হাঙ্গেরিতে ১৬ বছর পর ট্রাম্প ও পুতিনের ‘বন্ধু’ অরবানের শাসনের অবসান
ইউক্রেনকে রাশিয়ার আগ্রাসন থেকে রক্ষায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রচেষ্টার অন্যতম প্রধান বিরোধী হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবান রোববার ১৬ বছর পর ক্ষমতা হারিয়েছেন। হাঙ্গেরির নাগরিকরা রেকর্ড সংখ্যায় ভোট দিয়ে সেন্টার-রাইট প্রতিদ্বন্দ্বী পেতের ম্যাজিয়ারের নেতৃত্বে একটি ইউরোপীয় ইউনিয়নপন্থী পথ বেছে নিয়েছেন।
৬২ বছর বয়সী অরবান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং ইউরোপের শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন রক্ষণশীল নেতার সমর্থন পেয়েছিলেন। কিন্তু প্রাথমিক ফলাফল অনুযায়ী, হাঙ্গেরির অর্থনৈতিক স্থবিরতার কারণে অরবানের জাতীয়তাবাদী ফিদেস পার্টি পেতের ম্যাজিয়ারের তিসা পার্টির কাছে পরাজিত হয়েছে।
শীতল যুদ্ধের সময় এক অগ্নিঝরা সাম্যবাদ-বিরোধী যুবনেতা হিসেবে পরিচিত অরবান ছিলেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের দীর্ঘতম মেয়াদে দায়িত্ব পালনকারী নেতা। সমর্থকদের কাছে তিনি একজন দেশপ্রেমিক নায়ক হলেও দেশে ও বিদেশে সমালোচকরা তার বিরুদ্ধে হাঙ্গেরিকে এক স্বৈরাচারী পথে নেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন।
১৯৬৩ সালে বুদাপেস্টের পশ্চিমে একটি গ্রামে জন্মগ্রহণকারী অরবান পেশায় একজন আইনজীবী ছিলেন। তিনি অক্সফোর্ডে সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য রাজনৈতিক দর্শন নিয়ে পড়াশোনা করেন এবং ১৯৯৮ সালে মাত্র ৩৫ বছর বয়সে প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগে আধা-পেশাদার ফুটবলও খেলেছিলেন।
অরবানের নেতৃত্বেই হাঙ্গেরি ন্যাটোতে যোগদান করেছিল, কিন্তু ২০০২ সালে তিনি ক্ষমতা হারান। আট বছর বিরোধী দলে থাকার পর ২০১০ সালে তিনি ভূমিধস জয় পান। এই জয় তাকে হাঙ্গেরির সংবিধান পুনর্লিখন এবং 'অনুদার গণতন্ত্র' তৈরির লক্ষ্যে বড় বড় আইন পাস করার সুযোগ করে দেয়।
নির্বাহী ক্ষমতা কুক্ষিগত করা, এনজিও-র কার্যক্রম ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ওপর নতুন বিধিনিষেধ আরোপ এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা খর্ব করার ফলে গণতান্ত্রিক মানদণ্ড নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে তার সংঘাত বাধে। এর ফলে হাঙ্গেরির জন্য বরাদ্দ করা বিলিয়ন বিলিয়ন ইউরো তহবিল স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেয় ইইউ।
কিন্তু রোববার রাতে অরবানের সেই সাজানো বাগান ধসে পড়ে। প্রাথমিক ফলাফল অনুযায়ী, মাগিয়ার সংসদীয় নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে যাচ্ছেন, যা তার সেন্টার-রাইট পার্টিকে অরবানের সব বিতর্কিত সংস্কার বাতিল করার ক্ষমতা দেবে।
পরাজয় স্বীকার করে অরবান সমর্থকদের বলেন, 'আজ রাতের নির্বাচনের ফলাফল আমাদের দেশ ও জাতির ভাগ্যের জন্য কী অর্থ বহন করে এবং এর গভীর বা মহৎ মানে কী, তা এখনো অস্পষ্ট। আমরা এখনো জানি না। সময় তা বলে দেবে।'
তিনি আরও বলেন, 'তবে ফলাফল যাই হোক না কেন, আমরা বিরোধী দল থেকে আমাদের দেশ ও হাঙ্গেরীয় জাতির সেবা করে যাব।'
'ট্রাম্প-পুতিনের সঙ্গে সখ্য'
২০১৫ সালের ইউরোপীয় অভিবাসী সংকটের সময় অরবান নিজেকে হাঙ্গেরির জাতীয় পরিচয় এবং খ্রিস্টান ঐতিহ্যের অভিভাবক হিসেবে তুলে ধরেন। তিনি মধ্যপ্রাচ্য ও তার বাইরে থেকে আসা মুসলিম শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়ার ইইউ কোটা প্রত্যাখ্যান করেন। তার সরকার ধীরে ধীরে এলজিবিটিকিউ+ অধিকার খর্ব করার পদক্ষেপও নিয়েছে।
অভিবাসন নিয়ে তার কঠোর অবস্থান এবং হাঙ্গেরির হ্রাসমান জন্মহার পুনরুজ্জীবিত করার প্রচেষ্টা ট্রাম্পসহ অন্যান্য রক্ষণশীল নেতাদের প্রশংসা কুড়িয়েছে।
অরবান—যিনি ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২২ সালের নির্বাচনেও বিপুল বিজয় অর্জন করেছিলেন—এবার ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি, ফ্রান্সের মেরিন লে পেন এবং জার্মানির অ্যালিস উইডেলের সমর্থন নিশ্চিত করেছিলেন।
ট্রাম্পও অরবানকে সমর্থন করে বলেছিলেন, ওয়াশিংটনে ডেমোক্রেটিক প্রশাসনের অধীনে বছরের পর বছর দ্বন্দ্বের পর তাদের নেতৃত্বের কারণে মার্কিন-হাঙ্গেরি সম্পর্ক 'নতুন উচ্চতায়' পৌঁছেছে।
অরবান রাশিয়ার সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন। রাশিয়া হাঙ্গেরির অন্যতম প্রধান জ্বালানি সরবরাহকারী। এছাড়া তিনি চীনের সাথেও সখ্যতা রেখেছিলেন, যাদের সংস্থাগুলো হাঙ্গেরিতে বড় আকারের ইভি (ইলেকট্রিক ভেহিকল) এবং ব্যাটারি প্ল্যান্ট নির্মাণ করছে।
'নিরাপদ পছন্দ'
তিনি এই নির্বাচনকে 'যুদ্ধ না শান্তি' এই দুইয়ের মধ্যে একটি বেছে নেওয়ার লড়াই হিসেবে প্রচারের চেষ্টা করেছিলেন। তিনি দাবি করেছিলেন, তিসা পার্টি হাঙ্গেরিকে প্রতিবেশী ইউক্রেনের চলমান যুদ্ধে টেনে নিতে চায়—যা মাগিয়ার পক্ষ থেকে কঠোরভাবে অস্বীকার করা হয়েছে।
ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনি প্রচারণায় অরবান বলেছিলেন, 'শান্তির জন্য ফিদেসই নিরাপদ পছন্দ।'
তিনি ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সাথে বারবার দ্বন্দ্বে জড়িয়েছেন এবং কিয়েভের জন্য ৯০ বিলিয়ন ইউরোর সাহায্য প্যাকেজ আটকে দিয়ে হাঙ্গেরির ইইউ অংশীদারদের ক্ষুব্ধ করেছেন।
কিন্তু জরিপে দেখা গেছে, হাঙ্গেরির ভোটাররা ইউক্রেন যুদ্ধের চেয়ে স্বাস্থ্যসেবা এবং অর্থনীতির মতো অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে বেশি চিন্তিত ছিলেন, যা গত তিন বছর ধরে স্থবির হয়ে আছে।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণের পর হাঙ্গেরি ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ মুদ্রাস্ফীতির শিকার হয়। এর ফলে খাদ্যের দাম ইইউ-র গড় পর্যায়ের কাছাকাছি চলে গেলেও হাঙ্গেরীয়দের মজুরি এখনো ২৭টি দেশের ব্লকের মধ্যে তৃতীয় সর্বনিম্ন।
পরিবারগুলোর জন্য সস্তা ঋণ এবং কর সুবিধার মতো উদার নীতিমালা থাকা সত্ত্বেও কট্টর ডানপন্থার দিকে ঝুঁকে পড়ার কারণে অরবান তরুণ ভোটারদের সমর্থন হারিয়েছেন বলে মনে করা হচ্ছে।
নির্বাচনের আগের জরিপগুলোতে দেখা গেছে, তরুণ ভোটাররা পরিবর্তনের জন্য বিশেষভাবে আগ্রহী ছিলেন। অরবান কখনো এই তরুণদের মন জয়ের চেষ্টা করেছেন, আবার কখনো তার নেতৃত্বের বিরুদ্ধে তাদের বিরোধিতাকে 'ভণ্ড বিদ্রোহ' বলে উপহাস করেছেন।
পাঁচ সন্তানের জনক এবং একজন দাদা অরবান বলেছিলেন, 'আমি জানি তরুণরা তাদের বাবা-মায়ের বিরুদ্ধে যেতে পছন্দ করে এবং এটি রাজনৈতিক সমস্যা তৈরি করতে পারে।' অসংখ্য নির্বাচনি সমাবেশে যোগ দেওয়া এবং ইন্টারভিউ ও সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টের বন্যা বইয়ে দিলেও গত বছরের শেষের দিকে তিনি দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকার ক্লান্তি সম্পর্কে একটি বিরল আভাস দিয়েছিলেন।
তিনি বলেছিলেন, 'যখন আমি সৈনিক ছিলাম (সামরিক সেবা দেওয়ার সময়), তারা আমাদের বলত একজন সৈনিকের শীত লাগতে পারে না, সে কেবল শীত অনুভব করতে পারে। আমিও তাই। আমি ক্লান্ত নই। শুধু আমার শক্তি ফুরিয়ে আসছে।'
