এ রোগীর কোষ ‘চুরি’ করে বিপ্লব এসেছিল চিকিৎসাবিজ্ঞানে; বিচার পেলেন মৃত্যুর ৭৩ বছর পর
১৯৫১ সালের কথা। এক কৃষ্ণাঙ্গ নারীর শরীর থেকে তার অজান্তেই জরায়ুমুখের কোষ সংগ্রহ করেছিলেন চিকিৎসকেরা। অসীমসংখ্যকবার বিভাজিত হয়ে সেই কোষ চিকিৎসাবিজ্ঞানে যুগান্তকারী সব আবিষ্কারের পথ খুলে দেয়।
কিন্তু এর বিনিময়ে কোনো অর্থ বা স্বীকৃতি পায়নি সেই নারীর পরিবার। অবশেষে দীর্ঘ লড়াইয়ের পর সেই 'চুরি হওয়া' কোষের জন্য সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বায়োটেক কোম্পানি নোভারটিসের সঙ্গে একটি সমঝোতায় পৌঁছেছে তার পরিবার।
তিনি ছিলেন হেনরিয়েটা ল্যাকস। যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ডের বাল্টিমোরের বাসিন্দা, ৩১ বছর বয়সী এই নারী ছিলেন কয়েক সন্তানের জননী। পেটে তীব্র ব্যথা ও অস্বাভাবিক রক্তপাত নিয়ে ১৯৫১ সালে তিনি জনস হপকিন্স হাসপাতালে যান। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞরা তাঁর জরায়ুমুখে বড় একটি টিউমার বা ক্যানসার শনাক্ত করেন।
চিকিৎসকেরা ক্যানসারের চিকিৎসা শুরুর আগে হেনরিয়েটা বা তার পরিবারের কোনো অনুমতি ছাড়াই টিউমারের একটি নমুনা গবেষণাগারে পাঠিয়ে দেন। সে সময় গবেষণাগারে রাখা প্রায় সব কোষ দ্রুত মারা গেলেও হেনরিয়েটার শরীর থেকে নেওয়া কোষগুলোর ক্ষেত্রে ঘটে এক বিস্ময়কর ঘটনা।
এগুলো মারা তো যায়ইনি, উল্টো ক্রমাগত নিজেদের প্রতিলিপি তৈরি করতে থাকে। বিজ্ঞানের ভাষায় এই কোষগুলো হয়ে ওঠে 'ইমমোর্টাল' বা অমর । ফলে সারা বিশ্বের বিজ্ঞানীরা একই কোষ ব্যবহার করে বারবার পরীক্ষা চালানোর সুযোগ পান। রোগীর নামের প্রথম অক্ষরের সঙ্গে মিলিয়ে এই কোষের নাম দেওয়া হয় 'হেলা' (HeLa)।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে, এই 'হেলা' কোষ ব্যবহার করেই পোলিও টিকা আবিষ্কার সম্ভব হয়েছে। ক্যানসার, এইচআইভি ও বন্ধ্যত্ব গবেষণায় এসেছে অভাবনীয় সাফল্য। অথচ যে কোষগুলো চিকিৎসাবিজ্ঞানকে এমন এক অলৌকিক উপহার দিল, সেই ক্যানসারেই মাত্র ৩১ বছর বয়সে পৃথিবী ছাড়েন হেনরিয়েটা। মৃত্যুর পর পরিচয়হীন এক কবরে তাকে সমাহিত করা হয়।
যুগ যুগ ধরে বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানি এই কোষ ব্যবহার করে কোটি কোটি ডলার মুনাফা করলেও হেনরিয়েটার পরিবার কখনোই কোনো ক্ষতিপূরণ পায়নি। মৃত্যুর প্রায় ৭০ বছর পর সুবিচারের আশায় নোভারটিসসহ বেশ কয়েকটি কোম্পানির বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ড অঙ্গরাজ্যে মামলা করে ল্যাকস পরিবার। অন্যান্য কয়েকটি ওষুধ কোম্পানির বিরুদ্ধেও তাদের আইনি লড়াই চলছে।
তবে প্রায় তিন বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস-ভিত্তিক কোম্পানি থার্মো ফিশার সায়েন্টিফিকের সঙ্গে এ রকম একটি আইনি লড়াইয়ে সমঝোতা করেছিল পরিবারটি। এবার নোভারটিসের সঙ্গেও একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে সক্ষম হলো তারা।
ল্যাকস পরিবার ও নোভারটিসের এক যৌথ বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, আদালতের বাইরে বিষয়টি মীমাংসা করতে পেরে উভয় পক্ষই আনন্দিত। তবে চুক্তিতে আর্থিক ক্ষতিপূরণের অঙ্ক বা শর্তগুলো গোপন রাখা হয়েছে।
