুটি চীনা ল্যাবের মডেলও বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
ফায়ারফক্স ব্রাউজার নির্মাতা প্রতিষ্ঠান 'মজিলা'-র একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, জটিল যুক্তিনির্ভর কাজ এবং এজেন্টিংয়ের ক্ষেত্রে ওপেন-ওয়েট মডেলগুলো এখনও ফ্রন্টিয়ার প্রযুক্তির চেয়ে কিছুটা পিছিয়ে থাকলেও, সাধারণ অনেক কাজের জন্য এগুলো 'যথেষ্ট ভালো' হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এগুলোর খরচ অনেক কম। এআইয়ের পেছনে ক্রমবর্ধমান ব্যয় নিয়ে হিমশিম খাওয়া কোম্পানিগুলোর জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। 'আর্টিফিশিয়াল অ্যানালাইসিস' নামের আরেকটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন এআই মডেলের কাজের খরচ নিয়ে পরীক্ষা চালিয়েছে। তাদের তথ্য অনুযায়ী, ডিপসিক-এর সবচেয়ে শক্তিশালী সিস্টেমে প্রতি কাজের জন্য গড়ে খরচ হয় ০.০৪ ডলার। অন্যদিকে কে৩ মডেলের (যা এখনও ওপেন-ওয়েট করা হয়নি) খরচ গড়ে ০.৯৫ ডলার। আর মার্কিন ফেবল মডেল ব্যবহারের ক্ষেত্রে ব্যবহারকারীদের গুনতে হচ্ছে গড়ে ২.৭৫ ডলার।
খরচের এই বিশাল পার্থক্যের অন্যতম কারণ হলো, যেকোনো ক্লাউড সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান এই ওপেন-ওয়েট মডেলগুলোর অ্যাক্সেস বিক্রি করতে পারে, যা সেবাদাতাদের লভ্যাংশ কমিয়ে দেয়। উদাহরণস্বরূপ, ডিপসিক তাদের 'ভি৪ ফ্ল্যাশ' মডেলের প্রতি মিলিয়ন টোকেনের জন্য ০.২৮ ডলার চার্জ করে; যেখানে সবচেয়ে সস্তা তৃতীয় পক্ষের ক্লাউড সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান একই মডেলের অ্যাক্সেস দিচ্ছে মাত্র ০.১৮ ডলারে।
তাছাড়া, চীনা ল্যাবগুলোর ওপর মার্কিন চিপ নিষেধাজ্ঞার কারণে তারা কম্পিউটিং পাওয়ারের সংকটে পড়েছে। ফলে তারা মডেলগুলোকে অত্যন্ত সাশ্রয়ী ও দক্ষ উপায়ে গড়ে তোলার ওপর বিশেষ নজর দিয়েছে। যেমন 'মিক্সচার অব এক্সপার্টস' প্রযুক্তি—যা ব্যবহারকারীর জিজ্ঞাসার ওপর ভিত্তি করে এআই সিস্টেমের কেবল নির্দিষ্ট অংশকে সক্রিয় করে—তা চীনা ওপেন-ওয়েট ডেভেলপাররা ব্যাপকভাবে ব্যবহার করছে। ডিপসিক এবং আলিবাবার মতো ল্যাবগুলো এই প্রযুক্তিতে দারুণ অগ্রগতি অর্জন করেছে।
তবে ওপেন-ওয়েট মডেলগুলোর আকর্ষণ আরও গভীর। সম্প্রতি মার্কিন সরকারের একটি তাড়াহুড়ো সিদ্ধান্তের কারণে মার্কিন নাগরিক ছাড়া বাকি বিশ্বের জন্য 'ফেবল' মডেলটি তিন সপ্তাহের জন্য বন্ধ ছিল। এই ঘটনা অনেক কোম্পানিকে নির্দিষ্ট কোনো এআই ল্যাবের ওপর অতি-নির্ভরশীলতা নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। এটি তাদের এমন সব ওপেন-ওয়েট বিকল্পগুলো নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে উৎসাহিত করেছে, যা বিভিন্ন সেবাদাতার মাধ্যমে ব্যবহার করা যায় এবং এমনকি নিজস্ব অভ্যন্তরীণ সার্ভারেও চালানো যায়। মজিলা-র প্রধান প্রযুক্তিবিদ রাফি ক্রিকোরিয়ান এই পরিস্থিতিটিকে সতর্কবার্তা বা 'শট অ্যাক্রস দ্য বো' হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
তবে চীনের ওপেন-ওয়েট মডেলগুলোও দীর্ঘমেয়াদে পুরোপুরি নির্ভরযোগ্য নাও হতে পারে। চীনা সরকারও নাকি বিদেশিদের জন্য তাদের প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের কথা ভাবছে, যার মধ্যে চীনের বাইরে ওপেন-ওয়েট মডেলগুলো ডাউনলোড করার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়টিও থাকতে পারে। আর এমনটি ঘটলে আমেরিকার এআই ল্যাবগুলো নিশ্চিতভাবেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলবে।
