পেন্টাগনের নীরবতার মধ্যেই মার্কিন হামলায় শতাধিক ইরানি শিশু নিহতের ঘটনাপ্রবাহ প্রকাশ করল এপি
ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন-ইসরায়েল যুদ্ধে এটিই ছিল সবচেয়ে মারাত্মক বা প্রাণঘাতী হামলার খবর। হতাহতদের বেশিরভাগই ছিল শিশু।
অন্য যেকোনো সংঘাতে এমন মর্মান্তিক ঘটনা জাতীয় স্মৃতিতে গভীরভাবে গেঁথে যেত। কিন্তু অন্তত একটি মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র ইরানের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আঘাত হানার ১২০ দিনেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও ঠিক কী ঘটেছিল, তার এখনো কোনো চূড়ান্ত বিবরণ প্রকাশিত হয়নি।
ট্রাম্প প্রশাসন এখনো সরাসরি এই হামলার দায় স্বীকার করেনি কিংবা বোমা হামলা নিয়ে পেন্টাগনের তদন্তের ফলাফল আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেনি। অথচ পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা, যিনি চলমান তদন্ত নিয়ে কথা বলার জন্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে বলেন, হামলার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই সামরিক বাহিনীর কাছে বিদ্যালয়টিতে আঘাত হানার প্রমাণ ছিল।
২৮ ফেব্রুয়ারির সকালে বিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণ থেকে শুরু করে পুরো হামলার ঘটনাপ্রবাহ বর্ণনা করেছে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস। উন্মুক্ত উৎসের তথ্য, ভিডিওচিত্র, মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদন এবং ইরানের ভেতরে ও বাইরে থাকা গবেষক ও সাধারণ মানুষের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে তারা মিনাবে বোমা হামলা সম্পর্কে আগে প্রকাশ না পাওয়া বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরেছে। এর মধ্যে নিহত শিশুদের বৈচিত্র্যময় সামাজিক পটভূমির বিষয়টিও রয়েছে।
তবে বিস্ফোরণ নিয়ে অনেক তথ্য এখনো অজানা রয়ে গেছে। পেন্টাগনের পক্ষ থেকে তথ্য না দেওয়া এবং ইরানের ধর্মতান্ত্রিক সরকারের ঘটনাটিকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করার কারণে স্বাধীনভাবে অনুসন্ধান চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। এর ফলে জবাবদিহির ক্ষেত্রে এক ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়েছে এবং নিহতদের পরিবার এখনো কোনো সুরাহা পায়নি। এখনো যেসব প্রশ্নের উত্তর মেলেনি, তার মধ্যে রয়েছে বিদ্যালয়টিতে ঠিক কতটি ক্ষেপণাস্ত্র বা বোমা আঘাত করেছিল এবং নিহতদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা কী।
গত সপ্তাহে এ ঘটনা সম্পর্কে জানতে চাইলে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, তিনি পেন্টাগনের প্রতিবেদন পড়েননি এবং যুক্তরাষ্ট্র এই হামলা চালিয়েছে বলে বিশ্বাস করার মতো কিছু দেখেননি।
তিনি বলেন, 'এই ঘটনার জন্য শেষ পর্যন্ত কাকে দায়ী করা হবে, তা হয়তো কখনোই নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব হবে না। কারণ চারদিকে ক্ষেপণাস্ত্র উড়ছিল। আমার মনে হয় না, এটা আমরা করেছি।'
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের মন্তব্য চাওয়ার অনুরোধে জাতিসংঘে ইরানের মিশন কোনো জবাব দেয়নি।
ভিডিও, সাক্ষাৎকার ও অন্যান্য সূত্রে আরও পূর্ণাঙ্গ চিত্র
এই অনুসন্ধানী প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের, ইরানি মানবাধিকারকর্মীদের, মিনাবের এক বাসিন্দার, ইরানের শিক্ষক শ্রমিক সমন্বয় পরিষদের একজন আন্তর্জাতিক প্রতিনিধির এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার গবেষকদের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে।
যাদের সঙ্গে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস কথা বলেছে, তাদের কয়েকজন নিহতদের পরিবার ও ঘটনাস্থলে ছুটে যাওয়া উদ্ধারকারীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগে ছিলেন। তাদের অধিকাংশই নিজেদের এবং যাদের সঙ্গে তারা যোগাযোগ রেখেছিলেন, তাদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার আশঙ্কায় নাম প্রকাশ করতে চাননি।
শিক্ষকরা অভিভাবকদের সন্তানদের নিয়ে যেতে বলেছিলেন। তারপরই বোমা পড়ে।
ফেব্রুয়ারির ২৮ তারিখ, শনিবার সকালে ইরানের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় শহর মিনাবের আকাশ ছিল পরিষ্কার ও উজ্জ্বল। শহরটি হরমুজ প্রণালি থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। সেদিন ইরানে বিদ্যালয় খোলা ছিল। তখন রমজান মাস চলছিল।
'শাজারেহ তাইয়্যেবেহ' বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয় প্রাঙ্গণের রঙিন দেয়ালচিত্রের পাশ দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করছিল। ছেলে ও মেয়েরা আলাদা কক্ষে গিয়ে নিজেদের আসনে বসছিল। কক্ষগুলোতে উজ্জ্বল রঙে রাঙানো বেঞ্চ ও ডেস্ক ছিল।
ইরানে দীর্ঘ ১৮ বছর শিক্ষকতা করা এবং বর্তমানে মিনাবের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করা আন্তর্জাতিক প্রতিনিধি শিভা আমেলিরাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই বিদ্যালয়টি ছিল এমন ৩০টিরও বেশি একই নামের বিদ্যালয়ের একটি, যেগুলো মূলত ইরানের আধাসামরিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা রাষ্ট্রের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত পরিবারের সন্তানদের জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
তিনি বলেন, ইরানের অধিকাংশ বিদ্যালয় ইসলামি প্রজাতন্ত্রের নির্ধারিত নীতিমালার অধীনে পরিচালিত হলেও 'শাজারেহ তাইয়্যেবেহ' বিদ্যালয়গুলোতে বিপ্লবী গার্ডের আদর্শ নতুন প্রজন্মের মধ্যে গড়ে তোলা ও শক্তিশালী করার বিষয়টি আরও স্পষ্টভাবে গুরুত্ব পেত। তবে শিশুদের পারিবারিক পরিচয় যাই হোক না কেন, তারা সবাই বেসামরিক নাগরিক এবং 'কোনো বিদ্যালয়কে লক্ষ্য করে হামলা চালানো নিঃসন্দেহে নিন্দনীয়।'
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের উপগ্রহচিত্র ও উন্মুক্ত উৎসের মানচিত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিদ্যালয়টি বিপ্লবী গার্ডের একটি ঘাঁটির একই প্রাচীরঘেরা চত্বরে অবস্থিত ছিল। একসময় এটি ওই ঘাঁটিরই অংশ ছিল। পরে এক দশকেরও বেশি আগে আলাদা বেড়া দিয়ে ঘিরে এটিকে বিদ্যালয়ে রূপান্তর করা হয়।
বিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষার্থী পাশের ঘাঁটিতে কর্মরত বিপ্লবী গার্ড সদস্যদের সন্তান হলেও, অন্যরা ছিল মিনাবের স্থানীয় বাসিন্দা। শহরটির অধিকাংশ মানুষ সুন্নি বেলুচ জাতিগোষ্ঠীর, যারা ইরান সরকারের দমন-পীড়নের শিকার হয় বলে বেলুচিস্তান মানবাধিকার গোষ্ঠী জানিয়েছে।
সকাল প্রায় ৯টা ৪০ মিনিটে তেহরানে বোমা হামলা শুরু হয়েছে—এই খবর শিক্ষক ও প্রশাসনের কাছে পৌঁছানোর সময় পর্যন্ত ধারণা করা হয়, বিদ্যালয় ভবনের ভেতরে শত শত শিক্ষার্থী অবস্থান করছিল।
পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করে শিক্ষক ও প্রশাসন সিদ্ধান্ত নেন শিশুদের বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়াই নিরাপদ হবে। দুজন ব্যক্তি অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে জানান, তারা ল্যান্ডলাইন টেলিফোনে অভিভাবকদের ফোন করে দ্রুত সন্তানদের নিয়ে যেতে বলেন। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত লন্ডনভিত্তিক স্বাধীন সংস্থা 'এয়ারওয়ার্স'-এর প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, অভিভাবকদের সন্তানদের নিয়ে যেতে ফোন করা হয়েছিল।
সকাল ১০টা ১৫ মিনিটে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম সারা দেশের বিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করে একটি নির্দেশনা প্রচার করে।
কাছেই বসবাসকারী এক বাবা সঙ্গে সঙ্গে তার ১০ বছর বয়সী ছেলেকে নিতে বিদ্যালয়ে যান বলে মিনাবের এক বাসিন্দা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে জানান। ওই বাসিন্দা একাধিক পরিবারের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস তার বর্ণনার বিভিন্ন তথ্য নিহতদের তালিকা এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলোর ঘটনার সময়রেখার সঙ্গে মিলিয়ে যাচাই করেছে।
ওই বাবা বিদ্যালয়ে অপেক্ষমাণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে তার ৬ ও ৭ বছর বয়সী দুই আত্মীয়কে দেখতে পান বলে বাসিন্দাটি জানান। তিনি তাদের জিজ্ঞেস করেন, তারা তার সঙ্গে বাড়ি ফিরতে চায় কি না। তারা জানায়, তাদের বাবা আসছেন, তাই তারা অপেক্ষা করবে।
তিনি নিজের সন্তানকে নিয়ে সেখান থেকে একটি সুপারমার্কেটের দিকে রওনা হন। প্রায় ১০ মিনিট পর তিনি বিস্ফোরণের শব্দ শুনতে পান।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের উপগ্রহচিত্র বিশ্লেষণ অনুযায়ী, একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র বা বোমা ওই প্রাচীরঘেরা এলাকায় আঘাত হানে এবং অন্তত পাঁচটি ভবনে আঘাত লাগে। শত শত পাউন্ড বিস্ফোরক বিদ্যালয় ভবনটিকে ধসিয়ে দেয়।
ধ্বংসস্তূপে ঝুলে ছিল একটি ছোট্ট হাত
বিস্ফোরণের শব্দ শোনার পর ওই বাবা দ্রুত ফিরে এসে এক ভয়াবহ দৃশ্য দেখতে পান। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রচারিত ভিডিওতে দেখা যায়, চারদিকে চিৎকার, আর মানুষ ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন ধ্বংসস্তূপ খুঁড়ে মরদেহ উদ্ধারের চেষ্টা করছে।
একপর্যায়ে তিনি দুটি দগ্ধ দেহ দেখতে পান, যেগুলো তার দুই আত্মীয়ের হতে পারে বলে তিনি মনে করেন। তবে তিনি নিশ্চিত হতে পারেননি।
এদিকে আরও মানুষ সেখানে ছুটে আসে। পাশের একটি সুন্নি অধ্যুষিত গ্রাম থেকে এক ব্যক্তি তার ভাতিজাকে খুঁজতে আসেন। ছেলেটির মা আতঙ্কিত হয়ে তাকে ফোন করেছিলেন। ধ্বংসস্তূপের মধ্যে তিনি তার ভাতিজার মরদেহ খুঁজে পান।
উদ্ধারকারীরা ধ্বংসস্তূপের ভেতর ছোট ছোট স্কুলব্যাগ, শিশুদের আঁকা ছবি, রঙিন পেন্সিল এবং শ্রেণিকক্ষের কাজের খাতা উদ্ধার করেন। ধ্বংসস্তূপের মধ্যে একটি ছোট্ট শিশুর হাত ঝুলে থাকতে দেখা যায়।
বেলুচিস্তান মানবাধিকার গোষ্ঠীর তথ্য অনুযায়ী, উদ্ধারকারীরা বিকৃত হয়ে যাওয়া হাত-পা ও দেহের বিভিন্ন অংশ স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যান। সংস্থাটির কর্মীরা নিহতদের দুটি পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছেন। বিদ্যালয়টিতে ঠিক কতটি ক্ষেপণাস্ত্র বা বোমা আঘাত করেছিল, তা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস নিশ্চিত করতে পারেনি। তবে হামলার তীব্রতায় মানুষের দেহ এতটাই ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিল যে অনেক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ শনাক্ত করার উপায় ছিল না।
দিনের শেষে হাসপাতালের চিকিৎসকেরা ধারণা করেন, তাদের কাছে অন্তত ১০৮টি মরদেহ এসেছে। তবে মিনাবের ওই বাসিন্দার ভাষ্য অনুযায়ী, তারা সতর্ক করে বলেন যে প্রকৃত সংখ্যা সম্ভবত এর চেয়েও বেশি।
পরদিন রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে জানানো হয়, নিহতের সংখ্যা প্রায় ১৫০। এর কিছু পরেই তারা নিহতের সংখ্যা ১৬৮ বলে প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
'তারা শিশুদের শহীদ বলে অভিহিত করেছিল'
বোমা হামলার তিন দিন পর রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেখা যায়, হাজারো মানুষ মিনাব শহরের একটি গোলচত্বরে জড়ো হয়েছেন। সেখানে জনতা একটি মঞ্চের সামনে অবস্থান করছিল এবং পাশে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রয়াত প্রতিষ্ঠাতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির একটি বড় প্রতিকৃতি ছিল।
এটি শেষকৃত্যের অনুষ্ঠান না হলে অনেকেই হয়তো একে রাজনৈতিক সমাবেশ বলে ভুল করতেন। মিনাবের ওই বাসিন্দার ভাষ্য অনুযায়ী, জাতিগত পরিচয় বা ধর্ম নির্বিশেষে নিহত শিশুদের সব অভিভাবককে সেখানে অংশ নিতে বাধ্য করা হয়েছিল। জনতার অধিকাংশ নারী ইসলামি প্রজাতন্ত্রে প্রচলিত কালো 'চাদর' পরেছিলেন, যদিও বেলুচ জনগোষ্ঠীর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় সাধারণত এমন পোশাক পরার রীতি নেই।
ওই বাসিন্দা জানান, অভিভাবকদের বলা হয়েছিল যে তারা তাদের সন্তানদের মরদেহ নিজ নিজ গ্রামে নিয়ে গিয়ে নিজেদের ধর্মীয় বা সামাজিক রীতিতে শেষকৃত্য সম্পন্ন করতে পারবেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাদের অনেকেই সন্তানদের একসঙ্গে দাফন করার সিদ্ধান্ত নেন।
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রচারিত ড্রোনচিত্রে দেখা যায়, শ্রমিকরা একটি খোলা মাটির জমিতে খননকাজ করছেন এবং সেখানে ছোট ছোট, একই আকারের, নামফলকবিহীন কবর সারিবদ্ধভাবে তৈরি করা হচ্ছে।
আমেলিরাদ বলেন, 'রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম বিপ্লবী গার্ডের স্বার্থকে কেন্দ্র করে একটি বর্ণনা প্রচার করেছে। তারা শিশুদের "শহীদ" বলে অভিহিত করেছে—এ থেকেই তা বোঝা যায়।'
ঘটনাটি তুলে ধরা আরও কঠিন হয়ে ওঠে
'এয়ারওয়ার্স'-এর এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, হামলা অব্যাহত থাকায় ইরানের বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চলতে থাকে। যুদ্ধের প্রথম কয়েক দিনে যতগুলো স্থানে হামলা হয়েছিল, তা সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের অন্য সামরিক অভিযানের শুরুর দিকের হামলার সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে যায়। এর মধ্যে গাজাও রয়েছে।
চলমান বোমাবর্ষণের তথ্য সংগ্রহে ব্যস্ত সাংবাদিক ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো মিনাবের ঘটনার তথ্য যাচাই করতে গিয়ে নানা বাধার মুখে পড়ে। তাদের লক্ষ্যবস্তুতে সরাসরি যাওয়ার সুযোগ ছিল না। ইরান সরকারের বিধিনিষেধের কারণে অধিকাংশ বিদেশি সাংবাদিক দেশটিতে প্রবেশ করতে পারেননি। যুদ্ধের প্রথম দিনই ইরান ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করে দেয়, ফলে সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
যুদ্ধ যত এগোতে থাকে এবং হরমুজ প্রণালি প্রধান যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়, ততই ওই প্রদেশের পরিস্থিতি উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে বলে মিনাবের ওই বাসিন্দা জানান। সেখানে সামরিক বাহিনীর সব শাখার ব্যাপক মোতায়েন করা হয়। নিহতদের পরিবারের সদস্যরা কথা বললে প্রতিশোধের শিকার হওয়ার আশঙ্কায় ছিলেন। বিদেশি গণমাধ্যমের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করায় অনেককে আটক করা হয়েছে বলেও খবর পাওয়া যায়।
ফলে হামলাকে ঘিরে কী বার্তা প্রচার হবে, তার সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ চলে যায় ইরান সরকারের হাতে। বিশ্বকাপ ফুটবল প্রতিযোগিতায় পৌঁছানোর সময় ইরানের ফুটবল দলের খেলোয়াড়রা তাদের জ্যাকেটে সোনালি রঙের '১৬৮' লেখা ব্যাজ পরেছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির আলোচনায় অংশ নেওয়া ইরানি প্রতিনিধিদল নিজেদের নাম দেয় 'মিনাব ১৬৮'।
যুক্তরাষ্ট্রকে বিদ্রূপ করে ইরানপন্থী বিভিন্ন গোষ্ঠীর তৈরি ভাইরাল ভিডিওতে নিহত শিশুদের খেলনা-সদৃশ অ্যানিমেটেড চরিত্র হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
মার্চ মাসে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা 'অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল' লিখেছে, 'হামলার পর ইরানি কর্তৃপক্ষ নিহতদের পরিবার এবং বেঁচে যাওয়া শিশুদের দুর্ভোগকে প্রচারণার উদ্দেশ্যে ব্যবহার করেছে।'
এসবের মধ্যেও নিহতদের নামের কোনো প্রকাশ্য তালিকা প্রকাশ করা হয়নি।
পেন্টাগনের সংরক্ষিত নথিতে মিলল কিছু সূত্র
ইরানে প্রবেশের সুযোগ না থাকায় গবেষকেরা হামলার দায় কার—এই প্রশ্নের দিকেই বেশি মনোযোগ দেন।
ইরান এই হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করে। অন্যদিকে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের দায় নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন এবং ইরানের দিকেই অভিযোগের ইঙ্গিত দেন। প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ শুধু বলেন, পেন্টাগন বিষয়টি তদন্ত করছে।
তবে অভ্যন্তরীণভাবে মার্কিন সামরিক বাহিনী শুরুতে যতটা প্রকাশ করেছিল, তার চেয়ে অনেক বেশি তথ্য তাদের জানা ছিল। সেই সূত্রগুলো তাদের সংরক্ষিত নথিপত্রে লুকিয়ে ছিল।
পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা, যিনি চলমান তদন্ত নিয়ে কথা বলার জন্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, খবরটি প্রথম প্রকাশ্যে আসার সময়ই মার্কিন সামরিক বাহিনী জানত তারা ওই এলাকার আশপাশে হামলা চালিয়েছিল। তবে ইরানের দাবি অনুযায়ী বিদ্যালয়টিতে আঘাত হেনেছে কি না, তা যাচাই করতে এবং আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করতে কিছুটা সময় লেগেছিল।
ওই কর্মকর্তা বলেন, অন্তত সাত বছর আগে একজন বিশ্লেষক যে ভবনটিতে বিদ্যালয় ছিল তা শনাক্ত করেছিলেন বলে মনে হয়। কিন্তু সেই তথ্য গোয়েন্দা সংস্থা ও সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন বিভাগে যথাযথভাবে পৌঁছায়নি।
ফলে লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণকারী কর্মকর্তাদের কাছে ভবনটি বিদ্যালয় হিসেবে পরিচিত ছিল না। তার মতে, এটি লক্ষ্যবস্তু বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনা প্রক্রিয়ার কাঠামোগত দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়।
আরেক সাবেক পেন্টাগন কর্মকর্তা, নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বেসামরিক মানুষের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে কাজ করা কর্মীদের সংখ্যা কমিয়ে দেওয়া এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথের প্রাণঘাতী সামরিক শক্তির ওপর বেশি জোর দেওয়ার নীতির স্বাভাবিক ফল ছিল এই বোমা হামলা।
হেগসেথ দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি 'সিভিলিয়ান প্রটেকশন সেন্টার অব এক্সিলেন্স' বা বেসামরিক সুরক্ষা কেন্দ্র নামে একটি দপ্তরের জনবল উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেন। যুক্তরাষ্ট্রের আইনসভা ২০২২ সালের শেষ দিকে এই দপ্তর গঠনের নির্দেশ দিয়েছিল।
দপ্তরটির 'বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়ন' শাখার প্রধান হিসেবে ২০২৪ সালে কাজ শুরু করা ওয়েস ব্রায়ান্ট বলেন, এর ফলে 'হামলা না করার তালিকা' হালনাগাদের কাজ বন্ধ হয়ে যায়। এই তালিকায় হাসপাতাল, বিদ্যালয়, গির্জা ও মসজিদের মতো সুরক্ষিত স্থাপনাগুলোর তথ্য সংরক্ষণ করে পেন্টাগন।
তিনি বলেন, তিনি যখন পেন্টাগনে কাজ করতেন, তখন সবাই জানতেন যে এই তালিকাটি অনেক পুরোনো হয়ে গেছে এবং তা হালনাগাদ করা জরুরি।
মিনাব থেকে আরও উত্তর খোঁজার চেষ্টা
গত কয়েক সপ্তাহে গবেষকেরা কিছু অগ্রগতি করেছেন। সংঘাতবিষয়ক গবেষণা সংস্থা 'এয়ারওয়ার্স' কয়েক মাস ধরে উন্মুক্ত উৎসের তথ্য বিশ্লেষণ করে নিহতদের পরিচয় যাচাই করেছে।
সংস্থাটি ১৫৭ জন নিহতের নাম ও পরিচয় নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়েছে। এর মধ্যে ১২৩ জনই ১৩ বছর বা তার কম বয়সী শিশু এবং ৩৪ জন প্রাপ্তবয়স্ক। প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ২৬ জন ছিলেন বিদ্যালয়ের কর্মী, যাদের একজন অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। এছাড়া পাঁচজন অভিভাবকও নিহত হন, যাদের প্রত্যেকেই অন্তত একজন সন্তানকে হারিয়েছিলেন।
সংস্থাটির হিসাবে নিহতের সংখ্যা ১৫৭ থেকে ১৬৮ জনের মধ্যে এবং আহত হয়েছেন ৯৫ থেকে ১১১ জন।
মিনাব নিয়ে সামরিক তদন্তের আনুষ্ঠানিক ফলাফল কবে প্রকাশ করা হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তদন্তের অধিকাংশ কাজ শেষ হয়েছে। তবে যে সামরিক কমান্ড এই তদন্তের নির্দেশ দিয়েছিল, তারা বর্তমানে তদন্তের ফলাফল পর্যালোচনা করছে। গত সপ্তাহে হেগসেথ বলেন, 'উপযুক্ত সময় এলে' এই প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে।
অতীতের অনুরূপ তদন্তগুলোর ফলাফল তুলনামূলকভাবে দ্রুত প্রকাশ করা হয়েছিল। ২০২১ সালের ২৯ আগস্ট আফগানিস্তানের কাবুলে একটি 'হেলফায়ার' ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ১০ জন বেসামরিক মানুষ নিহত হওয়ার ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যে দায় স্বীকার করে এবং অভিযানের বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের আইনসভার কিছু সদস্য এখনো এই ঘটনার পূর্ণ স্বচ্ছতার দাবি জানিয়ে যাচ্ছেন।
সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে দক্ষিণ ডাকোটা অঙ্গরাজ্যের রিপাবলিকান সিনেটর এবং সশস্ত্র বাহিনী ও গোয়েন্দাবিষয়ক কমিটির সদস্য মাইক রাউন্ডস বলেন, বোমা হামলা সম্পর্কে কংগ্রেস এখনো পর্যাপ্ত তথ্য পায়নি এবং তিনি একটি পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন প্রত্যাশা করছেন। তিনি বলেন, 'এই বিষয়টি এখনো শেষ হয়ে যায়নি।'
