তেল সংকটের তোয়াক্কা নেই; একুশ শতকের বাজার দখলে প্রস্তুত চীনের ইভি
কোথাও গাড়ির সিট ঘুরে গিয়ে পেছনের সারিতে বসতে সাহায্য করছে, তো কোথাও একটি অত্যাধুনিক এসইউভি গাড়ি যান্ত্রিকভাবে দারুণ ফুট ম্যাসাজ বা পায়ের মালিশ দিচ্ছে। সবচেয়ে চমকপ্রদ ব্যাপার হলো, এই গাড়িগুলোর বড় একটি অংশে পেশাদার স্পিকারসহ ভেতরেই কারাওকে গাওয়ার সুবিধা রয়েছে।
কিছু গাড়ির হেডলাইট আবার যেকোনো জায়গাতেই মুভি প্রজেক্টরের মতো সিনেমা দেখাতে পারে। আর এসব আধুনিক 'ইন্টেলিজেন্ট ড্রাইভিং' সুবিধা এখন সস্তা মডেলগুলোতেও হরহামেশা মিলছে।
চলতি সপ্তাহে চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে হওয়া বিশ্বের সবচেয়ে বড় অটো শো বা গাড়ি প্রদর্শনীতে এমন সব আধুনিক প্রযুক্তি দেখলে বাইরের দুনিয়ার ক্রেতাদের কাছে তা নিছক স্বপ্ন বলে মনে হতে পারে। তবে বিশ্বের অন্যান্য গাড়িনির্মাতা এবং রাজনৈতিক নেতাদের কাছে এই দৃশ্য তাদের অস্তিত্বের প্রতি রীতিমতো এক বড় হুমকিস্বরূপ।
চীনা গাড়িনির্মাতারা এখন বেশ কম খরচে বিশাল সংখ্যায় তাদের গাড়ি তৈরি করছে। আর এর মধ্যে ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে তেল ও গ্যাসের দাম এখন আকাশছোঁয়া। ঠিক এই সুযোগটিই কাজে লাগাচ্ছে চীন, কারণ তাদের এই অত্যাধুনিক গাড়িগুলোর সিংহভাগই বিদ্যুত বা হাইব্রিড শক্তিতে চলে।
যুক্তরাষ্ট্রের গাড়ি শিল্পের সঙ্গে চীনের এই ব্যবধান আগে কখনোই এতটা স্পষ্ট ছিল না। গত বছর ওয়াশিংটন ইভি বা বৈদ্যুতিক গাড়ির সুবিধা কমিয়ে তেলচালিত গাড়িকে আবার সামনে নিয়ে এসেছে। পাশাপাশি 'জাতীয় নিরাপত্তা'র অজুহাতে চীনা গাড়ি যেন আমেরিকার বাজারে ঢুকতে না পারে, সেই ব্যবস্থাও পাকা করেছে।
মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে চীনের নেতা শি জিনপিংয়ের সঙ্গে আলোচনা করতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বেইজিং যাওয়ার কথা রয়েছে। ঠিক এই সময়ে চীনের ইভি নির্মাতারা তাকিয়ে আছেন এক নতুন সম্ভাবনার দিকে—বিশ্বজুড়ে ইভির ক্রমবর্ধমান চাহিদা কি তাদের জন্য আমেরিকার রুদ্ধ দরজা খুলে দেবে?
সব মিলিয়ে বেইজিংয়ের এই প্রদর্শনী থেকে চীন বিশ্বকে একটি বার্তা বেশ পরিষ্কার করে বুঝিয়ে দিয়েছে। একুশ শতকে যে প্রযুক্তি বিশ্ব জয় করবে বলে চীন বিশ্বাস করে, তারা সেই পথেই অবিরাম ছুটে চলেছে।
চীনের শীর্ষ গাড়ি নির্মাতারা—এমনকি সরকারও—বিশ্বাস করে যে আগামী দিনগুলোতে বিশ্ব তেল ছেড়ে এই বিদ্যুতচালিত ভবিষ্যৎকেই বেছে নেবে।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় ইভি নির্মাতা বিওয়াইডি-র নির্বাহী স্টেলা লি জানান, তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়াটা মূলত 'সেই সব মানুষদের জন্য সতর্কবার্তা, যারা কখনোই ইভির দিকে ফিরেও তাকায়নি।' তিনি বলেন, 'একবার বৈদ্যুতিক গাড়ির দুনিয়ায় ঢুকলে কেউ আর তেলের গাড়িতে ফিরে যেতে চাইবে না।'
সীমানা ছাড়ানোর তাগিদ চীনের ইভি কোম্পানিগুলোর জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো বিদেশের বাজার দখল করা।
বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ইভি বাজার হলো চীন। দেশটিতে বিক্রি হওয়া নতুন গাড়ির অর্ধেকের বেশিই এখন ইলেকট্রিক বা হাইব্রিড। কিন্তু নিজেদের এই বিশাল বাজারেও কোম্পানিগুলোকে রীতিমতো টিকে থাকার যুদ্ধে লড়তে হচ্ছে। চরম 'প্রাইস ওয়ার' বা মূল্যের যুদ্ধ এবং তীব্র প্রতিযোগিতায় মুনাফা কমে যাচ্ছে।
এই কারণেই কোম্পানিগুলো এখন দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশি ক্রেতাদের টানতে চার্জিং অবকাঠামো তৈরিসহ নানা কাজ করছে। সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, বছরের প্রথম প্রান্তিকে চীনের ইভি রপ্তানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৭৮ শতাংশ বেড়েছে।
তবে বিশ্ব পরিস্থিতি চীনের জন্য খুব একটা অনুকূল নয়।
গত সপ্তাহে ৭০ জনের বেশি মার্কিন আইনপ্রণেতা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে একটি চিঠিতে সতর্ক করে বলেন, চীনা গাড়ির জন্য আমেরিকার বাজার উন্মুক্ত করলে তা তাদের শ্রমিক, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং জাতীয় নিরাপত্তার ওপর গভীর প্রভাব ফেলবে। আমেরিকায় ঢোকার পথে তাই বিশাল শুল্কের দেয়াল এবং সফটওয়্যার নিষেধাজ্ঞার ফাঁদ পেতে রাখা হয়েছে।
তবে ইউরোপ হাঁটছে ভিন্ন পথে। তারা প্রতিযোগিতাকে ব্লক না করে শুধু শুল্কের মাধ্যমে লেভেল প্লেইং ফিল্ড তৈরি করতে চাইছে। আর সেখানে চীনা কোম্পানিগুলো খুব দ্রুত বাজার দখল করছে। এ বছরের প্রথম প্রান্তিকেই ইউরোপে বিওয়াইডি গাড়ির নিবন্ধন প্রায় ১৭০ শতাংশ বেড়েছে।
মূলত চীনের এই বিশাল উৎপাদন ক্ষমতা বিদেশের কোম্পানিগুলোকে সবচেয়ে বেশি ভয়ে ফেলেছে। তাদের মজবুত সাপ্লাই চেইন এবং অটোমেটেড কারখানার পেছনের বড় শক্তি হলো চীনা সরকারের ভর্তুকি ও ছাড়। সমালোচকদের ভয়, চীনের এই সুবিধাগুলো বিশ্ব বাজার থেকে অন্যদের একেবারে মুছে দেবে।
তবে চীনা কোম্পানিগুলো একে ভিন্ন চোখে দেখে। বিওয়াইডি-র স্টেলা লি মনে করেন, মেধাবীদের কাজের সুযোগ দেওয়ায় আমেরিকা শক্তিশালী হয়েছিল। 'বাজার বন্ধ করে দিয়ে বরং তারা নিজেরাই নিজেদের দুর্বল করছে,' মন্তব্য করেন তিনি।
বিওয়াইডি বা জিলির মতো বড় চীনা কোম্পানিগুলো অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজার নিয়ে খুব বেশি মাথা ঘামাচ্ছে না। জিলির জ্যেষ্ঠ ভাইস প্রেসিডেন্ট ভিক্টর ইয়াং জানান, আমেরিকার বাজারে যাওয়ার তাদের কোনো পরিকল্পনা নেই। এর বদলে তারা ব্রাজিল, দক্ষিণ কোরিয়া এবং যুক্তরাজ্যের মতো দেশে প্রযুক্তির আদান-প্রদান করছে, যা দুই পক্ষের জন্যই বেশ লাভজনক।
প্রযুক্তির আসল লড়াই কয়েক দশক আগে পর্যন্ত চীনের অটোমোবাইল শিল্প পুরোপুরি বিদেশনির্ভর ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দৃশ্যপট পাল্টে গেছে। ঠিক যেমন ২০ শতকে ফোর্ডের অ্যাসেম্বলি লাইন আমেরিকার প্রযুক্তিগত উন্নতির প্রতীক ছিল, ঠিক তেমনি একুশ শতকে চীনের ইভি শিল্প এবং স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন বিশ্বদরবারে তাদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করছে।
বিশ্ববাজারে ইভি শিল্পে এই একচ্ছত্র আধিপত্য, চীনকে সফট পাওয়ার বা পরোক্ষ শক্তি হিসেবে আমেরিকার এক নির্ভরযোগ্য বিকল্প করে তুলেছে। পাশাপাশি, বর্তমান বৈশ্বিক তেল সংকটও প্রমাণ করে যে, চীনের বেছে নেওয়া পথটাই আসলে সবচেয়ে লাভজনক।
দীর্ঘদিন ধরেই চীন তেলের ব্যবহার কমিয়ে সবুজ জ্বালানির দিকে ঝুঁকছে। রোডিয়াম গ্রুপের তথ্যমতে, কেবল ইভি এবং হাইব্রিড গাড়ির কারণেই চীনে প্রতিদিন অন্তত ১০ লাখ ব্যারেল তেলের ব্যবহার কমেছে।
তবে বেইজিং অটো শো দেখলে বোঝা যায়, চীনা গাড়ি কোম্পানিগুলো শুধু তেল বাঁচানোর কথা ভাবছে না। তাদের আসল লড়াইটা হলো প্রযুক্তির। যেখানে টেসলা বা ওয়েমোর মতো মার্কিন কোম্পানি স্বয়ংক্রিয় গাড়ি বা অটোনোমাস কার নিয়ে স্বপ্ন দেখছে, সেখানে এক্সপেং, বিওয়াইডি এবং হুয়াওয়ের মতো চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো ঠিক সেই প্রযুক্তিতেই আমেরিকার শক্ত প্রতিপক্ষ হয়ে উঠছে।
