ইরানের জন্য ৩০০ বিলিয়ন ডলারের পুনর্গঠন তহবিল নিয়ে মার্কিন রাজনীতিতে বিতর্কের ঝড়
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধের অবসান ঘটাতে স্বাক্ষরিত একটি সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) একটি ধারা ওয়াশিংটনে সর্বশেষ রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয় হয়ে উঠেছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের জন্য ৩০০ বিলিয়ন ডলারের পুনর্গঠন পরিকল্পনা তৈরির অঙ্গীকারকে সমর্থন করেছেন।
ট্রাম্প এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স উভয়ই গত বৃহস্পতিবার এই বলে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেছিলেন যে, এই প্রতিশ্রুতির অর্থায়ন মার্কিন করদাতাদের দ্বারা করা হবে না। তবুও, যখন জীবনযাত্রার ব্যয় ও অর্থনৈতিক পপুলিজম দেশটির নির্বাচনী রাজনীতিতে প্রধান বিষয় হয়ে উঠেছে, তখন বেশ কয়েকজন ডেমোক্র্যাট এবং অল্পসংখ্যক রিপাবলিকান এই পরিকল্পিত তহবিলের সমালোচনা করেছেন।
বুধবার ট্রাম্প এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকে শুধু বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র 'আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গে মিলে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য অন্তত ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি চূড়ান্ত, পারস্পরিক সম্মত পরিকল্পনা প্রণয়নের অঙ্গীকার করছে'।
স্মারকটিতে 'বাস্তবায়ন পদ্ধতি' নির্ধারণের বিষয়টি ৬০ দিনের আলোচনার জন্য রেখে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজনীয় যেকোনো লাইসেন্স, নিষেধাজ্ঞা থেকে অব্যাহতি বা অন্যান্য অনুমোদন দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
যদিও পরিকল্পনার শর্তাবলি এখনো নির্ধারিত হয়নি, ট্রাম্প বৃহস্পতিবার ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে এই প্রকল্পে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি অর্থায়নের সম্ভাবনা নাকচ করে দেন।
তিনি লেখেন, 'যুক্তরাষ্ট্র থেকে ইরানকে ৩০০ বিলিয়ন ডলার পরিশোধ করা হচ্ছে না। এটি ভুয়া খবর!'
তিনি এই বিষয়টিকে ডেমোক্র্যাটদের 'অপপ্রচার বা প্রোপাগান্ডা' বলে অভিহিত করেন।
অন্যদিকে, বৃহস্পতিবার প্রকাশিত নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ভ্যান্স বলেন, এই পরিকল্পনার অর্থ 'মার্কিন করদাতারা বহন করবেন না'।
তিনি বলেন, 'আমেরিকার এক পয়সাও ইরানে যাবে না।'
পরবর্তী এক সংবাদ সম্মেলনে ভ্যান্স ইঙ্গিত দেন যে এই তহবিলের অর্থ আঞ্চলিক আরব দেশগুলো এবং ইরানে বিনিয়োগে আগ্রহী অন্যান্য দেশের মাধ্যমে জোগাড় করা যেতে পারে। এর ফলে অর্থনৈতিক সংযোগ সৃষ্টি হবে, যা দীর্ঘস্থায়ী শান্তি নিশ্চিত করতে সহায়তা করতে পারে।
তবে এখন পর্যন্ত কোনো দেশ এই পরিকল্পনায় আর্থিক প্রতিশ্রুতি দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেনি।
ভ্যান্স আরও বলেন, ইরান কেবল তখনই এসব সম্পদে প্রবেশাধিকার পাবে, 'যদি তারা সম্পূর্ণভাবে শর্ত মেনে চলে এবং তাদের আচরণ পরিবর্তন করে'।
রাজনৈতিক অস্ত্র
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে বেশ কয়েকজন শীর্ষ ডেমোক্র্যাট ৩০০ বিলিয়ন ডলারের এই তহবিলকে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যার সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করেছেন। নভেম্বরে মধ্যবর্তী নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে এই বার্তা আরও জোরালো হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সিনেটর অ্যামি ক্লোবুচার চলতি সপ্তাহে এক্সে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, '৩০০ বিলিয়ন ডলার দিয়ে আমরা গৃহহীনতা দূর করতে পারতাম, ৪০ বছরের জন্য ক্যানসার গবেষণার অর্থায়ন করতে পারতাম এবং সাত বছরেরও বেশি সময় ধরে প্রতিটি শিশুকে বিনা মূল্যে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা দিতে পারতাম। কিন্তু তার বদলে ট্রাম্প এটি ইরানে পাঠাচ্ছেন।'
সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের শীর্ষ নেতা চাক শুমার বলেন, 'ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্পকে ইরানে ৩০০ বিলিয়ন ডলার পাঠাতে সহায়তা করবে না।'
কংগ্রেস সদস্য জেসন ক্রো বৃহস্পতিবার এক্সে লিখেছেন, 'আমেরিকানদের স্বাস্থ্যসেবা বজায় রাখতে সাহায্য করার জন্য রিপাবলিকানরা অর্থ খুঁজে পাবে না। কিন্তু ইরানকে ৩০০ বিলিয়ন ডলার দেওয়ার জন্য তারা অর্থ খুঁজে পাবে।'
রিপাবলিকানদের মধ্য থেকেও কয়েকজন এই পরিকল্পনার সমালোচনায় যোগ দিয়েছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন ইরানবিরোধী অবস্থানের জন্য পরিচিত এবং ট্রাম্পের মিত্র সিনেটর রজার উইকার।
বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে উইকার বলেন, ৩০০ বিলিয়ন ডলার—যদিও তা মার্কিন করদাতাদের অর্থে না হয়—তবুও 'প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার ২০১৫ সালের চুক্তিতে ইরান যে সুবিধা পেয়েছিল, তার তুলনায় এটিকে তুচ্ছ বলে মনে হবে।'
তিনি ২০১৫ সালের যৌথ সমন্বিত কর্মপরিকল্পনার (জেসিপিওএ) কথা উল্লেখ করেন। ওই চুক্তির আওতায় ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করতে এবং নিয়মিত পরিদর্শন মেনে নিতে সম্মত হওয়ার বিনিময়ে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হয়েছিল এবং প্রায় ৫৫ বিলিয়ন ডলারের স্থগিত ইরানি সম্পদ মুক্ত করা হয়েছিল। এসব সম্পদের বেশিরভাগই বিদেশি ব্যাংকে সংরক্ষিত ছিল।
ট্রাম্প ২০১৮ সালে একতরফাভাবে সেই চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেন এবং বারবার দাবি করেছেন যে ভবিষ্যতে ইরানের সঙ্গে যে কোনো চুক্তি জেসিপিওএর তুলনায় অনেক ভালো হবে। বৃহস্পতিবার স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ নিয়ে সরাসরি কিছু বলা হয়নি; বরং এ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করার জন্য ৬০ দিনের আলোচনা প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে।
পুনর্গঠন তহবিলের বাইরে, নতুন যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা স্মারকে ইরানের জীবাশ্ম জ্বালানি শিল্পের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা অবিলম্বে প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতিও রয়েছে। পাশাপাশি, ইরানের স্থগিত থাকা কয়েক বিলিয়ন ডলারের সম্পদ মুক্ত করা এবং অন্যান্য নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা শুরু করার কথাও বলা হয়েছে।
মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য টমাস ম্যাসি, যিনি ট্রাম্পের নিয়মিত সমালোচক এবং ট্রাম্প ও ইসরায়েলপন্থী গোষ্ঠীগুলোর হস্তক্ষেপের পর পুনর্নির্বাচনে পরাজিত হয়েছিলেন, তিনিও এই পুনর্গঠন তহবিলের সমালোচনা করেছেন।
তিনি এক্সে দেওয়া এক পোস্টে লেখেন, '৩০০ বিলিয়ন ডলার হলো কংগ্রেস প্রতিবছর আমাদের সড়ক ও সেতুর পেছনে যে অর্থ ব্যয় করে, তার পাঁচ গুণ।'
তিনি আরও বলেন, 'এভাবে জিততে জিততে আমি ক্লান্ত,'—যা ছিল ট্রাম্পের বহুল ব্যবহৃত একটি প্রিয় উক্তির প্রতি ইঙ্গিত।
