মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানের সঙ্গে নতুন চুক্তি চাইতে পারেন ট্রাম্প
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানের সঙ্গে একটি নতুন শান্তি চুক্তি দাবি করতে পারেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম 'দ্য টেলিগ্রাফ' এই তথ্য জানতে পেরেছে।
ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠজনদের একজন জানিয়েছেন, আগামী ৩ নভেম্বরের নির্বাচন রিপাবলিকান পার্টির ঝুঁকিপূর্ণ আসনগুলো রক্ষা করা এবং দেশের লাগামহীন মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের স্বার্থে মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই মুহূর্তে একটি চুক্তিতে পৌঁছানো অত্যন্ত জরুরি ছিল।
তবে ধারণা করা হচ্ছে, কংগ্রেসে ক্ষমতার ভারসাম্য নির্ধারণকারী এই মধ্যবর্তী নির্বাচন শেষ হওয়া মাত্রই ইরান চুক্তি থেকে সরে আসতে পারেন ট্রাম্প। আর তেমনটি হলে মধ্যপ্রাচ্যে আবারও যুদ্ধ শুরু হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অবশ্য হোয়াইট হাউস এই দাবি অস্বীকার করেছে। তাদের দাবি, ট্রাম্প 'সব সময়ই সদিচ্ছা নিয়ে কাজ করেন এবং নিজের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেন'।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানে মার্কিন হামলা শুরু হওয়ার পর থেকে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা স্মরণকালের সর্বনিম্নে ঠেকেছে। মার্কিন হামলার জবাবে ইরান তেল সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিলে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
তবে গত রোববার (১৪ জুন) একটি সমঝোতা স্মারক ঘোষণার পর প্রণালিটি আবার খুলে দেওয়া হয়, যার ফলে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি তেলের দাম কিছুটা কমে এসেছে।
জনপ্রিয়তায় ধস নামায় নির্বাচনি প্রচারণায় যে স্থবিরতা তৈরি হয়েছিল, তা কাটিয়ে উঠতে ট্রাম্পের হাতে এখন মাত্র পাঁচ মাস সময় রয়েছে। নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের (হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস) নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটরা ফিরে পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যদিও সিনেটের লড়াইয়ে দুই দলের মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস মিলছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, শান্তি চুক্তি সম্পাদন এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত হওয়ার বিষয়টি আতঙ্কিত রিপাবলিকান শিবিরের উদ্বেগ অনেকটাই কমে এসেছে।
জর্জ ডব্লিউ বুশ প্রশাসনের সাবেক কর্মকর্তা চার্লি কুপার বলেন, 'পুনর্নির্বাচনের মুখোমুখি হওয়া একদল নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি এই ভেবে স্বস্তি পাচ্ছেন যে ইরান যুদ্ধ শেষ হয়েছে। কারণ তাদের মূল মাথাব্যথা ছিল জ্বালানি তেলের দাম, সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি এবং সুদের হার নিয়ে।'
তিনি আরও যোগ করেন, 'ইরান-সংক্রান্ত পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে তাদের বিশেষ কোনো মাথাব্যথা নেই। তারা বরং এই আশা নিয়ে মধ্যবর্তী নির্বাচনে যেতে চান যে তেলের দাম কমবে এবং প্রেসিডেন্টের যুদ্ধ নীতির পক্ষে তাদের আর সাফাই গাইতে হবে না।'
কিন্তু আগামী নভেম্বরের পর ট্রাম্প এই চুক্তি পুনর্মূল্যায়ন করতে পারেন। গত বুধবার (১৭ জুন) তার স্বাক্ষরিত এই সমঝোতা স্মারকটি রিপাবলিকান কট্টরপন্থী এবং ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের তীব্র ক্ষোভের কারণ হয়েছে। তারা এটিকে ইরানের শাসনব্যবস্থার কাছে 'নতি স্বীকার' হিসেবে দেখছেন।
১৪ দফার ওই নথি অনুযায়ী, তেহরান একটি 'পুনর্গঠন' তহবিল, অবরুদ্ধ সম্পদ অবমুক্তকরণ এবং তেল নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের মাধ্যমে প্রায় অর্ধ ট্রিলিয়ন (৫০ হাজার কোটি) ডলার পেতে পারে।
সমালোচকদের ভয়, এই বিপুল অর্থ ইরান তাদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার পুনর্গঠনে এবং হিজবুল্লাহর মতো তাদের অনুগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর অর্থায়নে ব্যবহার করতে পারে। এছাড়া এই সমঝোতা স্মারকে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মতো জটিল বিষয়গুলোকে আগামী ৬০ দিনের মধ্যে শেষ করার শর্তে পরবর্তী আলোচনার টেবিলে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।
ইরান ইতোমধ্যে জানিয়েছে, আলোচনা শেষ হওয়ার পর এই প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী তেলবাহী ট্যাঙ্কারগুলোর ওপর তারা শুল্ক আরোপ করতে চায়— যুদ্ধ শুরুর আগে যা কখনো ছিল না।
জানা গেছে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই শান্তি চুক্তির বিষয় নিয়ে ভীষণ ক্ষুব্ধ। পাশাপাশি রিপাবলিকান কট্টরপন্থীরাও প্রকাশ্যেই এর সমালোচনা করছেন।
ট্রাম্প যদি শেষ পর্যন্ত নিজের করা এই চুক্তি বাতিলও করেন, তবে তিনি ইরানের সঙ্গে নতুন করে আলোচনায় বসবেন নাকি আবারও সামরিক পদক্ষেপের পথ বেছে নেবেন— তা এখনো অস্পষ্ট।
ট্রাম্প প্রশাসনের অন্যতম ইরান-বিরোধী কট্টরপন্থী নেতা এবং মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এই সমঝোতা স্মারকের বিষয়ে অনেকটাই নীরব রয়েছেন। তবে তিনি দাবি করেছেন, চূড়ান্ত চুক্তিটি তেহরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে দুর্বল করবে।
এদিকে ট্রাম্প গত বুধবার বলেছেন, ৬০ দিনের মধ্যে আলোচনা সম্পন্ন না হলে যুক্তরাষ্ট্র 'আবারো বোমা হামলায় ফিরে যাবে'।
এদিকে মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর নতুন চুক্তির এই দাবিকে সম্পূর্ণ নাকচ করে দিয়েছেন হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অ্যানা কেলি।
তিনি বলেন, 'এটি একটি ভুয়া খবর। এই প্রতিবেদক মানুষকে এটি বিশ্বাস করাতে প্রতারণার আশ্রয় নিচ্ছেন যে একজন নামহীন একক সূত্র সবকিছু জানে; কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তারা কিছুই জানে না।'
কেলি আরও বলেন, 'প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সব সময়ই সদিচ্ছা নিয়ে কাজ করেন এবং নিজের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেন— যতক্ষণ পর্যন্ত অপর পক্ষ তাদের কথা রাখে।'
কূটনৈতিক আলোচনা চলাকালীনও যুক্তরাষ্ট্র ইরানে দুইবার বোমা হামলা চালিয়েছিল: প্রথমবার জুনে 'অপারেশন মিডনাইট হ্যামার' অভিযানের সময় এবং দ্বিতীয়বার ফেব্রুয়ারিতে, যখন ট্রাম্প এই যুদ্ধ শুরু করেন।
বছরের শেষের দিকে এই চুক্তি বাতিল করা হলে তা মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট ও প্রধান মধ্যস্থতাকারী জেডি ভ্যান্সের জন্য চরম মানহানিকর হবে। কারণ এই চুক্তিটি জনগণের সামনে ইতিবাচকভাবে তুলে ধরার মূল দায়িত্বটি তার ওপরই ন্যস্ত ছিল।
ট্রাম্প যদি এই চুক্তি বাতিল করেন এবং ইরান আবারও হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়, তবে এর ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক বিপর্যয় ২০২৮ সালের হোয়াইট হাউস রেসে (প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে) নামতে যাওয়া জেডি ভ্যান্সের রাজনৈতিক সম্ভাবনার মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে।
গত বুধবারে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে জেডি ভ্যান্স ইসরায়েল সরকারের সদস্যদের পক্ষ থেকে আসা সমালোচনার লাগাম টানার চেষ্টা করেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, এই মুহূর্তে বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রই ইসরায়েলের 'একমাত্র অবশিষ্ট বন্ধু'।
ভ্যান্সের এই মন্তব্য রক্ষণশীল গোষ্ঠী এবং ইসরায়েলপন্থী রিপাবলিকান দাতাদের একাংশের তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে, যা তার ভবিষ্যৎ প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হওয়ার দৌঁড়ে আরেকটি বড় সতর্কসংকেত।
এদিকে ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারকদের মধ্যেও এই ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি আদৌ টিকবে কি না, তা নিয়ে গভীর সংশয় রয়েছে। গত শুক্রবার লেবাননে ইসরায়েলি বোমা হামলার কারণে এই যুদ্ধবিরতি চরম হুমকির মুখে পড়েছিল, যা পরবর্তীতে একটি তড়িঘড়ি করা সমঝোতার মাধ্যমে সাময়িকভাবে শান্ত করা হয়।
