মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের অর্থনৈতিক ধাক্কা, আইএমএফ–বিশ্বব্যাংক বৈঠকে পড়বে ছায়া
বিশ্বের শীর্ষ অর্থনৈতিক কর্মকর্তারা এ সপ্তাহে ওয়াশিংটনে একত্রিত হচ্ছেন এমন এক প্রেক্ষাপটে, যখন মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বৈশ্বিক অর্থনীতিতে তৃতীয় বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা দিয়েছে। এর আগে কোভিড-১৯ মহামারি এবং ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন বিশ্ব অর্থনীতিকে যখন বিপর্যস্ত করে– তখনও তার ছায়া পড়েছিল বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের সভায়।
গত সপ্তাহে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তারা জানান, এই যুদ্ধের কারণে তারা বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমাবেন এবং মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাস বাড়াবেন। তারা সতর্ক করে বলেন, জ্বালানির উচ্চ মূল্য এবং সরবরাহ বিঘ্নের কারণে উদীয়মান বাজার ও উন্নয়নশীল দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
গত বছরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বাণিজ্য অংশীদার দেশগুলোর ওপর শুল্কারোপ করলে বিশ্ব অর্থনীতিতে এর বড় প্রভাব পড়ে। তবুও এ বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান যুদ্ধ শুরুর আগে, উভয় প্রতিষ্ঠানই বৈশ্বিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতার কারণে প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস বাড়ানোর আশা করছিল। কিন্তু যুদ্ধের ধারাবাহিক ধাক্কা প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধার এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের অগ্রগতি ধীর করে দেবে।
বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ বেজলাইন পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে উদীয়মান ও উন্নয়নশীল অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ৩.৬৫% হবে, যা গত বছরের অক্টোবরে দেওয়া ৪% পূর্বাভাস থেকে কম। তবে যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে এই হার ২.৬% পর্যন্ত নেমে আসতে পারে। একইসঙ্গে, ওই দেশগুলোর মূল্যস্ফীতি ২০২৬ সালে ৪.৯% হতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, যা আগের ৩% থেকে বেশি; সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিতে এটি ৬.৭% পর্যন্ত বাড়তে পারে।
গত সপ্তাহে আইএমএফ সতর্ক করে বলেছে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে এবং সার সরবরাহ ব্যাহত হতে থাকলে আরও প্রায় সাড়ে ৪ কোটি মানুষ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার মুখে পড়তে পারে।
বর্তমানে বিশ্বের অনেক দেশেই সরকারি ঋণের পরিমাণ রেকর্ড উচ্চতায় অবস্থান করছে, তাদের বাজেট সক্ষমতাও সীমিত। এই প্রেক্ষাপটে, নতুন এই সংকটের মধ্যে আইএমএফ এবং বিশ্বব্যাংক দ্রুত সাড়া দেওয়ার চেষ্টা করছে এবং ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোকে সহায়তা দিতে উদ্যোগী হচ্ছে।
আইএমএফ জানিয়েছে, স্বল্প আয়ের ও জ্বালানি আমদানিকারক দেশগুলোর জন্য স্বল্পমেয়াদে ২০ বিলিয়ন থেকে ৫০ বিলিয়ন ডলারের জরুরি সহায়তার চাহিদা তৈরি হতে পারে। বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, তারা স্বল্পমেয়াদে প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলার এবং প্রয়োজনে ছয় মাসে সর্বোচ্চ ৭০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত তহবিল দিতে পারবে।
তবে অর্থনীতিবিদরা সরকারগুলোকে সতর্ক করে বলেছেন, নাগরিকদের ওপর উচ্চমূল্যের চাপ কমাতে কেবল লক্ষ্যভিত্তিক ও সাময়িক পদক্ষেপ নেওয়া উচিত, কারণ ব্যাপক পদক্ষেপ নিলে তা মূল্যস্ফীতি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা বার্তাসংস্থা রয়টার্সকে বলেন, "নেতৃত্ব গুরুত্বপূর্ণ, এবং আমরা অতীতেও সংকট মোকাবিলা করেছি।" তিনি বলেন, আর্থিক ও মুদ্রানীতির কার্যকর ব্যবস্থাপনা আগের সংকটগুলো মোকাবিলায় সহায়তা করেছে। কিন্তু বর্তমান সংকট পুরো ব্যবস্থার ওপর একটি বড় ধাক্কা।
বর্তমানে দেশগুলোকে এক কঠিন ভারসাম্য রক্ষা করতে হচ্ছে—একদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, অন্যদিকে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ নিতে হচ্ছে। ২০৩৫ সালের মধ্যে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে কর্মক্ষম বয়সে পৌঁছানো ১২০ কোটি মানুষের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টিও এক বড় চ্যালেঞ্জ, দীর্ঘমেয়াদে সে লক্ষ্যেও পদক্ষেপ নিতে হচ্ছে।
আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক এখন এক ভিন্ন বৈশ্বিক বাস্তবতার মুখোমুখি, যেখানে বিশ্বের বৃহত্তম দুই অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে উত্তেজনা তীব্র, এবং জি-২০ভুক্ত বড় অর্থনীতির দেশগুলোর জোট কার্যকর সমন্বয় করতে হিমশিম খাচ্ছে।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র জি-২০ এর সভাপতিত্ব করছে, যেখানে রাশিয়া ও চীনও সদস্য। তবে আরেক সদস্য দক্ষিণ আফ্রিকাকে অংশগ্রহণ থেকে বাদ দেওয়ায় বর্তমান সংকটের মধ্যে সমন্বয় করা আরও জটিল হয়ে পড়েছে।
