ট্রাম্পের নতুন নিয়মে বাণিজ্যিক ড্রাইভিং লাইসেন্স হারাবেন ২ লাখ অভিবাসী ট্রাকচালক
সোমবার থেকে কার্যকর হওয়া ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন নিয়মে যুক্তরাষ্ট্রে কর্মরত প্রায় ২ লাখ অভিবাসী ট্রাকচালক তাদের বাণিজ্যিক ড্রাইভিং লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা হারাতে শুরু করবেন।
যুক্তরাষ্ট্রের পরিবহন দপ্তরের এই নতুন নিয়ম দেশটির ট্রাক শিল্পের ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষ করে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের কারণে যখন জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী, তখন পণ্য পরিবহনে এই খাতটির গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থী, শরণার্থী এবং 'ডিফার্ড অ্যাকশন ফর চাইল্ডহুড অ্যারাইভালস' (ডিএসিএ) সুবিধাপ্রাপ্ত অভিবাসীরা আর বাণিজ্যিক ড্রাইভিং লাইসেন্স পাবেন না। গত গ্রীষ্মে অভিবাসী ট্রাকচালকদের জড়িয়ে কয়েকটি বড় দুর্ঘটনার পর ট্রাম্প প্রশাসন যে কড়াকড়ি শুরু করেছিল, এই সিদ্ধান্ত তারই অংশ।
তবে বর্তমানে যাদের কাছে বৈধ বাণিজ্যিক লাইসেন্স রয়েছে তাদের ড্রাইভিং সুবিধা এখনই বাতিল করা হবে না। লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে তারা আর তা নবায়ন করতে পারবেন না। ফলে পর্যায়ক্রমে বিপুলসংখ্যক চালক এই পেশা থেকে ছিটকে পড়বেন।
পেনসিলভেনিয়ার ৪১ বছর বয়সী আলেক্সি সেমেনোভস্কি ২০২০ সাল থেকে দূরপাল্লার ট্রাক চালাচ্ছেন। রাশিয়া থেকে আসা এই রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থী আগামী সেপ্টেম্বরে তার লাইসেন্স হারাতে যাচ্ছেন। ট্রাম্প প্রশাসনের এই নিয়মকে চ্যালেঞ্জ করে যে মামলা হয়েছে, তিনি তার অন্যতম বাদী। সেমেনোভস্কি বলেন, 'আমার ড্রাইভিং রেকর্ড একদম পরিষ্কার। কোনো দুর্ঘটনা নেই, কোনো ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন নেই। আমি নিয়মিত কর দেই। অথচ অবৈধ কিছু না করেও আমাকে এখন কঠিন পরিস্থিতির মুখে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।'
ফেডারেল মোটর ক্যারিয়ার সেফটি অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ২ লাখ অভিবাসী বর্তমানে মোট বাণিজ্যিক লাইসেন্সের ৫ শতাংশ ধারণ করছেন। একটি বাণিজ্যিক ট্রেড গ্রুপের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে খাদ্যদ্রব্য থেকে শুরু করে ভারী যন্ত্রপাতি এবং বিপজ্জনক রাসায়নিক—সব ধরনের পণ্যের ৭০ শতাংশই ট্রাকের মাধ্যমে পরিবহন করা হয়। কাজের প্রতিকূল পরিবেশ, কম বেতন এবং পরিবার থেকে দীর্ঘ সময় দূরে থাকার কারণে এই শিল্পে শ্রমিকের অভাব দীর্ঘদিনের। আমেরিকানরা এই পেশা ছেড়ে দেওয়ায় অভিবাসীরাই মূলত এই শূন্যস্থান পূরণ করে আসছিলেন।
গত ১১ ফেব্রুয়ারি ঘোষিত এই নতুন নিয়মে বলা হয়েছে, সাময়িক সুরক্ষাপ্রাপ্ত অভিবাসীরা যুক্তরাষ্ট্রে কাজ করার অনুমতি পেলেও আর বাণিজ্যিক ড্রাইভিং লাইসেন্স পাবেন না। গত মাসে পরিবহন সচিব শন পি ডাফি এক বিবৃতিতে বলেন, 'দীর্ঘদিন ধরে আমেরিকা বিপজ্জনক বিদেশি চালকদের আমাদের ট্রাক লাইসেন্সিং ব্যবস্থার অপব্যবহার করার সুযোগ দিয়েছে, যা আমাদের সড়কে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছে।'
গত গ্রীষ্মে অভিবাসী ট্রাক চালকদের নিয়ে বেশ কয়েকটি প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা ঘটার পর ট্রাম্প প্রশাসন এই কঠোর পদক্ষেপের দিকে এগোয়। ডাফি দাবি করেছেন, অভিবাসীরা যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে অন্য দেশে কেমন গাড়ি চালিয়েছেন তা যাচাই করা সম্ভব হয় না। এছাড়া তিনি অভিযোগ করেন, অবৈধভাবে লাইসেন্স নেওয়া চালকরা আমেরিকান চালকদের মজুরি কমিয়ে দিচ্ছেন।
তবে এই নিয়মের বিরোধীরা বলছেন, অভিবাসীরা বেশি দুর্ঘটনা ঘটায়—এমন কোনো প্রমাণ ছাড়াই ট্রাম্প প্রশাসন তাদের সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ করছে। কারণ 'সিডিএল লাইসেন্স' পেতে হলে অভিবাসী ও আমেরিকান সবাইকে একই ড্রাইভিং স্কুলে যেতে হয় এবং একই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়। এই নিয়মের বিরুদ্ধে মামলা লড়া পাবলিক সিটিজেন লিটিগেশন গ্রুপের আইনজীবী ওয়েন্ডি লিউ বলেন, 'ট্রাম্প প্রশাসনও স্বীকার করেছে যে কোনো ব্যক্তির জন্মভূমি বা আবাসের সঙ্গে নিরাপত্তা পরিস্থিতির কোনো পরীক্ষামূলক সম্পর্ক নেই।'
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে অভিবাসী ট্রাক চালকদের ওপর কড়াকড়ি আরও বেড়েছে। পরিবহন দপ্তর সড়কে চালকদের ইংরেজি ভাষার দক্ষতা পরীক্ষার নিয়ম কঠোর করেছে, যার ফলে হাজার হাজার অভিবাসী চালক গাড়ি চালানোর অধিকার হারিয়েছেন। ডিসেম্বরে প্রায় ৩,০০০ চালক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের স্বীকৃতি বাতিল করা হয়েছে। এছাড়া ক্যালিফোর্নিয়া, নিউ ইয়র্ক এবং পেনসিলভেনিয়ার মতো যেসব অঙ্গরাজ্য অভিবাসীদের লাইসেন্স দিচ্ছে, তাদের ফেডারেল ফান্ড বা কেন্দ্রীয় অর্থায়ন বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন শন পি ডাফি।
ডোনাল্ড ট্রাম্প তার 'স্টেট অফ দ্য ইউনিয়ন' ভাষণে অভিবাসীদের বাণিজ্যিক ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়ার ক্ষেত্রে আরও কড়াকড়ি আরোপ করতে আইন পাসের জন্য কংগ্রেসের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। এর পরদিনই ইন্ডিয়ানা অঙ্গরাজ্যের রিপাবলিকান সিনেটর জিম ব্যাংকস একটি বিল উত্থাপন করেন। এই বিলটি পরিবহন দপ্তরের নিয়মের চেয়েও কঠোর, কারণ সেখানে একই শ্রেণির অভিবাসীদের সকল বাণিজ্যিক লাইসেন্স অবিলম্বে বাতিল করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বিলটি বর্তমানে কংগ্রেসে পাসের প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে।
১ লাখ ৩০ হাজার ছোট ট্রাক কোম্পানি ও স্বতন্ত্র চালকদের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন 'ওনার-অপারেটর ইন্ডিপেনডেন্ট ড্রাইভার্স অ্যাসোসিয়েশন'-এর সহসভাপতি লুই পিউ এই নতুন নিয়মকে সমর্থন করেছেন। তিনি বলেন, এটি মহাসড়কগুলোকে আরও নিরাপদ করবে। তার মতে, কড়াকড়ি না থাকায় এতদিন স্বল্প প্রশিক্ষিত অভিবাসীরা সহজেই এই শিল্পে ঢুকে পড়ার সুযোগ পাচ্ছিল। পিউ বলেন, 'আমাদের সদস্যরা এমন যে কোনো কিছুকে সমর্থন করে যা সড়ককে নিরাপদ করে।'
পরিবহন বিশেষজ্ঞরা এই নিয়মের ফলে ট্রাক শিল্পে খুব বড় ধরনের কোনো প্রভাবের আশঙ্কা না করলেও ধারণা করছেন, কর্মীবাহিনী ছোট হয়ে আসায় কোম্পানিগুলো পণ্য পরিবহনের হার বাড়িয়ে দিতে পারে। এর ফলে শেষ পর্যন্ত মার্কিন ভোক্তাদেরই বাড়তি দাম মেটাতে হবে। রেগুলেটরি বিষয়ে বিশেষজ্ঞ পরিবহন আইনজীবী গ্রেগরি রিড বলেন, 'আমি শ্রমিক ঘাটতি বা পণ্য সরবরাহে বড় কোনো বিঘ্ন ঘটার কথা শুনিনি, তবে এই পরিবর্তনের প্রভাব ব্যবসার খরচের ওপর পড়বে।'
এদিকে রাশিয়ার রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থী সেমেনোভস্কি তার ট্রাক ব্যবসা এবং স্ত্রী ও ১৪ বছর বয়সী মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম হতাশায় দিন কাটাচ্ছেন। পেশায় আইনজীবী সেমেনোভস্কি জানান, রাশিয়ায় সরকারবিরোধী অবস্থানের কারণে সাজানো ফৌজদারি মামলার হুমকির মুখে ২০১৯ সালে তিনি রাশিয়ায় সবকিছু ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে পালিয়ে আসেন। মহামারির সময় চালক সংকটের কথা শুনে তিনি দূরপাল্লার ট্রাক ব্যবসা শুরু করেন। ট্রাক ও ট্রেইলার কেনার জন্য তিনি প্রায় ২ লাখ ডলার ঋণ নিয়েছিলেন, যা এখনো শোধ করছেন। গত চার বছর ধরে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ৪৮টি অঙ্গরাজ্যে ভারী যন্ত্রপাতি, নির্মাণ সামগ্রী, খাদ্যদ্রব্য এবং অ্যামাজনের পণ্য পরিবহন করে আসছেন।
অশ্রুসিক্ত চোখে সেমেনোভস্কি বলেন, 'এই নিয়মটি আমার পরিবারের জন্য বিপর্যয়কর। আমি গাড়ি চালানোর অধিকারের ওপর নির্ভর করেই এই ছোট ব্যবসাটি গড়ে তুলেছি। আমি ভাবিনি যে শুধুমাত্র একজন অভিবাসী হওয়ার কারণে কেউ আমার কাছ থেকে এটি কেড়ে নিতে পারে।'
