মিনাব স্কুল ট্র্যাজেডি: ভিডিওতে ধরা পড়ল মার্কিন ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দৃশ্য
ইরানের একটি বালিকা বিদ্যালয়ে হামলায় প্রায় ১৭৫ জন শিক্ষার্থী ও কর্মী নিহতের ঘটনায় এক নতুন ভিডিও প্রকাশ করেছে দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম। ৭ সেকেন্ডের এই ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, একটি মার্কিন ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ওই স্কুল সংলগ্ন একটি স্থাপনায় আঘাত হানছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র এ হামলার দায় শুরু থেকেই অস্বীকার করে আসছে।
ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা 'মেহর নিউজ' ভিডিওটি প্রকাশ করেছে। এতে দেখা যায়, একটি প্রাচীরবেষ্টিত চত্বরের ভেতরে থাকা একটি ভবনে ক্ষেপণাস্ত্রটি সরাসরি আঘাত হানছে। ধারণা করা হচ্ছে, ভবনটি একটি স্বাস্থ্য ক্লিনিক, যা এক সময় ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) নৌঘাঁটির সীমানার ভেতরে ছিল।
ভিডিওতে দেখা যায়, বালিকা বিদ্যালয়টিতে আঘাত হানার কিছুক্ষণ পরই এই হামলাটি ঘটে। কারণ, নতুন ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে চত্বরের যে অংশে স্কুলটি অবস্থিত ছিল, সেখান থেকে আগেই ধোঁয়া উড়ছে। ইরানি রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী, এই হামলায় নিহতের সংখ্যা ১৬৫ থেকে ১৮০ জনের মধ্যে, যাদের বেশিরভাগই শিক্ষার্থী।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্ষেপণাস্ত্রটির গঠন মার্কিন 'বিজিএম' বা 'ইউজিএম-১০৯ টমাহক ল্যান্ড অ্যাটাক মিসাইল'-এর সঙ্গে হুবহু মিলে যায়।
উল্লেখ্য, মার্কিন নৌবাহিনী তাদের জাহাজ ও সাবমেরিন থেকে টমাহক উৎক্ষেপণ করে থাকে। অস্ত্র বিশেষজ্ঞদের মতে, ইসরায়েলের কাছে এই ধরণের ক্ষেপণাস্ত্র নেই।
এর আগে জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, 'সমুদ্রে প্রথম আক্রমণকারী ছিল মার্কিন নৌবাহিনীর টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র।'
জেমস মার্টিন সেন্টার ফর ননপ্রোলিফারেশন স্টাডিজের গবেষক স্যাম লেয়ার সিএনএনকে জানান, ভিডিওতে দেখা যাওয়া সমরাস্ত্রটি মার্কিন টমাহক ক্ষেপণাস্ত্রের বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। তিনি বলেন: 'প্রথমত, এটি টমাহকের দৃশ্যমান বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে মিলে যায়। এর ডানার গঠন এবং পেছনের অংশটি টমাহকের মতোই। দ্বিতীয়ত, ভিডিওটি আঘাত হানার স্থান থেকে মাত্র ২৫০ মিটার দূর থেকে ধারণ করা হয়েছে। এর অর্থ হলো, অস্ত্রটি অবশ্যই বিশাল আকৃতির হতে হবে। এটি যুক্তরাষ্ট্রের ভাণ্ডারে থাকা জিবিইউ-৬৯বি-এর মতো সমজাতীয় অন্য ছোট সমরাস্ত্রের সম্ভাবনাকে নাকচ করে দেয়।'
সিএনএন-এর পরামর্শ নেওয়া অন্যান্য অস্ত্র বিশেষজ্ঞরাও এই মতের সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন। তারা জানান, সাধারণত আকাশসীমায় পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক পর্যায়ে এই টমাহক ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ব্যবহার করা হয়। সিএনএন-এর বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ক্ষেপণাস্ত্রটি ঘাঁটির ভেতর আইআরজিসি পরিচালিত একটি মেডিকেল ক্লিনিক বা তার পাশের কোনো ভবনে আঘাত হেনেছে।
গত সপ্তাহে সিএনএন এবং অন্যান্য সংবাদমাধ্যমের তদন্তে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল যে, এই হামলার জন্য সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রই দায়ী। স্যাটেলাইট চিত্র, ভিডিওর ভৌগোলিক অবস্থান এবং বিশেষজ্ঞদের মতামত বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, মার্কিন বাহিনী যখন পাশের নৌঘাঁটিতে হামলা চালাচ্ছিল, ঠিক একই সময়ে স্কুলটিও আক্রান্ত হয়।
সংবাদমাধ্যম এনপিআরও ভিডিওটির ভৌগোলিক অবস্থান যাচাই করে নিশ্চিত হয়েছে যে, এটি চত্বরের উল্টো দিকে নির্মাণাধীন একটি হাউজিং প্রজেক্ট থেকে ধারণ করা হয়েছে। ক্লিনিকের প্রবেশপথের সাইনবোর্ডসহ অসংখ্য বিবরণ ওই এলাকার পরিচিত তথ্যের সঙ্গে মিলে গেছে। অনলাইন গবেষণা সংস্থা 'বেলিংক্যাট' সর্বপ্রথম ভিডিওটির অবস্থান শনাক্ত করে।
ভিডিওটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি হওয়ার কোনো লক্ষণ পাওয়া যায়নি। পেন্টাগন এ বিষয়ে এনপিআর-এর মন্তব্যের অনুরোধে তাৎক্ষণিক কোনো সাড়া দেয়নি। স্যাটেলাইট ইমেজের মাধ্যমেও দেখা গেছে যে ওই চত্বরে ক্লিনিকসহ মোট সাতটি ভবন নিখুঁত নিশানায় আঘাত করা হয়েছিল, যার ফলে পাশের স্কুলে প্রাণহানি ঘটে।
যদিও গত শনিবার এয়ার ফোর্স ওয়ানে বসে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই স্কুল বোমা হামলার জন্য ইরানকে অভিযুক্ত করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, 'আমি যা দেখেছি, তার ভিত্তিতে আমার মনে হয় এটি ইরানই করেছে। কারণ আপনারা জানেন, তাদের অস্ত্রশস্ত্র খুবই লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। তাদের কোনো নিখুঁত লক্ষ্যভেদ করার ক্ষমতা নেই। এটি ইরানই করেছে।'
স্যাম লেয়ার আরও জানান, ভিডিওতে একটি ক্রুজ মিসাইলকে ঘাঁটির মাঝখানের একটি ভবনে আঘাত হানতে দেখা যাচ্ছে। যদিও ভিডিওতে স্কুলটিতে আঘাত হানার মুহূর্তটি সরাসরি দেখা যায়নি, তবে স্কুলটি সম্ভবত একই অভিযানের অংশ ছিল এবং একই সাথে আরও কয়েকটি ক্রুজ মিসাইল সেখানে ছোড়া হয়েছিল।
এদিকে, মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ রবিবার জানিয়েছেন যে যুক্তরাষ্ট্র এই হামলার বিষয়ে এখনও তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে।
