হোয়াইট হাউসের কাছে ক্ষেপণাস্ত্র মজুতের ঘাটতি গোপন করছে পেন্টাগন, অভ্যন্তরীণদের আশঙ্কা
হোয়াইট হাউসের কাছে ক্ষেপণাস্ত্র ঘাটতির প্রকৃত অবস্থা প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন গোপন করছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন মার্কিন প্রশাসনের অভ্যন্তরীণরা।
এদিকে গত রোববার ইরানের হামলায় তিন মার্কিন সেনা সদস্যের মৃত্যুর পর— ইরানের বিরুদ্ধে পাল্টা কঠোর সামরিক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি হয়েছে। তবে মার্কিন প্রশাসনের ভেতরে জোর গুজব ছড়িয়ে পড়েছে যে, পুনরায় যুদ্ধ জোরদার করার জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় 'ইন্টারসেপ্টর' বা প্রতিরোধকারী ক্ষেপণাস্ত্রের চরম ঘাটতির কথা আড়াল করছে পেন্টাগন। এমনকি এমন ইঙ্গিতও উঠে আসছে যে, হোয়াইট হাউস নিজেও এই ঘাটতির প্রকৃত ভয়াবহতা সম্পর্কে জানতে আগ্রহী নয়।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প প্রশাসনের এক কর্মকর্তা বলেন, "যে কারও জন্যই কোনো 'খারাপ খবর' বা 'বাস্তবভিত্তিক তথ্য' দেওয়া শুভ পরিণতি বয়ে আনছে বলে মনে হয় না।" অপর এক কর্মকর্তা জানান, পেন্টাগনে চেপে বসা এই "নীরবতার সংস্কৃতি" মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের জন্য জটিলতা তৈরি করেছে।
গত মার্চে থিঙ্ক ট্যাঙ্ক– রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের (আরইউএসআই) প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে জানা যায়, যুদ্ধের প্রথম ১৬ দিনেই যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ১১ হাজারেরও বেশি মিউনিশন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে ফেলেছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি পূর্বাভাস দিয়েছিল যে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র ও ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত শেষ হয়ে যাওয়া থেকে পেন্টাগন আর মাত্র এক মাস দূরে রয়েছে।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে পূর্ণ যুদ্ধের প্রস্তুতিতে রেখেছেন। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, তেহরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ আগের চেয়ে আরও বেশি তীব্রতা ও বড় পরিসরে পুনরায় শুরু হতে পারে।
ইরানি হামলায় জর্ডানের একটি বিমানঘাঁটিতে দুজন এবং ইরাকে আরও এক মার্কিন সেনার মৃত্যুর পর—প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক ঘোষণায় বলেন, "ইরান যখনই কোনো মার্কিন সেনাকে হত্যা করবে, তাদের সেই হত্যার জন্য বহু গুণ বেশি মাশুল গুনতে হবে!" ট্রাম্প জানান, তিনি প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ, জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান ড্যান কেইন এবং অন্যান্য সামরিক শীর্ষ কর্মকর্তাদের প্রতি এই নির্দেশ জারি করেছেন।
এদিকে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, ব্রিটেন ও জার্মানির সামরিক ঘাঁটি থেকে এফ-৩৫ এবং এফ-১৬ যুদ্ধবিমান মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করা হয়েছে এবং মাঝআকাশে জ্বালানি ভরার উপযোগী 'এরিয়াল রিফুয়েলিং' বিমানও সেখানে পাঠানো হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি ইরানের অন্যতম প্রধান সমুদ্রবন্দর 'বন্দর আব্বাস'-এর চারপাশের সেতুগুলোতে আঘাত হেনেছে। ট্রাম্প বারবার ইরানের বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলা চালানোর হুমকি দিলেও— এর আগে পর্যন্ত সেই সীমা অতিক্রম করা থেকে বিরত ছিলেন।
এতদিন মার্কিন বাহিনী মূলত উপকূলীয় এলাকার ইরানি লক্ষ্যবস্তুগুলোতে তাদের হামলা সীমাবদ্ধ রেখেছিল। তবে গত সপ্তাহে যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার পর থেকে তারা ইরানের ভেতরের লক্ষ্যবস্তুগুলোতেও হামলা চালাতে শুরু করেছে।
একটি সূত্র জানিয়েছে, পেন্টাগন এখন ক্রমশ এই ধারণায় উপনীত হচ্ছে যে, হরমুজ প্রণালির অবরুদ্ধ অবস্থা ছাড়ানোর একমাত্র উপায় হলো সংঘাতকে আরও বাড়িয়ে তোলা এবং আরও আক্রমণাত্মক রূপ দেওয়া।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান সোমবার বলেন, তাঁর দেশ একটি "পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে" লিপ্ত রয়েছে। তবে এমন প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ পুনরায় শুরু করার জন্য কতটা প্রস্তুত, তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
গত এপ্রিলের শুরুতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছিল এবং উভয় পক্ষের পাল্টাপাল্টি হামলার কারণে থেকে থেকে তা বিঘ্নিত হলেও, ওই বিরতি মার্কিন বাহিনীকে তাদের গুরুত্বপূর্ণ গোলাবারুদ ও ক্ষেপণাস্ত্র মজুত ধরে রাখতে সাহায্য করেছিল। কিন্তু এখন যে ক্ষেপণাস্ত্র ঘাটতির তথ্য উঠে আসছে, তা সংঘাত বাড়ানোর যেকোনো মার্কিন প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করে দিতে পারে এবং মধ্যপ্রাচ্যে নিয়োজিত মার্কিন সেনাদের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিস-এর গবেষক রায়ান ব্রোবস্ট জানান, যুক্তরাষ্ট্রের 'টার্মিনাল হাই অ্যালটিটিউড এরিয়া ডিফেন্স' (থাড) ইন্টারসেপ্টর এবং 'প্যাট্রিয়ট অ্যাডভান্সড ক্যাপাবিলিটি-৩' (প্যাক-৩) প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত নিয়ে বিশেষ দুশ্চিন্তা রয়েছে।
তিনি বলেন, "আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা উপকরণের মজুত কমে যাওয়ার প্রধান কুফল হলো, সেনা সদস্যদের জন্য শত্রুপক্ষের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যাওয়া। উদাহরণস্বরূপ, ধেয়ে আসা একটি ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করতে সাধারণত যেখানে দুটি প্রতিরোধক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়তে হয়, সেখানে ঘাটতির কারণে আপনাকে একটি মাত্র ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়তে হবে। এর ফলে শত্রুর ক্ষেপণাস্ত্রটিকে মাঝআকাশে ধ্বংস করার সম্ভাবনাও অনেকাংশে কমে যায়।"
ইরানের বিরুদ্ধে 'অপারেশন এপিক ফিউরি' সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের টমাহক ও থাড ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ-এর প্রাক্কলন অনুযায়ী, টমাহক ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত অপারেশন এই অভিযানের আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে ২০৩১ সাল পর্যন্ত এবং থাড ক্ষেপণাস্ত্রের ক্ষেত্রে ২০২৯ সাল পর্যন্ত সময় লাগবে।
আমেরিকার সামরিক অস্ত্রের মজুতের তথ্যটি প্রশাসনের মধ্যে অত্যন্ত গোপনীয় বিষয় হিসেবে গণ্য করা হয়; হাতেগোনা সামান্য কয়েকজন কর্মকর্তার কাছে এই তথ্যের নাগাল রয়েছে। ফলে এখন প্রশ্ন উঠেছে—শীর্ষ নীতিনির্ধারকদের কি আসলেই এই বাস্তব তথ্য সম্পর্কে পুরোপুরি অবহিত রাখা হচ্ছে?
দ্য টেলিগ্রাফকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এক সূত্র [কর্মকর্তা] জানান, প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথ সামরিক বাহিনীর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের ছাঁটাই বা পদচ্যুত করার মানসিকতার কারণে পেন্টাগনে এক ধরনের "নীরবতার সংস্কৃতি" গড়ে উঠেছে।
নাম না প্রকাশের শর্তে ওই কর্মকর্তা বলেন, "পেন্টাগন [প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথ] কিংবা হোয়াইট হাউসের কাছে কতটা সততা বজায় রাখছে, তা নিয়ে আমার যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। কারণ কোনো খারাপ খবর বা বাস্তব সত্য প্রকাশ করা এখানে কারও জন্যই ভালো পরিণতি আনে না।"
তিনি আরও যোগ বলেন, "আমাদের ওপর নীতিনির্ধারণী শীর্ষ মহলের বিশৃঙ্খলা সত্ত্বেও—কেবল বাহিনীর সেনাদের সুরক্ষার কথা ভেবে পেন্টাগনের স্বাভাবিক কাজকর্ম যথাসম্ভব সচল রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন সবাই—এবং সেই সঙ্গে নিজেদের চাকরি বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টাও করছেন।"
অপর এক সূত্র বলেন, "হেগসেথ তাঁর কাছের নীতিনির্ধারণী বৃত্ত মাত্র হাতেগোনা কয়েকজন ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলার পর থেকেই এই নীরবতার সংস্কৃতি [হেগসেথের নিজের জন্যই] বড় সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে।"
তিনি আরও বিস্তারিত জানিয়ে বলেন, "যখন তিনি [হেগসেথ] প্রেসিডেন্টকে পরামর্শ দেন বা কংগ্রেসে বক্তব্য রাখতে যান, তখন তাঁর কাছে সমস্ত তথ্য থাকে না। কারণ তাঁর শীর্ষ উপদেষ্টারাও তাঁর ক্ষোভ এড়াতে তথ্য লুকিয়ে রাখতে চান।"
সূত্রটি আরও জানিয়েছে, অস্ত্র সংগ্রহ ও ক্রয় সংক্রান্ত পেন্টাগনের আন্ডার-সেক্রেটারি মাইক ডাফি ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত পুনরুদ্ধারে মূল ভূমিকা রাখার কথা থাকলেও, তিনি 'ভদ্রলোক' হিসেবে পরিচিত এবং 'পিটের (হেগসেথ) কাছে খারাপ কোনো খবর নিয়ে যেতে অত্যন্ত অপছন্দ করেন'। সে কারণে তিনি প্রতিরক্ষামন্ত্রীর নজর এড়িয়ে থাকার চেষ্টা করেন।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্টকে এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, যুক্তরাষ্ট্র একটি "বৃহত্তর ও বিস্তৃত যুদ্ধের পরিকল্পনা করছে"; তবে তাদের এই পরিকল্পনা আকাশ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও দূরপাল্লার গোলাবারুদের ক্রমাগত কমে যাওয়া মজুতের কারণে সীমাবদ্ধ হতে বাধ্য।
ওই কর্মকর্তা সতর্ক করে দিয়ে বলেন, "নিরাপদে দীর্ঘমেয়াদী সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়ার মতো পর্যাপ্ত অস্ত্র আমাদের নেই। আমার মনে হয় না হোয়াইট হাউস বিষয়টি সম্পর্কে বিন্দুমাত্র অবগত আছে।"
এদিকে ইরান যুদ্ধ কীভাবে পরিচালনা করা হচ্ছে, তা নিয়ে পেন্টাগনের বিরুদ্ধে স্বচ্ছতার অভাবের অভিযোগ ওঠার ঘটনা অবশ্য এটিই প্রথম নয়। প্রভাবশালী মার্কিন দৈনিক দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত সপ্তাহে মার্কিন সেনাদের লক্ষ্য করে পরিচালিত তিনটি হামলার খবর প্রতিরক্ষা দপ্তর প্রকাশ করেনি। এসব হামলায় বেশ কয়েকজন মার্কিন সেনা আহত হন ও কয়েকটি হেলিকপ্টার ধ্বংস হয়।
তবে পেন্টাগন জোর দিয়ে দাবি করেছে যে, সামরিক বাহিনী কোনো অবস্থাতেই হতাহতের সংখ্যা গোপন বা ভুলভাবে তুলে ধরেনি। পেন্টাগনের প্রধান মুখপাত্র শন পার্নেল বলেন, "তথ্য গোপনের যেসব দাবি করা হচ্ছে, সেগুলো একেবারেই মনগড়া। যুদ্ধে তিন মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে আমেরিকান জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি ও আতঙ্ক ছড়ানোর উদ্দেশ্যেই এই বানোয়াট কথা রটানো হচ্ছে।"
ট্রাম্প প্রশাসন কংগ্রেসকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখেছে বলে অভিযোগ তুলে গত মঙ্গলবার ডেমোক্র্যাট সদস্যরা ১.১৫ ট্রিলিয়ন ডলারের বিশাল প্রতিরক্ষা বাজেট বিল 'ন্যাশনাল ডিফেন্স অথরাইজেশন অ্যাক্ট' আটকে দেন। তবে হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অ্যানা কেলি দাবি করেছেন যে, মার্কিন সামরিক বাহিনীর কাছে গোলাবারুদের কোনো সংকট নেই।
তিনি বলেন, "প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সমস্ত কৌশলগত লক্ষ্য এবং তার পরবর্তী যেকোনো প্রয়োজন পূরণের জন্য মার্কিন সামরিক বাহিনীর কাছে পর্যাপ্ত পরিমাণের চেয়েও বেশি অস্ত্র, গোলাবারুদ ও সামগ্রী মজুত রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে লাগতে এলে কী পরিণতি ঘটে, 'অপারেশন এপিক ফিউরি' বিশ্ববাসীকে তা স্পষ্ট করে দেখিয়ে দিয়েছে।"
অ্যানা কেলি আরও যোগ করেন, "এর পরও প্রেসিডেন্ট আমাদের প্রতিরক্ষা ঠিকাদারদের বিশ্বের সেরা 'মেড ইন আমেরিকা' অস্ত্রের উৎপাদন অবিরাম বাড়িয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। ডেমোক্র্যাটরা আমাদের সামরিক বাহিনীকে ধ্বংস করে দিয়েছিল, কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সেটিকে নতুন করে পুনর্গঠন করেছেন।"
