ট্রাম্পের প্রত্যাশার চেয়ে দেরিতে আসতে পারে ইরানের অর্থনৈতিক ধস
ইরানের অর্থনীতি ধসের মুখে পড়লেও তা হয়তো মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রত্যাশিত সময়ের মধ্যে ঘটবে না।
কয়েক সপ্তাহের সংঘাতে ইরানের আগে থেকেই সংকটাপন্ন অর্থনীতি আরও দুর্বল হয়েছে। যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে বড় ধরনের বিপর্যয়ের ঝুঁকি তৈরি হলেও জ্বালানি রপ্তানি বন্ধ করে দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ সত্ত্বেও আপাতত উপসাগরীয় অচলাবস্থা সামাল দেওয়ার সক্ষমতা ইরানের আছে বলে মনে হচ্ছে।
৮ এপ্রিলের যুদ্ধবিরতির পর বড় ধরনের লড়াই থেমে গেলেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরান এখন অচলাবস্থায় রয়েছে। স্থায়ী যুদ্ধবিরতির আলোচনা স্থবির হয়ে আছে। একই সঙ্গে তেহরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ রেখেছে এবং ওয়াশিংটন ইরানের উপসাগরীয় বন্দরগুলো অবরুদ্ধ করে রেখেছে।
অবকাঠামো ও শিল্পকারখানায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি এবং তেল রপ্তানিতে চাপ থাকলেও ইরানের অভ্যন্তরীণ সরবরাহ পর্যাপ্ত রয়েছে। প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যও অব্যাহত আছে। রাষ্ট্রীয় রাজস্ব কমে গেলেও তাৎক্ষণিক বড় ধরনের চাপের লক্ষণ সীমিত।
যদি ট্রাম্প মনে করে থাকেন, অর্থনৈতিক চাপের খেলায় ইরান আগে নতি স্বীকার করবে, তাহলে তাকে হয়তো আরও অপেক্ষা করতে হবে। কারণ বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি বাড়ছে এবং যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচনও ঘনিয়ে আসছে।
লন্ডনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্য কর্মসূচির প্রধান সানাম ভাকিল বলেন, ইরানের নেতারা সম্ভবত পশ্চিমা নীতিনির্ধারক বা অর্থনীতিবিদদের ধারণার চেয়ে দীর্ঘ সময় টিকে থাকার হিসাব কষেছেন।
তার মতে, দেশটির শাসকগোষ্ঠী কঠোর নিয়ন্ত্রণ ব্যবহার করে ওয়াশিংটনের কাছ থেকে টেকসই সমঝোতা না পাওয়া পর্যন্ত অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম।
ভাকিল বলেন, তেহরানের কর্তৃপক্ষ দমননীতি ব্যবহারে অ। তারা জনগণের সঞ্চয়ের ওপর নির্ভর করছে। পাশাপাশি তেহরান আবারও অভ্যন্তরীণ সম্পদনির্ভর ও স্থলসীমান্ত বাণিজ্যভিত্তিক 'প্রতিরোধ অর্থনীতি' কৌশলে ফিরছে।
যুদ্ধের কারণে অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ এবং তাৎক্ষণিক সংকটের আশঙ্কা নির্ধারণ করা কঠিন। নির্ভরযোগ্য সরকারি তথ্যের অভাব এবং জানুয়ারি থেকে আংশিক ইন্টারনেট বিচ্ছিন্নতা পরিস্থিতি মূল্যায়নকে জটিল করে তুলেছে।
তবে এ মাসে রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, পরিস্থিতি এতটাই খারাপ যে ইরানি কর্মকর্তারা নতুন করে বিক্ষোভের আশঙ্কা করছেন। নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার না হলে দেশটি বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে বলেও তারা মনে করছেন।
ভাকিলের ধারণা, চলতি বছর ইরানের জিডিপি দুই অঙ্কের হারে কমতে পারে। গত বছর ৭০ শতাংশ দরপতনের পর রিয়ালের মান সম্প্রতি আরও ১৫ শতাংশ কমেছে।
তবে তাৎক্ষণিক আর্থিক সংকটের অন্যান্য লক্ষণ খুব কম। কর্তৃপক্ষ ব্যাংক থেকে অর্থ উত্তোলনে বিধিনিষেধ দেয়নি, জ্বালানি বা খাদ্যপণ্যে রেশনিং চালু করেনি এবং সরকারি বেতন পরিশোধেও বিলম্ব হয়নি। সুপারমার্কেটের তাকও পূর্ণ রয়েছে এবং অফিস ও ব্যাংকও খোলা আছে।
১৩ থেকে ২৫ এপ্রিলের জাহাজ চলাচলসংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, ওই সময়ে ট্যাংকারে এক মিলিয়নের বেশি ব্যারেল দৈনিক তেল বোঝাই করা হলেও ভারত মহাসাগরে পৌঁছেছে দিনে প্রায় তিন লাখ ব্যারেল।
সংরক্ষণ সক্ষমতা সীমিত হলেও জ্বালানি বিশ্লেষকদের ধারণা, ইরান আরও দুই মাস উৎপাদন চালিয়ে যেতে পারবে।
যুদ্ধের শুরুর দিকে নিষেধাজ্ঞা শিথিল হওয়ায় জ্বালানি বিক্রি থেকে বিপুল আয় করেছিল ইরান। সীমিত পরিমাণ তেল স্থলপথে পাঠানো হচ্ছে, তবে তা সমুদ্রপথের রপ্তানির বিকল্প নয়।
ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক জ্যেষ্ঠ সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, দেশটির কাছে বিপুল স্বর্ণ মজুত রয়েছে, প্রয়োজনে তা ব্যবহার করা যাবে। এছাড়া কয়েক দশক ধরে নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চলার অভিজ্ঞতায় তেহরান কিছু বেশি মূল্য দিয়ে হলেও আমদানি বজায় রাখতে জানে।
কেপলারের কৃষিপণ্য বিশ্লেষণ বিভাগের প্রধান ইশান বাহনু বলেন, উপসাগরীয় অঞ্চলের সবচেয়ে বড় খাদ্য আমদানিকারক দেশ ইরান। তবে একই সঙ্গে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার দিক থেকে এটি সবচেয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ।
তিনি বলেন, প্রত্যাশার চেয়ে ভালো ফসল ঘরে তোলার সময় ঘনিয়ে আসায় গম আমদানির প্রয়োজন কমছে। এতে খাদ্য সরবরাহে চাপ কমবে এবং বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ও কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে।
ইশান বাহনু বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ এখন পর্যন্ত উপসাগরীয় বন্দরগুলোতেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। আরব সাগরে অবস্থিত ইরানের চাবাহার বন্দর এর আওতায় পড়েনি।
তিনি বলেন, অবরোধের মূল লক্ষ্য ছিল তেলবাহী ট্যাংকার। জাহাজ চলাচলের তথ্যেও সেই ইঙ্গিত মিলেছে।
তুরস্ক, ইরাক ও পাকিস্তানের কর্মকর্তারা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, এখনও সীমান্ত বাণিজ্যে বড় ধরনের মন্দার কোনো ইঙ্গিত নেই। এছাড়া চলতি বছর রাশিয়াও কাস্পিয়ান সাগরপথে বাণিজ্য বাড়িয়েছে।
রাশিয়ার কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত দেশটি ওই অভ্যন্তরীণ জলপথে পাঁচ লাখ টন ভুট্টা, এক লাখ ৮০ হাজার টন বার্লি এবং চার হাজার টন গম পাঠিয়েছে। এতে অবরুদ্ধ উপসাগরীয় বন্দরগুলো এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হয়েছে।
তীব্র অর্থনৈতিক চাপ
জানুয়ারিতে ট্রাম্পের সামরিক হুমকি বাড়তে থাকলে ইরান ছয় মাসের প্রয়োজনীয় পণ্য মজুদ করতে আমদানি বাড়ায় বলে এ মাসে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন দেশটির পার্লামেন্টের কৃষি কমিশনের প্রধান মোহাম্মদ জাভাদ আসগারি।
সংঘাত শুরুর পরপরই দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক ক্ষুদ্র ঋণের কিস্তি দেরিতে পরিশোধের জরিমানা মওকুফ করে একটি সহায়তা প্যাকেজ চালু করে। একই সঙ্গে আমানতকারীদের আশ্বস্ত করতে ব্যাংক থেকে অর্থ উত্তোলনের সীমাও বাড়ানো হয়।
তবু তেহরানের রাস্তায় অর্থনৈতিক কষ্ট তীব্র। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, সরবরাহব্যবস্থার বিঘ্ন এবং ইন্টারনেট বিচ্ছিন্নতায় ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে বেকারত্বও বাড়ছে।
চাল ও শস্য ব্যবসায়ী আব্বাস ইসমাইলজাদে বলেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধি, বিশেষ করে মানুষের খাবারের টেবিলের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি মানুষের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে।
তিনি জানান, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে তার বিক্রি প্রায় ৪০ শতাংশ কমেছে।
মেকানিক হোসেইন আমিরি বলেন, যুদ্ধের আগের তুলনায় এখন অনেক কম গ্রাহক গাড়ি নিয়ে তার ওয়ার্কশপে আসছেন।
তিনি বলেন, আমাদের ব্যবসা প্রায় স্থবির হয়ে গেছে। পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে বলেও সতর্ক করেন তিনি।
কর্তৃপক্ষের সামনে বড় উদ্বেগ হয়ে দাড়িয়েছে নতুন করে গণবিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা। জানুয়ারির আন্দোলন দমনে হাজারো বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছিল।
সানাম ভাকিল বলেন, আসন্ন অর্থনৈতিক বিপর্যয় ঠেকাতে ওয়াশিংটনের সঙ্গে যেকোনো সমঝোতায় নিষেধাজ্ঞা শিথিলের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে ইরানকে।
তিনি বলেন, পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন ব্যাংকে আটকে থাকা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে প্রবেশাধিকার, তেল বিক্রি বৃদ্ধি এবং স্বাভাবিক বাণিজ্যের সুযোগও প্রয়োজন ইরানের।
