‘যেন কোনো হরর মুভি’, ভেনেজুয়েলার ভূমিকম্পে বেঁচে যাওয়া এক বাসিন্দা
ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাস ও এর আশপাশের এলাকায় দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পের আঘাতে ব্যাপক বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে। ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়েছেন অসংখ্য মানুষ। পরপর আফটারশকের কারণে সৃষ্ট এই দুর্যোগে বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) পর্যন্ত কয়েক হাজার মানুষের প্রাণহানির আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ইউএস জিওলজিক্যাল সার্ভের (ইউএসজিএস) তথ্য অনুযায়ী, বুধবার বিকেলে কারাকাস থেকে প্রায় ১৬০ কিলোমিটার (১০০ মাইল) পশ্চিমে প্রথমে ৭.২ মাত্রার একটি ভূমিকম্প আঘাত হানে। এর এক মিনিটেরও কম সময়ের মধ্যে ৭.৫ মাত্রার আরেকটি শক্তিশালী ভূকম্পন অনুভূত হয়।
রাত নেমে আসার সাথে সাথে কারাকাসের ধসে পড়া ভবনগুলোর ধ্বংসস্তূপের ওপর উদ্ধারকর্মীদের তৎপরতা শুরু হয়। অন্যদিকে, স্বজনেরা ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া প্রিয়জনদের উদ্ধারের আশায় ব্যাকুল হয়ে এদিক-ওদিক ছুটছেন। আতঙ্কগ্রস্ত অনেক বেঁচে যাওয়া মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে, যাদের কয়েকজনকে স্ট্রেচারে করে নিয়ে যেতে দেখা গেছে।
ধসে পড়া একটি ভবনের পাশের একটি ভবনের বাসিন্দা জানান, 'আমরা যখন নিচে নেমে এলাম, চারপাশের দৃশ্যটা ঠিক যেন কোনো হরর মুভির মতো ছিল।'
দেশটির অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত অন্তত ১৬৪ জনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। তবে এই প্রাথমিক তালিকায় কারাকাসের কাছে অবস্থিত এবং শহরের প্রধান বিমানবন্দর সংলগ্ন সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত লা গুয়াইরা রাজ্যের তথ্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
প্রত্যক্ষদর্শীদের পাঠানো ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, ভবনের ছাদ ধসে পড়ার সময় সেখানে চরম আতঙ্ক ও বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়।
বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় রাত ১টার ঠিক আগে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক ভাষণে রদ্রিগেজ বলেন, 'ডজন ডজন ভবন ধসে পড়েছে। ঈশ্বর আমাদের যতটুকু সুযোগ দিয়েছেন, ততটুকু সামর্থ্য দিয়ে যত বেশি সম্ভব মানুষের জীবন বাঁচাতে আমরা বর্তমানে উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছি।'
তিনি আরও যোগ করেন, 'লা গুয়াইরা রাজ্যে সত্যিকার অর্থেই এক চরম মানবিক বিপর্যয় নেমে এসেছে এবং এটি এখন একটি দুর্যোগপূর্ণ এলাকায় পরিণত হয়েছে।'
ক্ষয়ক্ষতির পূর্বাভাস সংক্রান্ত গাণিতিক মডেল ব্যবহার করে ইউএস জিওলজিক্যাল সার্ভে জানিয়েছে, নিহতের সংখ্যা হাজার ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে, এমনকি এই সংখ্যা ১০ হাজার পার হওয়ারও বড় ধরনের সম্ভাবনা রয়েছে।
এদিকে, নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধানের জন্য খোলা এবং দেশের বিরোধীদলীয় নেতাদের দ্বারা 'এক্স' (সাবেক টুইটার)-এ পোস্ট করা একটি ওয়েবসাইটে দেখা গেছে, স্থানীয় সময় ভোর ৫টা ৪০ মিনিট পর্যন্ত ১০ হাজারের বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন।
সরকারি ছুটির দিন হওয়ায় ভূমিকম্পের সময় ভেনেজুয়েলার বহু মানুষ নিজ নিজ বাড়িতে অবস্থান করছিলেন।
পূর্ব কারাকাসের বাসিন্দা ৫৬ বছর বয়সী কোরো মার্টিনেজ বলেন, 'ভীষণ জোরে একটা মড়মড় শব্দ হলো। ঘরের ভেতরের জিনিসপত্র, এমনকি রেফ্রিজারেটরের ভেতরের জগগুলোও আছড়ে পড়ল। আমি জীবনে কখনো এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হইনি।'
ট্রাম্পের সহায়তার আশ্বাস
বৃহস্পতিবার ভোররাত পর্যন্ত কারাকাসে দফায় দফায় আফটারশক অনুভূত হতে থাকে।
প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ জানান, দেশের মূল মনোযোগ এখন উদ্ধার তৎপরতার দিকে। আগামী কয়েক ঘণ্টার মধ্যে অন্যান্য দেশ থেকে উদ্ধারকারী দল এসে পৌঁছাবে। একই সাথে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ অন্যান্য বিশ্বনেতাদের ধন্যবাদ জানান তিনি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, 'এই দুর্যোগে সহায়তা করতে যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তুত, ইচ্ছুক এবং সক্ষম।'
গত জানুয়ারিতে এক সহিংস অভিযানের মাধ্যমে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেওয়া ট্রাম্প তার পোস্টে বলেন, 'ভেনেজুয়েলার মহান জনগণের ওপর যে দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে, তা আকারে যেমন বিশাল, তেমনি এর ফলে মারাত্মক ও বিপুলসংখ্যক মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে।'
এদিকে ভেনেজুয়েলায় জাতিসংঘের মানবাধিকার মিশন স্থানীয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর থাকা সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। একে 'জীবন-মরণের প্রশ্ন' হিসেবে উল্লেখ করেছে তারা। বছরের পর বছর ধরে চলা অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনায় জর্জরিত এই দেশটিতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে যখন কর্তৃপক্ষ হিমশিম খাচ্ছে, তখন কিছু এলাকায় ইতোমধ্যেই ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সচল হতে শুরু করেছে।
উল্লেখ্য, বুধবার (২৪ জুন) ভেনেজুয়েলার কারাকাসের পশ্চিমে সান ফেলিপে নামের একটি ছোট শহরের কাছে প্রথমে ৭.২ মাত্রার একটি ভূমিকম্প এবং ঠিক পরেই ৭.৫ মাত্রার আরেকটি ভূকম্পন আঘাত হানে।
আতঙ্কে রাস্তায় নেমে এলেন বাসিন্দারা
ভেনেজুয়েলার সাবেক আইনপ্রণেতা উইলমার আজুয়াজে মাইকুয়েতিয়া বিমানবন্দরে ভূমিকম্প আঘাত হানার মুহূর্তটি ক্যামেরাবন্দি করেন। সেখানে দেখা যায়, ছাদ ও দেয়ালের আস্তরণ খসে পড়ছে এবং ধুলোর মেঘ তৈরি হচ্ছে।
ভিডিও ধারণ করার সময় তিনি বলছিলেন, 'সবাই শুনুন, আমরা এখানে যে পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছি তা অত্যন্ত গুরুতর। অত্যন্ত উচ্চ মাত্রার একটি ভূমিকম্প। দেখুন চারপাশের কী অবস্থা হয়েছে।'
প্রেসিডেন্ট রদ্রিগেজ জানিয়েছেন যে বিমানবন্দরটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, যা উদ্ধার অভিযানকে আরও জটিল করে তুলেছে।
১৯৬৭ সালেও ৬.৩ মাত্রার এক প্রাণঘাতী ভূমিকম্পের শিকার হয়েছিল কারাকাস। বুধবার ভবনগুলো যখন কাঁপতে শুরু করে, তখন শহরের বাসিন্দারা আতঙ্কে ঘর ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে আসেন।
পশ্চিম কারাকাসের ৪১ বছর বয়সী একজন বিজ্ঞাপনদাতা অ্যাস্ট্রিড রামিরেজ বলেন, 'ভূমিকম্প শুরু হওয়া মাত্রই আমরা মানুষের চিৎকার শুনতে পাই। সবাই দিগ্বিদিক জ্ঞান হারিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামছিল।'
দক্ষিণ কারাকাসের ৮০ বছর বয়সী পেনশনার মারিয়া রোমেরো জানান, পুলিশ তাকে ঘর থেকে বের হতে সাহায্য করেছে।
তিনি বলেন, 'এই ভূমিকম্পটি ছিল ভয়াবহ, এমনকি ১৯৬৭ সালের সেই ভূমিকম্পের চেয়েও খারাপ।'
