নিষেধাজ্ঞা ইস্যুতে ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে মামলা করলেন আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের ৩ বিচারক
বুধবার তিনজন আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের বিচারক যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তার প্রশাসনের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। গত বছর তাদের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা অবৈধ ছিল বলে তারা অভিযোগ করেছেন।
ম্যানহাটনের ফেডারেল আদালতে দায়ের করা মামলায় কানাডার বিচারক কিম্বারলি প্রোস্ট, উগান্ডার বিচারক সোলোমি বালুঙ্গি বোসা এবং বেনিনের বিচারক রেইন অ্যাডিলেড সোফি আলাপিনি-গানসু বলেছেন, এসব নিষেধাজ্ঞা বিচারিক প্রক্রিয়ার বাইরে চাপ প্রয়োগের উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছিল, যার লক্ষ্য ছিল বিচারকদের শাস্তি দেওয়া এবং তাদের ওপর জবরদস্তিমূলক প্রভাব বিস্তার করা।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর, অর্থ দপ্তর এবং হোয়াইট হাউস তাৎক্ষণিকভাবে এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধের জবাব দেয়নি।
ট্রাম্প প্রশাসন গত বছর আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের কয়েকজন বিচারকের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি এবং আফগানিস্তানে মার্কিন সেনাদের কথিত যুদ্ধাপরাধ নিয়ে তদন্ত শুরুর পূর্ববর্তী সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়ায় এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল, যা ছিল নজিরবিহীন প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা।
নিষেধাজ্ঞা সাধারণত ব্যক্তিদের এমনকি দৈনন্দিন আর্থিক লেনদেন পরিচালনার সক্ষমতাকেও মারাত্মকভাবে সীমিত করে দেয়। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে এমন কিংবা মার্কিন ডলারে লেনদেন করে এমন যেকোনো ব্যাংকের ওপর এসব বিধিনিষেধ মেনে চলার প্রত্যাশা থাকে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত ২০০২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। সদস্য রাষ্ট্রগুলোতে সংঘটিত গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং যুদ্ধাপরাধের বিচার করার আন্তর্জাতিক এখতিয়ার এই আদালতের রয়েছে। এছাড়া জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ কোনো পরিস্থিতি আদালতের কাছে পাঠালেও আদালত ব্যবস্থা নিতে পারে।
যদিও আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের ১২৫টি সদস্য দেশের ক্ষেত্রে যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং গণহত্যার বিচার করার এখতিয়ার রয়েছে, তবে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া ও ইসরায়েলসহ কয়েকটি দেশ আদালতের এই কর্তৃত্ব স্বীকার করে না।
আদালতটির প্রতি ট্রাম্প প্রশাসনের বিরূপ মনোভাব ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদ থেকেই চলে আসছে। ২০২০ সালে আফগানিস্তান-সংক্রান্ত তদন্তের কারণে ওয়াশিংটন তৎকালীন প্রধান কৌঁসুলি ফাতু বেনসুদা এবং তাঁর একজন শীর্ষ সহযোগীর ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল।
আইনি ভিত্তিকে চ্যালেঞ্জ করেছেন বিচারকরা
মামলায় বলা হয়েছে, এসব নিষেধাজ্ঞা আইনের পরিপন্থী, কারণ সেগুলো আন্তর্জাতিক জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা আইনের সীমা অতিক্রম করেছে এবং কোনো প্রকৃত জাতীয় জরুরি অবস্থা বা অসাধারণ হুমকির ভিত্তিতে আরোপ করা হয়নি।
মামলায় আরও বলা হয়েছে, 'নিষেধাজ্ঞা ব্যবস্থা বিচারকদের এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের বেঞ্চে থাকা তাদের সহকর্মীদের ওপর বিচারিক প্রক্রিয়ার বাইরে চাপ প্রয়োগের উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে। তাদের আর্থিক ও অন্যান্য ব্যক্তিগত স্বার্থকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে পূর্ববর্তী বিচারিক সিদ্ধান্তের জন্য শাস্তি দেওয়া এবং ভবিষ্যৎ মামলার রায়ে আইন ও তথ্য-প্রমাণের পরিবর্তে নিজেদের ব্যক্তিগত স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে বাধ্য করাই এর উদ্দেশ্য।'
মামলায় আরও বলা হয়েছে, 'আন্তর্জাতিক জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা আইনের আওতায় এ ধরনের নিষেধাজ্ঞার মুখোমুখি হওয়া কার্যত আর্থিক মৃত্যুদণ্ডের শামিল। এসব নিষেধাজ্ঞার কারণে বিচারক প্রোস্ট, বোসা এবং আলাপিনি-গানসু অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি আর ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করতে পারছেন না, ব্যাংকিং সেবা নিতে পারছেন না, সাধারণ অনলাইন প্ল্যাটফর্ম—যেমন অ্যামাজন ও গুগল—ব্যবহার করতে পারছেন না, ভ্রমণ বুক করতে পারছেন না এবং কিছু ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিমাও নিতে পারছেন না।'
বিচারকরা আরও বলেছেন, এসব নিষেধাজ্ঞার কারণে তাদের সামনে বিচারাধীন কিংবা ভবিষ্যতের কোনো মামলায় প্রমাণ ও আইনি যুক্তি উপস্থাপন করাও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
