অস্ত্র নীতিমালায় পরিবর্তনের সুযোগে কোটি কোটি ডলার আয় করতে পারেন ট্রাম্পের ছেলে
যুক্তরাষ্ট্রে ক্রেতাদের সরাসরি বাড়িতে বন্দুক বা আগ্নেয়াস্ত্র পাঠানোর সুযোগ দিয়ে একটি বড় ধরনের নীতিনির্ধারণী পরিবর্তনের তোড়জোড় করছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। এই খসড়া প্রস্তাবটি চূড়ান্ত হলে সবচেয়ে বেশি লাভবান হতে পারেন প্রেসিডেন্টের ছেলে ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়র। তিনি 'অস্ত্রের আমাজন' নামে পরিচিত অন্যতম শীর্ষ অনলাইন অস্ত্র বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান 'গ্র্যাবএগান'-এর একজন বড় শেয়ারহোল্ডার এবং পরিচালনা পর্ষদের সদস্য।
যুক্তরাষ্ট্রের ব্যুরো অব অ্যালকোহল, টোব্যাকো, ফায়ারআর্মস অ্যান্ড এক্সপ্লোসিভস (এটিএফ) এই নিয়ম পরিবর্তনের প্রস্তাবটি এনেছে। এটি বাস্তবায়িত হলে তা হবে গত দুই দশকের মধ্যে মার্কিন অস্ত্র নীতিতে সবচেয়ে বড় ও সুদূরপ্রসারী পরিবর্তন। রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ১০ জন শিল্প কর্মকর্তা, দোকান মালিক এবং অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ আইনজীবী জানিয়েছেন, এই নিয়মের ফলে অনলাইনে অস্ত্র বিক্রির পরিমাণ নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পাবে।
প্রস্তাবিত নিয়মের আওতায়, লাইসেন্সধারী ডিলাররা সরাসরি রাজ্যের বাসিন্দাদের বাড়িতে অস্ত্র পাঠাতে পারবেন। তবে এর জন্য ক্রেতাকে অনলাইন পরিচয় যাচাইকরণ ও ব্যাকগ্রাউন্ড চেকের মধ্য দিয়ে যেতে হবে। এছাড়া স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনকে জানানোর পর সাত দিনের একটি 'অপেক্ষার সময়' (ওয়েটিং পিরিয়ড) পার করতে হবে। বর্তমানে অনলাইন ক্রেতাদের সশরীরে দোকানে গিয়ে এবং ব্যাকগ্রাউন্ড চেক শেষ করে অস্ত্র সংগ্রহ করতে হয়।
অস্ত্রের হোম ডেলিভারি চালু হলে সরাসরি লাভবান হবেন ট্রাম্প জুনিয়র। গ্র্যাবএগানে তার ৩ লাখেরও বেশি শেয়ার রয়েছে, যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৭ লাখ মার্কিন ডলার (গত বছর যা ছিল ৫০ লাখ ডলারের বেশি)। গত বছর একটি স্পেশাল পারপাস অ্যাকুইজিশন কোম্পানি (এসপিএসি) মার্জারের মাধ্যমে ১ কোটি ১৯ লাখ ডলারের বিনিময়ে প্রতিষ্ঠানটিকে পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি হিসেবে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করতে সহায়তা করেছিলেন ট্রাম্প জুনিয়র। ওই মার্জারটি এনেছিল ১৭৮৯ ক্যাপিটাল নামের প্রতিষ্ঠান, যেখানে ট্রাম্প জুনিয়র একজন পার্টনার। বিগত এক বছরে প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারের দাম প্রায় ৮৫ শতাংশ কমে গেছে।
তবে ট্রাম্প জুনিয়রের মুখপাত্র অ্যান্ড্রু সুরাবিয়ান এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, এটিএফ-এর এই প্রস্তাবের পেছনে প্রেসিডেন্টের ছেলের কোনো ভূমিকা নেই। তিনি বলেন, 'ডন (ট্রাম্প জুনিয়র) একজন আজীবন ব্যবসায়ী এবং আমাদের সংবিধানের দ্বিতীয় সংশোধনীর (অস্ত্র রাখার অধিকার) একজন কড়া সমর্থক। তিনি যে সব কোম্পানিতে বিনিয়োগ বা পরামর্শ দেন, সেগুলোর স্বার্থে সরকারের সাথে কোনো যোগাযোগ করেন না এবং এই সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তের সাথে তার কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না।'
গ্র্যাবএগানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মার্ক নেমাতিও রয়টার্সকে জানিয়েছেন, এই প্রস্তাব যে আসছে তা তিনি বা ট্রাম্প জুনিয়র কেউই জানতেন না। তবে মে মাসের এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে তিনি অত্যন্ত আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেছিলেন, 'আমরা বিশ্বাস করি গ্র্যাবএগান এই সম্ভাব্য সুযোগের সম্পূর্ণ সুবিধা নেওয়ার জন্য অনন্য অবস্থানে রয়েছে।' প্রতিষ্ঠানটির ১০ কোটি ডলারের বার্ষিক রাজস্বে এই পরিবর্তনের সম্ভাব্য প্রভাব তারা এখনও বিশ্লেষণ করছেন বলে জানান তিনি।
এটিএফ-এর প্রাক্কলন অনুযায়ী, প্রায় অর্ধেক অস্ত্র ক্রেতা—বছরে প্রায় ৩৩ লাখ মানুষ—পরবর্তীতে এই হোম ডেলিভারি পদ্ধতি ব্যবহার করতে শুরু করবেন। এটিএফ-এর প্রধান আইনজীবী রবার্ট লাইডার রয়টার্সকে জানান, আধুনিক অর্থনীতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে অস্ত্র শিল্পকে এগিয়ে নিতে এই নিয়মের খসড়া তৈরি করা হয়েছে। সংস্থাটি হিসাব করেছে যে, এই পরিবর্তনের ফলে যাতায়াত ও প্রক্রিয়াকরণের সময় বেঁচে যাওয়ায় গ্রাহকদের বার্ষিক ১০ কোটি ৩৭ লাখ ডলার সাশ্রয় হবে।
তিনি আরও জানান, রয়টার্স প্রশ্ন করার আগে গ্র্যাবএগানের সাথে ট্রাম্প জুনিয়রের সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে তিনি অবগত ছিলেন না এবং এই নীতিমালায় ট্রাম্প জুনিয়রের কোনো প্রভাব ছিল না। হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে, প্রেসিডেন্টের ছেলের সাথে এই বিষয়ে কোনো যোগাযোগের রেকর্ড বা তথ্য তাদের কাছে নেই।
অস্ত্রের সহজলভ্যতা বাড়াতে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে প্রেসিডেন্টের দেওয়া এক নির্বাহী আদেশের জবাবে এটিএফ বসন্তে যে ৩৪টি নিয়ন্ত্রণ শিথিলকারী পদক্ষেপের প্রস্তাব করেছিল, এটি তারই একটি।
অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠন এই প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করছে। ২০ বছরেরও বেশি সময় এটিএফ-এ কাজ করা মারিয়ানা মিচেম বলেন, 'এটিএফ সবসময় বলে বন্দুকের দোকানই হলো অস্ত্র সুরক্ষার প্রথম ঢাল। কিন্তু এখন তারা এটি সম্পূর্ণ উল্টে দিচ্ছে।'
এভরিটাউন, ব্র্যাডি এবং গিফোর্ডসের মতো অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ গোষ্ঠীগুলো যুক্তি দিয়েছে যে, লাখ লাখ অস্ত্র সরাসরি মানুষের বাড়ি পাঠানো শুরু হলে অবৈধ অস্ত্র পাচার, ডাক চুরির মাধ্যমে অস্ত্র ছিনতাই এবং বেনামী বা ছদ্মনামে অস্ত্র কেনার ঝুঁকি মারাত্মকভাবে বেড়ে যাবে।
গিফোর্ডসের মুখপাত্র আনিসা ম্যাকমিলান বলেন, 'অনলাইন পরিচয় যাচাইয়ের শক্তিশালী পদ্ধতি থাকলেও, একজন বিক্রেতার পক্ষে এটি জানা সম্ভব নয় যে ইন্টারনেটে কেনা অস্ত্রটি অন্য কারও হাতে চলে যাচ্ছে কি না।'
একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ডাক বিভাগও (ইউএসপিএস) হ্যান্ডগান বা পিস্তল মেইলে পাঠানোর ওপর থাকা শত বছরের পুরোনো নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার একই ধরনের প্রস্তাব করেছে।
ছোট বন্দুকের দোকানদাররা জানিয়েছেন, এই প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে তাদের বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হবে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের ছোট বিক্রেতারা অনলাইন কেনাকাটার বিপরীতে সশরীরে ব্যাকগ্রাউন্ড চেক এবং ডেলিভারি সম্পন্ন করার জন্য প্রায় ৩০ ডলার পর্যন্ত 'ট্রান্সফার ফি' চার্জ করে বেঁচে থাকেন। এই প্রক্রিয়ায় দোকানে আসা গ্রাহকেরা বারুদ ও অন্যান্য অনুষঙ্গও কিনে থাকেন, যা তাদের প্রধান আয়ের উৎস। মিসৌরির 'বো অ্যান্ড ব্যারেল স্পোর্টসম্যান সেন্টার'-এর ক্রিস্টাল সান্তোস এই নিয়মের বিরোধিতা করে বলেন, 'এটি অনিয়মের নতুন এক দুয়ার খুলে দেবে। গ্র্যাবএগানের মতো বড় প্রতিষ্ঠানগুলো আমাদের মতো ছোট দোকানগুলোর টিকিয়ে থাকাই কঠিন করে তুলছে।'
এই প্রস্তাবিত নিয়মটি নিয়ে বর্তমানে জনগণের মতামত গ্রহণের সময় চলছে, যা আগস্টের শুরুতে শেষ হবে। এটিএফ-এর প্রস্তাবিত নিয়মটি ২০২৬ সালের শেষ বা ২০২৭ সালের শুরুর দিকে চূড়ান্ত হতে পারে, অথবা এটি প্রত্যাহার বা পরিবর্তনও করা হতে পারে।
