ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংলাপ: কারা থাকছেন আলোচনায় এবং কেন এই বৈঠক গুরুত্বপূর্ণ?
একটি 'পুরো সভ্যতা' মুছে দেওয়ার নজিরবিহীন হুমকির সময়সীমা শেষ হওয়ার মাত্র কয়েক মিনিট আগে গত বুধবার দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়া যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের যুদ্ধের উত্তাপে সাময়িক বিরতি এসেছে। বিশ্বের একটি বড় অংশ যে খবরের অপেক্ষায় ছিল, তা মূলত সম্ভব হয়েছে পাকিস্তানের নেতৃত্বে পরিচালিত দীর্ঘ এক রাতের 'ব্যাক-চ্যানেল' বা নেপথ্য কূটনীতির ফলে। এখন এই ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি কোনোমতে টিকে থাকার এবং উত্তেজনা অব্যাহত থাকার মধ্যেই আগামী শনিবার ইসলামাবাদে যুযুধান পক্ষগুলোর মধ্যে আলোচনা শুরু হতে যাচ্ছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইতিপূর্বে তার সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম 'ট্রুথ সোশ্যাল'-এ জানিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের কাছ থেকে একটি ১০-দফা প্রস্তাব পেয়েছে, যেটিকে তিনি আলোচনার জন্য একটি 'কার্যকর ভিত্তি' হিসেবে বর্ণনা করেছেন। অন্যদিকে, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দেওয়া একটি ১৫-দফা প্রস্তাবের কথা উল্লেখ করেছেন, যা এই সংঘাত নিরসন করতে পারে বলে আলোচকরা মনে করছেন। তবে কোনো প্রস্তাবই এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। অনলাইনে উভয় প্রস্তাবের বিভিন্ন সংস্করণ ফাঁস হয়েছে এবং তা থেকে মনে হচ্ছে উভয় পক্ষ এখনো মেরু ব্যবধানে অবস্থান করছে, যা আগামী বৈঠকটিকে আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
আগামী ১১ এপ্রিল থেকে শুরু হতে যাওয়া এই 'ইসলামাবাদ সংলাপ'-এ অংশ নিতে ওয়াশিংটন ও তেহরানের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা আগামী শুক্রবার পাকিস্তানে পৌঁছাবেন। এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, উভয় পক্ষই শক্তিশালী প্রতিনিধিদল নির্বাচন করেছে; যার মধ্যে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স থেকে শুরু করে ইরানের আরাকচি রয়েছেন। এই চূড়ান্ত আলোচনার পথে দুই পক্ষের হয়ে কারা টেবিলে বসছেন, তাদের ভূমিকা কী এবং আগের ঘটনাবলী কীভাবে এই আলোচনাকে প্রভাবিত করেছে, তার একটি বিস্তারিত চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো।
মার্কিন পক্ষের নেতৃত্বে রয়েছেন দেশটির ৫০তম ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, যিনি ট্রাম্পের অন্যতম প্রধান সহযোগী এবং তার 'মেইক আমেরিকা গ্রেট এগেইন' আন্দোলনের সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে বিবেচিত। রাজনীতিতে আসার আগে ভ্যান্স মার্কিন মেরিন কোরে কাজ করেছেন এবং ইরাকে মোতায়েন ছিলেন, যেখানে তিনি সামরিক সাংবাদিক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সেই অভিজ্ঞতা তার প্রাথমিক বিশ্বদর্শন গঠনে প্রভাব ফেলেছিল এবং তাকে বিদেশের মাটিতে মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের একজন কড়া সমালোচকে পরিণত করেছিল। পরবর্তীতে বেসামরিক জীবনে ফিরে তিনি সিলিকন ভ্যালি-সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন, যা পরে ২০২২ সালে তার রাজনৈতিক প্রচারণায় অর্থায়নে সহায়তা করেছিল।
২০১৬ সালের দিকে ভ্যান্স ট্রাম্পের ঘোর সমালোচক ছিলেন এবং নিজেকে নিজের কমিউনিটির অর্থনৈতিক উন্নয়নের কারিগর হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। তবে সময়ের সাথে সাথে তার আমূল পরিবর্তন ঘটেছে। একসময়ের 'কট্টর ট্রাম্প-বিরোধী' ভ্যান্স এখন প্রেসিডেন্টের সাথে দৃঢ়ভাবে একাত্ম এবং বিদেশের মাটিতে মার্কিন হস্তক্ষেপের মতো বিষয়েও তিনি ট্রাম্পের পাশেই দাঁড়াচ্ছেন—যা একসময় তিনি নিজেই বিরোধিতা করতেন।
ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ভ্যান্স সামরিক অভিযান 'অপারেশন এপিক ফিউরি' থেকে লক্ষণীয়ভাবে একটি পরিমিত দূরত্ব বজায় রেখেছেন। তবে এই দূরত্ব মানেই কিন্তু নিস্ক্রিয়তা নয়। বাস্তবে গত কয়েক দিনে ভ্যান্স পাকিস্তানের মধ্যস্থতা প্রচেষ্টায় এক কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। ট্রাম্পের নির্দেশনায় গত মঙ্গলবার তিনি ইসলামাবাদের মধ্যস্থতাকারীদের সাথে কথা বলেন। সেই কথোপকথনে তিনি ইঙ্গিত দেন যে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট যুদ্ধবিরতিতে আগ্রহী, তবে শর্ত হলো যুক্তরাষ্ট্রের নির্দিষ্ট চাহিদাগুলো পূরণ করতে হবে। রয়টার্সের বর্ণনা অনুযায়ী, ভ্যান্স সেখানে একটি 'কঠোর বার্তা' দিয়েছিলেন যে প্রেসিডেন্ট ধৈর্য হারিয়ে ফেলছেন এবং তেহরান যদি চুক্তিতে সম্মত না হয়, তবে ইরানি অবকাঠামোর ওপর চাপ আরও তীব্র হবে।
আল-জাজিরার মতে, মার্চ মাসের শেষ দিক থেকে শুরু হওয়া নিবিড় মধ্যস্থতা প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির নিয়মিত ভ্যান্সের সাথে যোগাযোগ রাখছেন। ভ্যান্স এর আগে দুইবার ইরানি প্রতিনিধিদের সাথে আলোচনার জন্য ইসলামাবাদ আসার প্রস্তুতি নিলেও শেষ মুহূর্তে তেহরান অভ্যন্তরীণ পর্যালোচনার জন্য সময় চেয়ে তা বাতিল করেছিল। এই প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও ইরান অন্য মার্কিন প্রতিনিধিদের তুলনায় জেডি ভ্যান্সকে অনেক বেশি বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে করছে। দ্য টেলিগ্রাফের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইতিপূর্বে মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনারের সাথে আলোচনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তেহরানে সামরিক হামলার ঘটনা ঘটায় ইরান তাদের সাথে কথা বলতে অস্বীকার করেছিল। একটি উপসাগরীয় সূত্র জানায়, "ভ্যান্সই সেখানে অগ্রাধিকার পাচ্ছেন।"
রিয়েল এস্টেট বিলিয়নিয়ার থেকে কূটনীতিবিদে পরিণত হওয়া স্টিভ উইটকফ বর্তমান সংঘাতের আগে ও পরে ওয়াশিংটনের ইরান নীতি নির্ধারণে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে উঠে এসেছেন। ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের বন্ধু উইটকফ ২০২৫ সাল থেকে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত এবং শান্তি মিশনের বিশেষ দূত হিসেবে কাজ করছেন। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি তিনি এবং প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা জ্যারেড কুশনার ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও আঞ্চলিক কার্যক্রম সীমিত করার লক্ষ্যে তেহরানের সাথে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক পরিচালনা করেছিলেন। সেই আলোচনা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয় এবং তার জের ধরেই ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরু হয়। কূটনীতিবিদরা পরবর্তীতে আলোচনার সেই ব্যর্থতার জন্য উইটকফকে দায়ী করেন। এক উপসাগরীয় কর্মকর্তা তার বিরুদ্ধে 'অপ্রথাগত' কূটনীতির অভিযোগ তোলেন যা উত্তেজনা বাড়াতে ভূমিকা রেখেছিল।
তবে মার্চের শেষ নাগাদ উইটকফ আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন এবং ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে ইরানের কাছে ১৫ দফার একটি পরিকল্পনা পেশ করেন। তিনি দাবি করেন যে তেহরান সম্ভবত এই সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজছে। তবে তিনি জনপ্রিয় কোনো আলোচক নন। মিডল ইস্ট মনিটর জানিয়েছে, ইরান মধ্যস্থতাকারীদের স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে তারা উইটকফ ও কুশনারকে বিশ্বাস করে না এবং ভবিষ্যৎ আলোচনায় তাদের সম্পৃক্ততা চায় না। ইরান তাদের 'অনির্ভরযোগ্য' হিসেবে বিবেচনা করছে।
জ্যারেড কুশনার ট্রাম্পের জামাতা এবং মিয়ামি-ভিত্তিক প্রাইভেট ইকুইটি ফার্ম 'অ্যাফিনিটি পার্টনার্স'-এর প্রতিষ্ঠাতা। তার এই প্রতিষ্ঠান ২০২৫ সাল পর্যন্ত ৫.৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি সম্পদ ব্যবস্থাপনা করছিল। ফোর্বস-এর তথ্য অনুযায়ী, সৌদি ও কাতারি সার্বভৌম সম্পদ তহবিলসহ হাই-প্রোফাইল মধ্যপ্রাচ্য দাতাদের কাছ থেকে তিনি ৪.৬ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করেছেন। ২০১৭ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে তিনি সিনিয়র অ্যাডভাইজার ছিলেন। গত গ্রীষ্ম থেকে তিনি আবারও ট্রাম্পের উচ্চপর্যায়ের শান্তি দূত হিসেবে আবির্ভূত হন এবং গাজায় ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতিতে সহায়তা করেন। এছাড়া রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের আলোচনাতেও তিনি ভূমিকা রেখেছেন। তবে ইরান তার বিরুদ্ধে 'পেছন থেকে ছুরি মারা'র অভিযোগ তুলে সরাসরি আলোচনায় বসতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
ইরানের প্রতিনিধিদলের প্রধান হলেন আব্বাস আরাকচি, যিনি ২০২৪ সালের ২১ আগস্ট থেকে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি ১৯৯৬ সালে যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অফ কেন্ট থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে পিএইচডি অর্জন করেন। ১৯৮৯ সালে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিভাগে বিশেষজ্ঞ হিসেবে তার কর্মজীবন শুরু হয়। আরাকচি ফিনল্যান্ডে ইরানের রাষ্ট্রদূত এবং জাপানেও দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০১৩ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত তিনি ইরানের প্রধান পারমাণবিক আলোচক ছিলেন এবং ২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ইরানের পারমাণবিক চুক্তিতে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলী ভূমিকা পালন করেন। রয়টার্স তাকে "কঠিন আলোচনার ওস্তাদ" হিসেবে বর্ণনা করেছে। সংঘাতের শুরু থেকেই আরাকচি মার্কিন-ইসরায়েলি হামলাকে 'অবৈধ' হিসেবে বর্ণনা করে আসছেন, তবে একই সাথে পাকিস্তানের মধ্যস্থতা প্রচেষ্টাকেও স্বাগত জানিয়েছেন।
ইরানি প্রতিনিধিদলের আরেক প্রভাবশালী মুখ হলেন দেশটির পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। তাকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনির অন্যতম শীষ্য এবং তার ছেলে মোজতবা খামেনির অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি হিসেবে দেখা হয়। গালিবাফ মাত্র ১৮ বছর বয়সে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীতে (আইআরজিসি) যোগ দেন এবং ইরান-ইরাক যুদ্ধে সম্মুখ সমরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৯৭ সালে তিনি আইআরজিসি-র অ্যারোস্পেস ফোর্সের কমান্ডার এবং পরবর্তীতে ইরানের জাতীয় পুলিশ প্রধান নিযুক্ত হন। রক্ষণশীল এই নেতা কয়েকবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। ২০২০ সালে তিনি স্পিকার নির্বাচিত হন।
গালিবাফকে এমন এক বিরল ব্যক্তিত্ব বলা হয় যাঁর প্রভাব সামরিক, নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক—তিনটি ক্ষেত্রেই সমানভাবে বিস্তৃত। মার্কিন হামলায় আলী লারিজানি নিহত হওয়ার পর তিনি আরও প্রভাবশালী হয়ে উঠেছেন। তিনি কাসেম সোলেইমানিরও ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন। অ্যাক্সিওস-এর তথ্যমতে, গালিবাফ ইতোমধ্যে মার্কিন প্রতিনিধিদের সাথে নেপথ্য আলোচনায় যুক্ত হয়েছেন। ওয়াশিংটনের কাছে তিনি একজন 'হট অপশন' বা আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বিবেচিত হলেও পলিতিকো-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন প্রশাসন তার বিষয়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। এপ্রিলের শুরুতে যুদ্ধবিরতি প্রক্রিয়া গতি পাওয়ার সময় গালিবাফ আলোচনার কার্যকারিতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে বলেছিলেন যে, ক্রমাগত হামলা ও চুক্তি লঙ্ঘনের মুখে সংলাপ 'অর্থহীন'।
