ভারতের তামিলনাড়ু রাজ্যে সুপারস্টারের চমক, বদলে দিয়েছেন রাজনীতির চিত্র
ভারতের তামিলনাড়ু অঙ্গরাজ্যের রাজনীতিতে নতুন ইতিহাস গড়ার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছেন চলচ্চিত্র তারকা থেকে রাজনীতিবিদে পরিণত হওয়া জোসেফ বিজয়। সোমবারের বিধানসভা নির্বাচনে সমস্ত সব জল্পনা-কল্পনাকে ছাপিয়ে বিজয়ের রাজনৈতিক দল 'তামিলাগা ভেটরি কাজাগাম' (টিভিকে) অভাবনীয় সাফল্য পেয়েছে। তার এই জয় রাজ্যের দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক কাঠামোতে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বিজয়ের এই নাটকীয় উত্থানকে তুলনা করা হচ্ছে মহাতারকা এমজি রামচন্দ্রনের (এমজিআর) সঙ্গে। এমজিআর একসময় ডিএমকে (দ্রাবিড় মুনেত্র কাজাগাম) থেকে আলাদা হয়ে নিজস্ব দল গঠন করেছিলেন এবং ১৯৭৭ সালে মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন।
বিজয়ের এই জয় তার ভক্ত ও সমর্থকদের উল্লাসিত করলেও শীর্ষ পদে পৌঁছানোর পথে তার সামনে এখনো কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তামিলনাড়ুর ২৩৪ সদস্যের বিধানসভায় সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ১১৮টি আসন। বিজয়ের টিভিকে পেয়েছে ১০৮টি আসন, অর্থাৎ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে তিনি মাত্র ১০টি আসন দূরে রয়েছেন।
এর অর্থ হলো, আগামী কয়েক দিন বিজয়কে স্রেফ একজন জনপ্রিয় তারকার ভূমিকা থেকে বেরিয়ে একজন দক্ষ কৌশলী হিসেবে অবতীর্ণ হতে হবে। সরকার গঠনের দাবি জানাতে তাকে ছোট দল ও স্বতন্ত্র বিধায়কদের সঙ্গে জোট গড়ার আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে।
তবে সংখ্যাতত্ত্বের হিসাব যাই হোক, বিজয়ের এই পারফরম্যান্স তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হয়ে থাকবে। কয়েক দশক ধরে রাজ্যটি মূলত দুটি আঞ্চলিক দল—ডিএমকে এবং এআইএডিএমকে-র (অল ইন্ডিয়া আন্না দ্রাবিড় মুনেত্র কাজাগাম) ক্ষমতার পালাবদল দেখে আসছে।
অনেকের মতে, বিজয়ের এই সাফল্যের পেছনে তার রাজনৈতিক দর্শনের চেয়েও ব্যক্তিত্ব বড় ভূমিকা পালন করেছে। সমাজবিজ্ঞানী শিব বিশ্বনাথন বলেন, 'বিজয়ের মধ্যে এক ভিন্ন ধরনের প্রাণচাঞ্চল্য রয়েছে। তার মাঝে রয়েছে এক ধরনের আনন্দ, আত্মবিশ্বাস এবং নিজস্বতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা এক সক্ষমতার আভা, যা তাকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।'
ভোটের কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই বিজয় সুকৌশলে নিজের পাবলিক ইমেজ তৈরি করেছেন। এবার রুপালি পর্দায় নয়, বরং তাকে দেখা গেছে বড় বড় মন্দির ও গির্জা পরিদর্শনে। এসব সফরের ছবি টেলিভিশন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। তামিলনাড়ুর আধুনিক রাজনীতি মূলত যুক্তিবাদী চিন্তা ও 'আত্মমর্যাদা আন্দোলনের' ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল, যেখানে প্রান্তিক শ্রেণির সমান অধিকারের কথা বলা হয়।
সেই প্রেক্ষাপটে বিজয়ের ধর্মের প্রতি এই ঝোঁক বেশ পরিকল্পিত বলেই মনে করা হচ্ছে।
তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে অভিনয়ের প্রভাব নতুন কিছু নয়। এখানে সিনেমা ও ক্ষমতা দীর্ঘকাল ধরেই অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। এমজি রামচন্দ্রন থেকে শুরু করে তার উত্তরসূরি জে. জয়ললিতা পর্যন্ত চলচ্চিত্র তারকারা রাজনীতিতে এসে সফলভাবে রাজ্য শাসন করেছেন। বিজয় সেই পরম্পরাকেই অনুসরণ করছেন, তবে তার সময়কালটি একটু ভিন্ন।
বিশ্লেষকদের মতে, বিজয় এমন এক সময়ে রাজনীতিতে এসেছেন যখন ডিএমকে ও এআইএডিএমকে-র দ্বিমেরু রাজনীতি কাগজে-কলমে স্থিতিশীল মনে হলেও মাঠপর্যায়ে কিছুটা স্থবিরতা দেখা দিচ্ছে। আর এই শূন্যস্থানই বিজয়ের মতো নতুন মুখের জন্য পরীক্ষার ক্ষেত্র তৈরি করে দিয়েছে। শিব বিশ্বনাথন আরও যোগ করেন, 'রাজনীতিবিদ হিসেবে বিজয়ের সময়জ্ঞান নিখুঁত। তিনি এমন এক সময়ে এসেছেন যখন প্রতিষ্ঠিত নেতাদের জরাজীর্ণ মনে করা হচ্ছে। তিনি যুবসমাজের প্রতিনিধিত্ব করছেন এবং ভোটারদের ভাবনায় নেতৃত্বের এক নতুন বার্তা পৌঁছে দিচ্ছেন।'
তবে বিজয়ের এই জয়ের পথ খুব একটা মসৃণ ছিল না। গত বছর তার দলের এক বিশাল জনসভায় পদদলিত হয়ে বহু মানুষের মৃত্যুর ঘটনায় তিনি বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছিলেন। সেই সময় তার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া নিয়ে সমালোচনা হলেও ভোটাররা সম্ভবত তা ভুলে তাকে গ্রহণ করেছেন।
বিজয় ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, তিনি পুরোপুরি রাজনীতিতে মনোযোগ দেওয়ার জন্য অভিনয় ছেড়ে দেবেন। সেই হিসেবে তার সিনেমা 'জননায়গন' (জননেতা) জানুয়ারিতে মুক্তি পাওয়ার কথা ছিল এবং এটিই হওয়ার কথা ছিল তার শেষ ছবি। কিন্তু সেন্সর বোর্ডের আপত্তির কারণে সিনেমাটি আইনি জটিলতায় পড়ে। সিনেমাটি কবে মুক্তি পাবে, তা এখনো অনিশ্চিত।
২০২৪ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে 'টিভিকে' দল গঠন করলেও বিজয়ের রাজনৈতিক প্রস্তুতি অনেক পুরনো। ২০০৯ সাল থেকেই তিনি তার ফ্যান ক্লাবগুলোকে 'বিজয় মাক্কাল ইয়াক্কাম' নামের একটি জনকল্যাণমূলক নেটওয়ার্কে রূপান্তর করেন। এই সংগঠনটি পাড়া-মহল্লায় ত্রাণ বিতরণ, শিক্ষা সহায়তা এবং স্থানীয় সেবামূলক কাজে সক্রিয় ছিল। ২০১১ সালে এআইএডিএমকে জোটকে সমর্থন দিয়ে তিনি প্রথমবার যাচাই করেছিলেন, ভক্তদের সমর্থন ভোটে রূপান্তর করা সম্ভব কি না।
গত এক দশকে বিজয়ের সিনেমার অনুষ্ঠানগুলো ক্রমেই রাজনৈতিক রূপ নিতে শুরু করে। তিনি বেকারত্ব, দুর্নীতির মতো বিষয় নিয়ে তরুণদের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করেন এবং ২০১৯ সালে বিতর্কিত নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের (সিএএ) সমালোচনা করেন। প্রায় ৭০টি সিনেমায় অভিনয় করার পর যখন তিনি রাজনীতিতে নামলেন, তখন তার বার্তাটি ছিল স্পষ্ট—এটি স্রেফ তারকাখ্যাতির প্রদর্শন নয়, বরং সচেতনভাবে নিজের জনপ্রিয়তাকে রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর।
তামিলনাড়ুর ভোটাররা সবসময়ই ক্যারিশম্যাটিক নেতৃত্ব পছন্দ করেন। তবে বিজয়ের বিশেষত্ব হলো, তিনি তৃণমূল পর্যায়ে একটি বিশাল ভিত্তি তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। পোলস্টার প্রদীপ গুপ্তের মতে, তরুণ ভোটার এবং নারীদের মধ্যে বিজয়ের জনপ্রিয়তা সবচেয়ে বেশি। ১৮ থেকে ৩৯ বছর বয়সী ভোটারদের (যারা মোট ভোটারের প্রায় ৪২ শতাংশ) একটি বড় অংশ তাকে সমর্থন করেছে। পাশাপাশি বর্ণপ্রথা ছাপিয়ে দলিত ও অন্যান্য পিছিয়ে পড়া শ্রেণির নারীদের বড় সমর্থন পেয়েছেন তিনি।
রাজনৈতিক কৌশলী প্রশান্ত কিশোরের ভাষায়, 'তিনি তামিলনাড়ুর জন্য এক নতুন আশা।'
