যুক্তরাষ্ট্রের আশা, কয়েক মাস নয়, কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই শেষ হবে ইরান অভিযান: মার্কো রুবিও
ওয়াশিংটন আশা করছে, ইরানের বিরুদ্ধে তাদের সামরিক অভিযান 'মাস নয়, কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই' শেষ হবে—এমনটাই জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। যদিও পুরো অঞ্চলে সহিংসতা অব্যাহত রয়েছে এবং ইসরায়েল ইসলামি প্রজাতন্ত্রটির বিরুদ্ধে হামলা 'বাড়ানো ও বিস্তৃত করার' হুমকি দিয়েছে।
শুক্রবার ফ্রান্সে জি৭ পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠকের পর সাংবাদিকদের রুবিও বলেন, 'আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে আমরা যখন তাদের সঙ্গে এখানকার কাজ শেষ করব, তখন তারা সাম্প্রতিক ইতিহাসের যেকোনো সময়ের চেয়ে দুর্বল হয়ে পড়বে।'
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ অভিযান কতদিন চলবে, তা নিয়ে মার্কিন কর্মকর্তাদের মধ্যে ভিন্নমত দেখা গেছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি আকস্মিক হামলার মধ্য দিয়ে এই অভিযান শুরু হয়, যাতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনি নিহত হন।
তবে ইরান এখনও দৃঢ় অবস্থানে রয়েছে। তারা ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর আলোচনা 'ভালোভাবে এগোচ্ছে' এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে। তেহরান বলছে, কোনো আলোচনা চলছে না।
অন্যদিকে ট্রাম্পের দূত স্টিভ উইটকফ শুক্রবার বলেন, 'আমরা মনে করছি এই সপ্তাহেই বৈঠক হতে পারে। আমরা সে ব্যাপারে আশাবাদী।'
পরবর্তীতে ট্রাম্প দাবি করেন, আলোচনায় জড়িত না থাকার বিষয়ে ভুল বক্তব্য দেওয়ার 'ক্ষতিপূরণ' হিসেবে ইরান যুক্তরাষ্ট্রে ১০টি তেলবাহী জাহাজ পাঠিয়েছে।
লেবাননের রাজধানী বৈরুতে ভোরের আগে ইসরায়েলি হামলায় দুইজন নিহত হয়েছে বলে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। একই সময়ে ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চলতে থাকে।
ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ বলেন, 'সতর্কতা সত্ত্বেও হামলা অব্যাহত রয়েছে। তাই ইরানে হামলা আরও বাড়ানো হবে এবং এমন সব লক্ষ্যবস্তুতে বিস্তৃত করা হবে, যা ইসরায়েলি নাগরিকদের বিরুদ্ধে অস্ত্র তৈরিতে সহায়তা করে।'
শুক্রবার ইসরায়েলের সর্বশেষ হামলায় ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্যবস্তু করা হয়। ধারণা করা হচ্ছে, হোয়াইট হাউস থেকে হামলা কমানোর চাপ আসার আগেই কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার চেষ্টা চলছে।
এই যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে এবং এর অর্থনৈতিক প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে। এর বড় কারণ হলো হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নিয়ন্ত্রণ, যেখান দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল পরিবহন হয়।
ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) জানায়, তারা প্রণালি দিয়ে যেতে চাওয়া তিনটি জাহাজ ফিরিয়ে দিয়েছে। তারা আরও জানায়, 'ইসরায়েল-আমেরিকার মিত্র ও সমর্থকদের বন্দর থেকে যাওয়া বা আসা করা সব জাহাজের চলাচল নিষিদ্ধ করেছে।'
আইআরজিসি জানায়, 'দুর্নীতিগ্রস্ত মার্কিন প্রেসিডেন্টের মিথ্যা বক্তব্যের পর, আজ সকালে বিভিন্ন দেশের তিনটি কনটেইনার জাহাজ সতর্কবার্তা দিয়ে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে।'
রুবিও বলেন, হরমুজ প্রণালি খোলা রাখা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক লক্ষ্য অর্জনের পরও একটি 'তাৎক্ষণিক চ্যালেঞ্জ' হয়ে থাকবে। তিনি বলেন, ইরান এখানে টোল বসানোর চেষ্টা করতে পারে, যা বহু দেশের জন্য অর্থনৈতিক ক্ষতি ডেকে আনবে।
তিনি বলেন, 'এটি শুধু অবৈধ নয়, অগ্রহণযোগ্যও… বিশ্বকে এ বিষয়ে একটি পরিকল্পনা করতে হবে।'
রুবিও জানান, প্রণালি পুনরায় চালু করার প্রচেষ্টায় যুক্তরাজ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে, যদিও ট্রাম্প ব্রিটিশ বিমানবাহী রণতরীগুলোকে 'খেলনা' বলে মন্তব্য করেছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্র হাজার হাজার মেরিন ও এলিট সেনা মোতায়েন করেছে। ধারণা করা হচ্ছে, প্রণালি পুনরায় চালু করতে প্রয়োজনে সামরিক অভিযান চালানো হতে পারে, যেমন উপসাগরের কোনো দ্বীপ বা ইরানের প্রধান তেল রপ্তানি কেন্দ্র খার্গ দ্বীপ দখল করা।
শুক্রবার ইরানের অন্যতম ভাইস প্রেসিডেন্ট ইসমাইল সাগাব এসফাহানি হুঁশিয়ারি দেন, স্থল হামলা চালানো হলে সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দর এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ তেল স্থাপনায় হামলা চালানো হবে।
তিনি বলেন, 'ইরানের মাটিতে পা রাখলেই তেলের দাম ১৫০ ডলার ছাড়িয়ে যাবে।'
ট্রাম্প আরও হুমকি দিয়েছেন, ৬ এপ্রিলের মধ্যে যদি ইরান প্রণালিতে অবাধ চলাচল নিশ্চিত না করে, তাহলে তিনি ইরানের জ্বালানি স্থাপনাগুলো ধ্বংসের নির্দেশ দেবেন।
শুক্রবার ইসরায়েল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালায়, যার মধ্যে ভারী পানি উৎপাদন কেন্দ্র এবং ইউরেনিয়াম প্রক্রিয়াজাতকরণ প্ল্যান্ট রয়েছে।
ইরানের পরমাণু শক্তি সংস্থা জানায়, আরাকের শাহিদ খোন্দাব ভারী পানি কমপ্লেক্স এবং ইয়াজদ প্রদেশের আরদাকান প্ল্যান্ট লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। তবে এতে কোনো হতাহত হয়নি এবং দূষণের ঝুঁকিও নেই।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অন্যান্য হামলায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার ও লঞ্চারগুলো লক্ষ্য করা হয়েছে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তেহরানের 'অন্তঃস্থলে' অস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্রেও হামলা চালানো হয়েছে।
রয়টার্স জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, ইরানের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস হয়েছে। ড্রোন সক্ষমতার ক্ষেত্রেও একই অবস্থা।
তবে ইরানের হামলা অব্যাহত রয়েছে, প্রতিদিন ১০ থেকে ২০টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে ছোড়া হচ্ছে।
শুক্রবার ইরানের হামলা সৌদি রাজধানী রিয়াদ ও কুয়েতের দুটি বড় বন্দরে আঘাত হানে।
সংঘাতে প্রাণহানি বাড়ছেই। ইসরায়েলে ১৯ জন নিহত হয়েছে, লেবাননে চারজন ইসরায়েলি সেনা নিহত হয়েছে। ১৩ জন মার্কিন সেনাসহ বহু বেসামরিক মানুষও নিহত হয়েছে।
ইরানে এক হাজার ৯০০ জনের বেশি নিহত এবং অন্তত ২০ হাজার জন আহত হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক রেডক্রস জানিয়েছে।
লেবাননে ইসরায়েলি অভিযানে দেশের এক-পঞ্চমাংশ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে এবং প্রায় এক হাজার ১০০ জন নিহত হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বলছে, তাদের লক্ষ্য হলো ইরান যেন আর কখনো ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, পারমাণবিক কর্মসূচি বা হিজবুল্লাহর মতো মিত্রদের মাধ্যমে হুমকি দিতে না পারে।
তবে 'শাসন পরিবর্তন'-এর লক্ষ্য এখন আর জোর দিয়ে বলা হচ্ছে না।
এদিকে এসিএলইডি-এর তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর ইরানে ৮৫০টির বেশি সরকারপন্থী বিক্ষোভ হয়েছে, যা ইঙ্গিত দেয় যে বড় ক্ষয়ক্ষতির পরও সরকার জনসমর্থন সংগঠিত করতে পারছে।
মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তান বা তুরস্কের মাধ্যমে যোগাযোগের অবস্থা এখনও অস্পষ্ট।
রুবিও জানান, যুক্তরাষ্ট্রের ১৫ দফা প্রস্তাবের জবাবে ইরান সরাসরি উত্তর না দিয়ে 'বার্তা' পাঠিয়েছে।
এই প্রস্তাবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ভেঙে দেওয়া, ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়ন বন্ধ করা এবং হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ হস্তান্তরের মতো শর্ত রয়েছে।
একজন ইরানি কর্মকর্তা বলেন, এই প্রস্তাব শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের স্বার্থ রক্ষা করবে। তবে কূটনীতি শেষ হয়ে যায়নি।
ট্রাম্প দাবি করেছেন, 'ভুয়া সংবাদমাধ্যমের বিপরীত বক্তব্য সত্ত্বেও আলোচনা চলছে এবং ভালোভাবেই এগোচ্ছে।'
জি৭ দেশগুলো হরমুজ প্রণালিতে অবাধ ও টোলমুক্ত নৌ চলাচল নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে এবং বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা বন্ধের দাবি জানিয়েছে।
যুক্তরাজ্যের এক কর্মকর্তা বলেন, যৌথ বিবৃতিটিতে খুব বেশি কিছু বলা হয়নি, তবে অন্তত একটি বিবৃতি তো পাওয়া গেছে।
ট্রাম্প ন্যাটোর সমালোচনা করে বলেন, তারা এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে সাহায্য না করে 'বড় ভুল' করছে।
মার্কিন গণমাধ্যম জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ ইরানে মাইন বসাতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এগুলো যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি 'গেটর' অ্যান্টি-ট্যাংক মাইন।
