প্রতি বছর দেড় লাখের বেশি নতুন ক্যান্সার রোগীকে চিকিৎসা দিতে হিমশিম খাচ্ছে বাংলাদেশ
বাংলাদেশে প্রতি বছর নতুন করে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয় দেড় লাখের বেশি মানুষ। তবে চিকিৎসা কেন্দ্র, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের তীব্র সংকটের কারণে হাজার হাজার রোগী সময়মতো চিকিৎসা পাচ্ছে না।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের ক্যান্সার চিকিৎসা ব্যবস্থা বর্তমানে প্রচণ্ড চাপের মুখে রয়েছে। অধিকাংশ রোগীর রোগ শনাক্ত হচ্ছে একেবারে শেষ পর্যায়ে। এর পাশাপাশি দীর্ঘ অপেক্ষার পালা, আর্থিক অনটন ও প্রয়োজনীয় সেবার অপ্রতুলতা রোগীদের ভোগান্তি বাড়িয়ে দিচ্ছে বহুগুণ।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল অনকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান এবং স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশনের সদস্য অধ্যাপক ড. সৈয়দ মো. আকরাম হোসেন টিবিএসকে বলেন, বাংলাদেশে অধিকাংশ ক্যান্সার রোগীর রোগ শনাক্ত হয় অনেক দেরিতে।
'প্রাথমিক স্ক্রিনিংয়ের অভাব, জনসচেতনতার ঘাটতি এবং বড় শহরের বাইরে পর্যাপ্ত সেবা না থাকায় রোগীরা রোগের জটিল পর্যায়ে গিয়ে হাসপাতালে পৌঁছান। ফলে বেঁচে থাকার সম্ভাবনা কমে যায়,' বলেন তিনি।
আকরাম হোসেন বলেন, ক্যান্সার চিকিৎসার ব্যয় পরিবারগুলোর জন্য ভয়াবহ আর্থিক চাপ তৈরি করে। অনেককে ঋণ নিতে, জমি-সম্পত্তি বিক্রি করতে বা অর্থের অভাবে চিকিৎসা বন্ধ করে দিতে হয়। তাই ক্যান্সারকে কেবল হাসপাতালের বিষয় না ভেবে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে দেখাই জরুরি।
'রাজনৈতিক দলগুলো ক্যান্সার চিকিৎসা নিয়ে যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, ক্ষমতায় গিয়ে সেগুলোর বাস্তবায়ন আমরা দেখতে চাই,' বলেন তিনি।
আকরাম হোসেন আরো বলেন, স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশনের ২৮তম সুপারিশ সরাসরি ক্যান্সার চিকিৎসা ও নিয়ন্ত্রণকে ঘিরে। 'এতে প্রাথমিক পর্যায়ে ক্যান্সার শনাক্তে দেশব্যাপী কেন্দ্র স্থাপন, ক্যান্সার-সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও রেডিওথেরাপি মেশিনের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং অন্তত একটি ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিকে দেশে এপিআই (অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রিডিয়েন্ট) উৎপাদনের সুযোগ তৈরির প্রস্তাব রয়েছে।
'পাশাপাশি আটটি সরকারি মেডিকেল কলেজে ১৬টি রেডিওথেরাপি মেশিন স্থাপনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। ওষুধের দাম কমাতে ভ্যাট ও আমদানি শুল্ক কমানো এবং বেসরকারি খাতে ক্যান্সার হাসপাতাল নির্মাণে স্বল্প সুদে ঋণ, কর ও ভ্যাট ছাড় দেয়ার সুপারিশ করা হয়েছে, যাতে উদ্যোক্তারা এগিয়ে আসে।'
আগামী নির্বাচনে জয়ী হয়ে যে রাজনৈতিক দল সরকার গঠন করবে, তারা যেন ক্যান্সার চিকিৎসা নিয়ে সংস্কার কমিশনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করে, এ দাবি জানান আকরাম হোসেন।
ক্যান্সার চিকিৎসার বর্তমান চিত্র
ক্যান্সার চিকিৎসার জন্য দেশের একমাত্র পূর্ণাঙ্গ সরকারি হাসপাতাল জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে মোট আটটি রেডিওথেরাপি মেশিন থাকলেও বর্তমানে সচল আছে মাত্র দুটি। ফলে রোগীদের রেডিওথেরাপি সেবা পেতে আট থেকে দশ মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
শুধু রেডিওথেরাপি মেশিন নয় হাসপাতালটির এমআরআই ও সিটি স্ক্যান মেশিনসহ অন্যান্য মেশিনও অচল অবস্থায় পড়ে আছে বলে পরিকল্পনা কমিশনের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) পরিচালিতি একটি মূল্যায়ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে আরও উঠে এসেছে, ক্যান্সার ইনস্টিটিউটে চিকিৎসা নিতে আসা ৪১.৩৫ শতাংশ রোগী নানা ধরনের হয়রানির শিকার হন। এছাড়া অ্যাম্বুলেন্স সেবা নিতে গিয়ে ৫৪ শতাংশ রোগী কর্মীদের দুর্ব্যবহারের অভিযোগ করেছেন। তীব্র ওষুধ সংকট, দীর্ঘকাল ধরে অকেজো পড়ে থাকা যন্ত্রপাতি ও জনবল ঘাটতি সেবার মানকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে।
একই অবস্থা বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অনকোলজি বিভাগেও। সেখানে একটি রেডিওথেরাপি মেশিন রয়েছে। এই মেশিনে প্রতিদিন ৭০ জনকে থেরাপি দেওয়া যায়, কিন্তু রোগী থাকেন ২০০ থেকে ৩০০ জন। ফলে সিরিয়াল পেতে রোগীদের চার মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
কেমোথেরাপি ও স্যালাইন দেওয়ার প্রক্রিয়া সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য ২০-৩০টি ইনফিউশন পাম্পের প্রয়োজন হলেও এই বিভাগে বর্তমানে মাত্র আটটি পাম্প রয়েছে।
ক্যান্সার ছড়ানোর মাত্রা দেখে সঠিকভাবে চিকিৎসা দিতে পিইটি-সিটি স্ক্যান করতে রোগীদের নিউক্লিয়ার মেডিসিন সেন্টারগুলোতে ৪ থেকে ৬ মাস অপেক্ষা করতে হয়। তত দিনে ক্যান্সার সারা শরীর ছড়িয়ে পড়ে।
গ্লোবোক্যান ২০২০ প্রতিবেদনের অনুসারে, বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ১ লাখ ৫৬ হাজার মানুষ ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সুপারিশ অনুযায়ী প্রতি ১০ লাখ মানুষের জন্য অন্তত একটি রেডিওথেরাপি মেশিন থাকা প্রয়োজন। সেই হিসাবে সারাদেশে প্রায় ২০০টি মেশিনের প্রয়োজন থাকলেও সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল মিলিয়ে বর্তমানে মেশিন আছে মাত্র ৩৭টি। সেগুলোর অধিকাংশই অকেজো।
সম্পদের সঠিক ব্যবহার প্রয়োজন
ল্যাবএইড গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. এ এম শামীম বলেন, দেশে ক্যান্সার চিকিৎসার জন্য বিদ্যমান অবকাঠামোর মাত্র এক-চতুর্থাংশ বা তারও কম বর্তমানে ব্যবহৃত হচ্ছে।
'এসব সুবিধা পরিকল্পিত ও দক্ষভাবে কাজে লাগাতে পারলে দেশের মধ্যেই ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ ক্যান্সার রোগীর চিকিৎসা নিশ্চিত করা সম্ভব,' বলেন তিনি।
ডা. শামীম আরও বলেন, সরকারকে সরকারি ক্রয় ও ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম, অতিরিক্ত দামে সরঞ্জাম কেনা ও দুর্নীতির সুযোগ বন্ধ করতে হবে। একইসঙ্গে রাজনৈতিক বিবেচনায় পদায়ন বন্ধ করে যোগ্য ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের ক্যান্সার হাসপাতালের পরিচালক ও অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ দিতে হবে।
তিনি বলেন, 'পাশাপাশি বেসরকারি খাতকেও উৎসাহিত করতে হবে। একের পর এক লাইসেন্স ও প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি না করে সহায়ক পরিবেশ গড়ে তুললে বেসরকারি উদ্যোক্তারা আরও বেশি বিনিয়োগে আগ্রহী হবেন।'
ক্যান্সার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর কর্মকৌশল প্রয়োজন
বাংলাদেশ স্তন ক্যান্সার সচেতনতা ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান সমন্বয়কারী অধ্যাপক মো. হাবিবুল্লাহ তালুকদার রাসকিন বলেন, বাংলাদেশে এখনো ক্যান্সার নিয়ন্ত্রণে কোনো কার্যকর জাতীয় কৌশলপত্র, কর্মপরিকল্পনা বা জাতীয় কর্মসূচি নেই। একসময় পাঁচ বছর মেয়াদি একটি কৌশলপত্র প্রণয়ন করা হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি এবং ২০০৯ সালের পর আর হালনাগাদও করা হয়নি বলে জানান তিনি।
ক্যান্সার নিয়ন্ত্রণের ভিত্তি হিসেবে জাতীয় ক্যান্সার নিবন্ধন কর্মসূচির ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, 'দেশে কোন ধরনের ক্যান্সার বেশি হচ্ছে, কোন এলাকায়, নারী-পুরুষ ও কোন বয়সে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে—এসব তথ্য ছাড়া কোনো কার্যকর পরিকল্পনা সম্ভব নয়। জাতীয় ক্যান্সার নিবন্ধনের তথ্যের ভিত্তিতেই জাতীয় কৌশলপত্র, কর্মপরিকল্পনা ও জাতীয় কর্মসূচি প্রণয়ন করা প্রয়োজন।'
রাসকিন বলেন, বাংলাদেশ একটি স্বল্প আয়ের দেশ, যেখানে বিপুলসংখ্যক মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে এবং ক্যান্সারের মতো ব্যয়বহুল রোগের চিকিৎসা করতে গিয়ে আরও অনেক মানুষ দরিদ্র হয়ে পড়ে।
'তাই দরিদ্র ক্যান্সার রোগীদের চিকিৎসার দায় রাষ্ট্রকেই নিতে হবে। শুধু চিকিৎসা নয়, ক্যান্সার প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার দায়িত্বও রাষ্ট্রকে গ্রহণ করতে হবে। এছাড়া বেসরকারি হাসপাতাল ও উদ্যোক্তাদের জন্য জমি, যন্ত্রপাতি আমদানিতে কর ও শুল্ক ছাড় দিতে হবে। এবং অবশ্যই স্বাস্থ্যবিমা চালু করতে হবে,' বলেন তিনি।
