হরমুজ প্রণালি: যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে তেল পরিবহনের যে রুট
সমুদ্রপথে তেল পরিবহনের জন্য কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক পথ হরমুজ প্রণালি। ইরান দীর্ঘদিন ধরে এই পথটিকে ভূ-রাজনৈতিক দর কষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। সংকটের সময় তেহরান বারবার এই পথ বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেয়।
জানুয়ারির শেষ দিকে ইরানের বিপ্লবী গার্ডের এক জ্যেষ্ঠ নৌ-কমান্ডার আবারও এই পথ বন্ধের হুমকি দিয়েছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে চুক্তিতে না পৌঁছালে সামরিক পদক্ষেপের হুমকি দিচ্ছিলেন, ঠিক তখনই এই পাল্টা হুমকি আসে।
যদিও ইরান প্রায়ই অবরোধের কথা বলে, তবে তারা কখনোই পুরোপুরি এই পথ বন্ধ করেনি। অবশ্য সাম্প্রতিক সামরিক মহড়ার সময় 'নিরাপত্তার' কারণ দেখিয়ে তারা সাময়িকভাবে প্রণালির কিছু অংশ বন্ধ রেখেছিল।
বিশ্ববাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ সম্পর্কে কিছু তথ্য নিচে তুলে ধরা হলো:
উপসাগরের প্রবেশদ্বার
হরমুজ প্রণালি পারস্য উপসাগরকে ভারত মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। ইরান এবং ওমানের মুসান্দাম ছিটমহলের মাঝখানে এর অবস্থান।
এর প্রস্থ মাত্র ৫০ কিলোমিটার (৩০ মাইল) এবং গভীরতাও খুব বেশি নয়—সর্বোচ্চ ৬০ মিটার (২০০ ফুট)। সরু ও অগভীর হওয়ায় সামরিকভাবে সহজেই এই পথ বন্ধ করে দেওয়া সম্ভব।
প্রণালির মাঝে বেশ কিছু জনশূন্য বা মরুদ্বীপ রয়েছে, যা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ইরানের হরমুজ, কিশম ও লারাক দ্বীপ।
সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইরানের মাঝখানে থাকা গ্রেটার টুনব, লেসার টুনব ও আবু মুসা দ্বীপগুলোও এখানে। ১৯৭১ সাল থেকে এগুলো ইরানের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও মালিকানা নিয়ে বিরোধ রয়েছে। উপসাগরের ওপর নজরদারির জন্য দ্বীপগুলো বেশ সুবিধাজনক।
তেল পরিবহনের হটস্পট
তেলসমৃদ্ধ উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে এশিয়া, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বাজারের সংযোগ ঘটিয়েছে এই প্রণালি।
মার্কিন এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (ইআইএ) মতে, হরমুজ প্রণালি 'বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অয়েল চোকপয়েন্ট বা তেলের সরু পথ'।
ইআইএ-এর তথ্যমতে, ২০২৪ সালে বিশ্বব্যাপী তেল ও তেলজাত পণ্য ব্যবহারের এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়েই গেছে, যার পরিমাণ দৈনিক গড়ে ২ কোটি ব্যারেল।
এছাড়া কাতার থেকে আসা বিশ্বের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) বাণিজ্যেরও এক-পঞ্চমাংশ এই পথ ব্যবহার করে।
সৌদি আরব ও আমিরাতের কিছু বিকল্প পথ বা পাইপলাইন থাকলেও তা দিয়ে দিনে মাত্র ২৬ লাখ ব্যারেল তেল পাঠানো সম্ভব, যা প্রয়োজনের তুলনায় নগণ্য।
ইআইএ সতর্ক করে বলেছে, 'এই প্রণালি দিয়ে বিপুল পরিমাণ তেল যায়। এটি বন্ধ হলে তেল বের করার বিকল্প পথ খুবই কম।'
এশিয়ার বাজারেই এখানকার ৮০ শতাংশের বেশি তেল ও গ্যাস যায়। বিশ্লেষক সংস্থা কেপলার-এর মতে, ইরানের তেল রপ্তানির ৯০ শতাংশেরও বেশি যায় চীনে, যারা তেহরানের অন্যতম সমর্থক।
সামরিক উপস্থিতি
ইরানের সামরিক বাহিনীর মতাদর্শিক শাখা রেভল্যুশনারি গার্ড উপসাগর ও হরমুজ প্রণালিতে নৌ-অভিযান নিয়ন্ত্রণ করে।
তেহরান বারবার ওই অঞ্চলে বিদেশি শক্তির উপস্থিতির সমালোচনা করেছে। বাহরাইনে যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম নৌবহর এবং কাতারে মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তম মার্কিন ঘাঁটি রয়েছে।
২০২৩ সালে পশ্চিমা নৌবাহিনী ওই অঞ্চলে চলাচলকারী জাহাজগুলোকে ইরানের জলসীমার কাছে না যাওয়ার জন্য সতর্ক করেছিল, যাতে সেগুলো আটক হওয়ার ঝুঁকি এড়াতে পারে।
২০১৮ সালে ট্রাম্প ইরানের পরমাণু চুক্তি থেকে সরে এসে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার পর থেকেই উত্তেজনা বাড়ছে।
১৯৮৪ সালে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় তেল পরিবহন বাধাগ্রস্ত হয়েছিল। তখন দুই পক্ষই একে অপরের জাহাজে হামলা চালায়, যা 'ট্যাঙ্কার যুদ্ধ' নামে পরিচিত। এতে ৫০০টিরও বেশি জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছিল।
১৯৮৮ সালের এপ্রিলে তেহরান প্রণালিতে মাইন পেতে রাখার পর ইউএসএস স্যামুয়েল বি রবার্টস নামে এক মার্কিন ফ্রিগেট মাইনের আঘাতে প্রায় ডুবে যাচ্ছিল।
একই বছরের জুলাইয়ে ওই প্রণালির ওপর দিয়ে উরে যাওয়া ইরান এয়ারের একটি যাত্রীবাহী বিমান মার্কিন ফ্রিগেট থেকে ছোড়া মিসাইলে ভূপাতিত হয়। এতে ২৯০ জন নিহত হন। ইউএসএস ভিনসেন্সের ক্রুরা দাবি করেছিল, তারা যাত্রীবাহী বিমানটিকে ভুল করে ইরানের যুদ্ধবিমান ভেবেছিল।
সামুদ্রিক সংঘাত
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ আটক ও হামলার ঘটনা প্রায়ই ঘটে।
২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র পরমাণু চুক্তি থেকে সরে যাওয়ার পর এসব ঘটনা বেড়ে যায়।
২০১৯ সালে উপসাগরীয় অঞ্চলে জাহাজে হামলা, ড্রোন ভূপাতিত করা এবং ট্যাঙ্কার আটকের ঘটনায় তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে উত্তেজনা তুঙ্গে ওঠে।
২০২১ সালের ২৯ জুলাই ওমান উপসাগরে এক ইসরায়েলি ধনকুবেরের কোম্পানির ট্যাঙ্কারে হামলায় দুজন নিহত হন। ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেন এজন্য ইরানকে দায়ী করলেও তেহরান তা অস্বীকার করে।
২০২৪ সালের এপ্রিলে বিপ্লবী গার্ড পর্তুগিজ পতাকাবাহী এমএসসি অ্যারিস জাহাজ আটক করে। অভিযোগ ছিল, এর মালিকের সঙ্গে ইসরায়েলের যোগসূত্র রয়েছে।
ফেব্রুয়ারির শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের পতাকাবাহী একটি ট্যাঙ্কারকে ইরানি গানবোট চ্যালেঞ্জ করেছিল, তবে পরে সেটি তার গন্তব্যে যেতে সক্ষম হয় বলে জানিয়েছে ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড।
