ইরানের সঙ্গে আলোচনার কথা বললেও মধ্যপ্রাচ্যে সেনা সমাবেশ বাড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, 'স্পেশাল ফোর্স' মোতায়েন
ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের সাথে আলোচনার কথা বললেও বাস্তবে মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমাগত সেনা পাঠিয়ে শক্তি বৃদ্ধি করছে যুক্তরাষ্ট্র।
গত কয়েক দিন ধরে ক্যালিফোর্নিয়া থেকে প্রায় ২,৫০০ নৌসেনা (মেরিন) এবং তিনটি যুদ্ধজাহাজ ওই অঞ্চলে পাঠানো হচ্ছে। এই বিশেষ বাহিনী মূলত 'স্পেশাল অপারেশন ফোর্স' বা বিশেষ অভিযানের অংশ।
শোনা যাচ্ছে, মার্কিন সেনাবাহিনীর ৮২তম এয়ারবর্ন ডিভিশনকেও সেখানে মোতায়েন করা হবে। এটি একটি দ্রুত সাড়াদানকারী ইউনিট (র্যাপিড রেসপন্স ইউনিট), যা মাত্র ২৪ ঘণ্টার নোটিশে যেকোনো স্থানে অভিযানে নামতে সক্ষম। এই বিশেষ বাহিনীকে ঠিক কী কাজে ব্যবহার করা হবে, তা নিয়ে বর্তমানে নানা জল্পনা চলছে।
অনেকে মনে করছেন, তাদের ইরানের খারগ দ্বীপে অভিযানের জন্য ব্যবহার করা হতে পারে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই দ্বীপটিকে ইরানের 'মুকুটের মণি' বলে অভিহিত করেছেন, কারণ এখান থেকেই ইরান তার বেশিরভাগ তেল রপ্তানি করে থাকে।
তবে এই ধরনের অভিযান পরিচালনা করা অত্যন্ত কঠিন হবে। এর অর্থ হলো মার্কিন বাহিনীকে সরাসরি ইরানের সাথে স্থলযুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে হবে, যা যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত অজনপ্রিয় একটি বিষয়। দেশটিতে একে 'বুটস অন দ্য গ্রাউন্ড' বা সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে সেনা মোতায়েন বলা হয়। এক কথায়, ট্রাম্প প্রশাসন একদিকে আলোচনার কথা বলছে, অন্যদিকে বিপুলসংখ্যক সেনা মোতায়েন ও কড়া বার্তার মাধ্যমে উত্তেজনা বাড়িয়ে দিচ্ছে।
এর আগে হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট বুধবার জানিয়েছিলেন, তেহরান যদি সামরিকভাবে 'পরাজিত' হওয়ার বিষয়টি মেনে নিতে ব্যর্থ হয়, তবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের ওপর আরও শক্তিশালী আঘাত হানবেন।
সাংবাদিকদের সঙ্গে এক ব্রিফিংয়ে লেভিট বলেন, 'প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ফাঁকা হুমকি দেন না এবং তিনি নরক নামিয়ে আনতে প্রস্তুত। ইরানের উচিত হবে না পুনরায় কোনো ভুল হিসাব করা।'
তিনি আরও বলেন, 'ইরান যদি বর্তমান মুহূর্তের বাস্তবতা মেনে নিতে ব্যর্থ হয় এবং তারা যদি এটি বুঝতে না পারে যে তারা সামরিকভাবে পরাজিত হয়েছে এবং হবে, তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিশ্চিত করবেন যেন তারা আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী আঘাতের সম্মুখীন হয়।'
এর প্রতিক্রিয়ায় ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বুধবার গভীর রাতে জানিয়েছেন, তেহরান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাথে যুদ্ধবিরতির আলোচনা নাকচ করে দিয়েছে। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ভবিষ্যৎ সংঘাত রোধ করতে ইরান কেবল 'নিজেদের শর্তেই' এই যুদ্ধের সমাপ্তি চায়।
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আরাগচি বলেন, 'আমরা আমাদের নিজস্ব শর্তে যুদ্ধের সমাপ্তি চাই... এমনভাবে যেন এর পুনরাবৃত্তি আর না ঘটে।' তিনি আরও যোগ করেন, ওয়াশিংটনের সাথে যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা করার কোনো পরিকল্পনা ইরানের নেই এবং বর্তমানে তাদের মূল নীতি হলো 'প্রতিরোধ অব্যাহত রাখা'।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, সংঘাত নিরসনে ইরানের কাছে ১৫ দফার একটি 'রোডম্যাপ' (শান্তি পরিকল্পনা) পাঠিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। পাকিস্তানের মাধ্যমে এই প্রস্তাবটি তেহরানের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। উল্লেখ্য, পাকিস্তান এর আগেই ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শান্তি আলোচনার আয়োজক হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছিল।
তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া ১৫-দফা প্রস্তাব পেয়েছে বলে আল জাজিরাকে নিশ্চিত করেছিলেন ইরানের একজন উচ্চপদস্থ কূটনৈতিক সূত্র।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে ইরান পাল্টা পাঁচটি শর্ত দেয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তার উদ্ধৃতি দিয়ে দেশটির রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম প্রেস টিভির একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে তারা।
এতে আরও বলা হয়, 'ইরান তখনই যুদ্ধ শেষ করবে, যখন নিজে সেটা চাইবে এবং তার নিজস্ব শর্তগুলো পূরণ হবে। তেহরান মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে তাদের হামলা অব্যাহত রাখবে বলেও সতর্ক করেন এই কর্মকর্তা।
প্রতিবেদনটিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের পাশাপাশি ওই কর্মকর্তার বরাত দিয়ে পাল্টা পাঁচটি শর্তের কথা জানানো হয়। সেগুলো হলো- ইরানের কর্মকর্তাদের হত্যা বন্ধ করা, ভবিষ্যতে ইরানের বিরুদ্ধে আর কোনো হামলা না হওয়ার নিশ্চয়তা, চলমান সংঘাতের ক্ষতিপূরণ, অঞ্চলজুড়ে সংঘাতের চূড়ান্ত অবসান এবং হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও নিশ্চয়তা।
এই শর্তগুলো বিশেষ করে ক্ষতিপূরণ এবং হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ সম্ভবত হোয়াইট হাউসের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। কারণ, এই যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহ ইতোমধ্যেই প্রভাবিত হচ্ছে।
