ইরানে ‘ক্ষেপণাস্ত্র বর্ষণ’; ‘মৃত্যু ও ধ্বংসযজ্ঞ’ চালিয়ে যাবে যুক্তরাষ্ট্র: হেগসেথ
ইরানে পরিচালিত সামরিক অভিযানে সফলতার দাবি করেছে মার্কিন কর্মকর্তারা। তারা জোর দিয়ে বলছেন, তেহরান সরকারকে 'বিন্দুমাত্র দয়া না দেখিয়ে' গুঁড়িয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়ায় রয়েছে ওয়াশিংটন।
বুধবার মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সাংবাদিকদের বলেন, মার্কিন সামরিক বাহিনী এখন যুদ্ধের নিয়ম (রুলস অব এনগেজমেন্ট) শিথিল করেছে। ইরানে শত শত বেসামরিক মানুষের মৃত্যুসহ হতাহতের সংখ্যা বাড়লেও তারা কোনো ধরনের সংযম ছাড়াই অভিযান পরিচালনা করছে।
হেগসেথ বলেন, 'ইরানি নেতারা যখনই আকাশের দিকে তাকাচ্ছেন, তারা শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান শক্তিই দেখতে পাচ্ছেন। আমরা এই অভিযান শেষ করার সিদ্ধান্ত না নেওয়া পর্যন্ত প্রতিদিনের প্রতি মিনিটে এটি চলতে থাকবে। এ ক্ষেত্রে ইরানের কিছুই করার থাকবে না।'
তিনি আরও বলেন, ইরানের আকাশে মার্কিন যুদ্ধবিমানগুলো 'আকাশ নিয়ন্ত্রণ করছে এবং লক্ষ্যবস্তু বেছে নিচ্ছে'। এর মাধ্যমে তারা সারাদিন আকাশ থেকে 'মৃত্যু ও ধ্বংসযজ্ঞ' নামিয়ে আনছে।
লড়াইয়ের ধরন নিয়ে হেগসেথ মন্তব্য করেন, 'এটি কখনোই কোনো সমানে-সমান লড়াই হওয়ার কথা ছিল না, এবং এটি তা নয়। তারা যখন বিপর্যস্ত, আমরা ঠিক তখনই তাদের ওপর আঘাত করছি—এটাই হওয়া উচিত।'
হেগসেথের এই বক্তব্যের কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ইরান। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, হেগসেথের এই মন্তব্য মূলত যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের সরাসরি স্বীকারোক্তি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ বাঘাই লিখেছেন, 'শুধুমাত্র নাৎসি মানসিকতা থাকলেই নিজের বসের ইচ্ছাপূরণের জন্য ঠান্ডা মাথায় অন্য একটি জাতির ওপর মৃত্যু ও ধ্বংসযজ্ঞ চালানো সম্ভব।'
ইরানি কর্মকর্তারা অভিযোগ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল দেশটির স্কুল ও হাসপাতালসহ বিভিন্ন বেসামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্য করে অসংখ্য হামলা চালিয়েছে।
গত বুধবার ইসমাইল বাঘাই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চালানো এসব হামলার একটি বিস্তারিত তালিকা তুলে ধরেন। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আবাসিক ভবন, বাজার এবং চিকিৎসা কেন্দ্রেও হামলা চালানো হয়েছে।
'বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে না'
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বাহিনীর অভিযান শুরুর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই দক্ষিণ ইরানের মিনাব শহরের একটি বালিকা বিদ্যালয়ে ভয়াবহ হামলা চালানো হয়। এতে ১৬৫ জন নিহত হন।
বুধবার মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট জানান, পেন্টাগন ঘটনাটি 'তদন্ত' করছে। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, 'আমি আবারও নিশ্চিত করছি, আমাদের যুদ্ধ মন্ত্রণালয় এবং সশস্ত্র বাহিনী বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্যবস্তু বানায় না।'
তবে এর আগে পেন্টাগনের প্রকাশ করা একটি 'ইলাস্ট্রেটেড ম্যাপ'-এ দেখা গেছে, অভিযানের প্রথম ১০০ ঘণ্টার মধ্যে মিনাব বা এর আশপাশে দুটি হামলা হয়েছে।
এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং বেশ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তাকে হত্যা করেছে। তারা ইরানের জাহাজ ও সামরিক স্থাপনাগুলোতেও নিয়মিত হামলা চালাচ্ছে।
সংঘাতটি দ্রুত একটি আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিয়েছে এবং তা থামার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। অন্যদিকে ইরানের বিরুদ্ধেও উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি স্থাপনা, হোটেল ও বিমানবন্দরে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার অভিযোগ উঠেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল হাজার হাজার হামলা চালালেও ইরানের শাসনব্যবস্থা এখনো অটুট রয়েছে। ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে অভ্যন্তরীণভাবে কোনো বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ বা বিদ্রোহ এখনো মাথাচাড়া দিয়ে ওঠেনি।
মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ধ্বংসযজ্ঞ, হাহাকার এবং ব্যাপক বাস্তুচ্যুতির ঘটনা ঘটলেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত বুধবার এই যুদ্ধের সাফল্যের প্রশংসা করেছেন।
তিনি বলেন, 'যুদ্ধক্ষেত্রে আমরা খুব ভালো করছি—সংক্ষেপে বলতে গেলে এটুকুই বলব। কেউ আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল, ১০-এর স্কেলে এই অভিযানকে আপনি কত নম্বর দেবেন? আমি বলেছি, অন্তত ১৫ দেব।'
