ইরান যুদ্ধ শেষ করার আগে হরমুজ খোলার প্রতিশ্রুতি দিতে পারছে না ট্রাম্প প্রশাসন
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তার প্রশাসন ক্রমেই মনে করছে, ইরান যুদ্ধে 'মিশন অ্যাকমপ্লিশড' বা লক্ষ্য অর্জনের ঘোষণা দেওয়ার আগে তারা হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিতে পারবে না। এই আলোচনার সাথে পরিচিত সূত্রগুলো সিএনএন-কে এমনটাই জানিয়েছে।
হোয়াইট হাউসের ভেতরে অনেক শীর্ষ কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন, তেহরানের নিয়ন্ত্রিত এই তেলের নৌপথটি পুনরায় সচল করা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য। এটি কেবল যুদ্ধ শেষ করার জন্যই নয়, বরং তেলের আকাশচুম্বী দাম কমানোর জন্যও জরুরি। কারণ এই মূল্যবৃদ্ধি ইতোমধ্যেই নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে রিপাবলিকানদের জন্য একটি বড় রাজনৈতিক ঝুঁকি হয়ে উঠছে।
কিন্তু ট্রাম্পের নিজের দেওয়া চার থেকে ছয় সপ্তাহের সময়সীমার মধ্যে যুদ্ধ শেষ করার চাপে পড়ে প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা গোপনে স্বীকার করেছেন যে, তারা একই সাথে সামরিক লক্ষ্য অর্জন এবং এই সময়ের মধ্যে প্রণালি খুলে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিতে পারছেন না।
গোয়েন্দা সংস্থাগুলো অনুমান করছে, এই নৌপথকে পূর্ণ সচল অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে কয়েক সপ্তাহ, এমনকি কয়েকমাস সময় লেগে যেতে পারে। উল্লেখ্য, বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল এই পথ দিয়েই সরবরাহ করা হয়।
পরিবর্তে, ট্রাম্প প্রকাশ্যে এবং তার সহযোগীদের কাছে জানিয়েছেন, তিনি মনে করেন অন্য দেশগুলোর এই বোঝার কিছুটা, বা বড় অংশ কাঁধে নেওয়া উচিত। তিনি যুক্তি দিয়েছেন, যেহেতু অনেক ইউরোপীয় দেশ তাদের তেলের জন্য এই প্রণালির ওপর বেশি নির্ভরশীল, তাই এটি পুনরায় সচল করার দায়িত্বও তাদের নিতে হবে।
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ওভাল অফিসে ট্রাম্প বলেন, 'প্রণালিতে কী ঘটছে, তার সাথে আমাদের কোনো সম্পর্ক থাকবে না।' তিনি বিশ্বাস করেন যুদ্ধ দুই বা তিন সপ্তাহের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে। তিনি আরও দাবি করেন, যুদ্ধ শেষ হওয়ার সাথে সাথেই যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসের দাম দ্রুত কমে যাবে।
এর আগে মঙ্গলবার, ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লেখেন যে, অন্য দেশগুলোর উচিত এই নৌপথ পাহারায় এগিয়ে আসা।
ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে লেখেন, 'সাহস সঞ্চয় করুন, প্রণালিতে যান এবং এটি দখল করে নিন। আপনাদের নিজেদের জন্য লড়াই করা শিখতে হবে, যুক্তরাষ্ট্র আপনাদের সাহায্য করার জন্য আর সেখানে থাকবে না, ঠিক যেমন আপনারা আমাদের পাশে ছিলেন না।' এখানে তিনি বিশেষভাবে যুক্তরাজ্যের কথা উল্লেখ করেন।
ট্রাম্প গত কয়েক সপ্তাহ ধরে মিত্রদের ওপর চাপ দিচ্ছেন যাতে তারা তেলের ট্যাংকারগুলোকে পাহারা দিতে নিজস্ব নৌবাহিনী পাঠায়। কিন্তু যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে কোনো দেশই এতে রাজি না হওয়ায় তিনি ক্রমেই বিরক্ত হয়ে উঠছেন।
এদিকে, অনেক বিদেশি নেতার সম্মিলিত ধারণা হলো, ট্রাম্প নিজের তৈরি করা একটি সমস্যা তাদের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে যুদ্ধ শেষ করতে চাইছেন।
ইউরোপীয় নেতারা—যাদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলার আগে কোনো পরামর্শ করেনি—যুদ্ধ চলাকালে এতে জড়াতে অাগ্রহী নন। বেশ কিছু দেশ ভবিষ্যতে প্রণালি পাহারায় সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিলেও কোনো সুনির্দিষ্ট সময়সীমা জানায়নি।
ট্রাম্প মনে করেন, ইরানের সঙ্গে শত্রুতা শেষ হলে প্রণালি খোলা সহজ হবে। মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রে তেলের গড় দাম ২০২২ সালের পর প্রথমবারের মতো প্রতি গ্যালন ৪.০২ ডলারে পৌঁছালেও ট্রাম্প এবং হোয়াইট হাউস একে অস্থায়ী সমস্যা হিসেবে উড়িয়ে দিয়েছেন। সিবিএস নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, 'আমরা চলে গেলে বা যুদ্ধ শেষ হলেই দাম কমে যাবে।'
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলি সিএনএন-কে বলেন, জ্বালানি খরচ কমাতে প্রশাসন রুশ তেলের ওপর থেকে কিছু নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং ট্যাংকারের বিমা প্রদানের মতো পদক্ষেপ নিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, 'প্রেসিডেন্ট আত্মবিশ্বাসী যে প্রণালিটি খুব শীঘ্রই খুলে যাবে।'
প্রশাসনের ভেতরে অনেকে মনে করেন, ইউরোপীয় দেশগুলোর প্রতি তার কঠোর বক্তব্য শুধু তার প্রকৃত মনোভাবই নয়, বরং এটি একটি কার্যকর রাজনৈতিক কৌশলও।
এক কর্মকর্তা বলেন, 'এটা শুধু যুক্তরাষ্ট্রের সমস্যা নয়—এ কথা বলা ঠিক। একই সঙ্গে এটাকে একটি যৌথ সমস্যা হিসেবে উপস্থাপন করাও ভালো রাজনীতি এবং জনসংযোগ কৌশল।'
প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ মঙ্গলবার পেন্টাগনে বলেন, 'হরমুজ প্রণালি ইস্যুটি কেবল যুক্তরাষ্ট্রের সমস্যা নয়। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প শুরু থেকেই নেতৃত্ব দিয়েছেন, কিন্তু এখন অন্যদেরও মনোযোগ দেওয়া উচিত। আপনাদের নিজেদের জন্য লড়তে শেখা উচিত।'
পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছেন, প্রণালিতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্র এখনো একটি আন্তর্জাতিক জোট গঠনের চেষ্টা করছে—তবে এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য।
তিনি গত শুক্রবার ফ্রান্সে জি-৭ ভুক্ত দেশগুলোর সাথে এই বিষয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এই জোটে কেবল একটি সহায়ক ভূমিকা পালন করবে, নেতৃত্ব দেবে না।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্র যখন প্রণালি পুনরায় চালুর নেতৃত্ব অন্যদের হাতে ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবছে, তখন চীন ও পাকিস্তান মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফেরাতে একটি পাঁচ দফা পরিকল্পনা প্রস্তাব করেছে।
মঙ্গলবার তাদের যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, 'চীন ও পাকিস্তান হরমুজ প্রণালিতে আটকে পড়া জাহাজ ও নাবিকদের নিরাপত্তা রক্ষা করতে এবং বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর নিরাপদ যাতায়াত দ্রুত পুনরুদ্ধার করতে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে।'
