বন্ধের মুখে যুক্তরাজ্যের শতবর্ষী পুরনো ভারতীয় রেস্তোরাঁ, বাঁচাতে রাজা চার্লসের কাছে ২০ হাজার মানুষের আবেদন
যুক্তরাজ্যে টিকে থাকা সবচেয়ে পুরোনো ভারতীয় রেস্তোরাঁটি এখন বন্ধ হওয়ার মুখে। এটি বাঁচাতে এবার ব্রিটিশ রাজা তৃতীয় চার্লসের হস্তক্ষেপ চেয়ে বাকিংহাম প্যালেসে একটি আবেদন জমা দিয়েছেন অধিকারকর্মীরা।
১৯২৬ সালের মার্চে লন্ডনের রিজেন্ট স্ট্রিটের ভিক্টরি হাউসে প্রতিষ্ঠিত হয় 'বীরাস্বামী' নামের এই রেস্তোরাঁ। উদ্বোধনের পর থেকে একই জায়গায় রয়েছে এটি। এমনকি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মান বাহিনীর বোমাবর্ষণের কঠিন সময়েও এখানে খাবার পরিবেশন বন্ধ হয়নি।
কিন্তু সম্প্রতি রেস্তোরাঁটির ইজারা নবায়ন না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ 'দ্য ক্রাউন এস্টেট'।
এ প্রসঙ্গে রেস্তোরাঁর মালিক রঞ্জিত মথরানি বলেন, বীরাস্বামীকে 'বিলুপ্তির হাত থেকে' বাঁচাতে তিনি রাজার সাহায্য চেয়েছেন। ইজারা নবায়নে কর্তৃপক্ষের অনাগ্রহকে তিনি 'অদূরদর্শী' আখ্যা দিয়ে বলেন, 'মনে হচ্ছে, ১০০ বছরের ইতিহাসকে ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া হচ্ছে।'
ক্রাউন এস্টেটের সমালোচনা করে রঞ্জিত মথরানি বলেন, 'তারা অনেকটা ভদ্রতার চাদরে মোড়া ইটের দেয়ালের মতো। আমরা চাই রাজা যেন ক্রাউন এস্টেটকে আমাদের সঙ্গে কথা বলতে রাজি করান। তারা যেন যৌক্তিক আচরণ করে এবং আমাদের সঙ্গে আলোচনায় বসে।'
রঞ্জিতের স্ত্রী ও রেস্তোরাঁর আরেক স্বত্বাধিকারী নমিতা পাঞ্জাবি জানান, বীরাস্বামী থেকে এর আগে দুবার বাকিংহাম প্যালেসে প্রয়াত রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের আমন্ত্রণে খাবার সরবরাহ করা হয়েছে। প্রথমবার ২০০৯ সালে, যখন ভারতের রাষ্ট্রপতি যুক্তরাজ্য সফরে গিয়েছিলেন। আর দ্বিতীয়বার ২০১৭ সালে, ভারতের ৭০তম স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে।
নমিতা বলেন, 'এসবের পরও আমাদের রেস্তোরাঁটি বন্ধ করে দিতে বলা হচ্ছে, এটি সত্যিই বিস্ময়কর। হ্যামলিজ ও লিবার্টির মতো আমরাও রিজেন্ট স্ট্রিটের সবচেয়ে পুরোনো ভাড়াটেদের একটি।'
ক্রাউন এস্টেট মূলত একটি স্বাধীন প্রপার্টি কোম্পানি। এর আয়ের লভ্যাংশ সরাসরি যুক্তরাজ্যের সরকারি কোষাগারে জমা হয়। রেস্তোরাঁটি সরিয়ে দেওয়ার বিষয়ে তারা বলেছে, 'সিদ্ধান্তটি আমরা হালকাভাবে নিইনি।' অন্যদিকে বাকিংহাম প্যালেস এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, এ সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার পুরোপুরি ক্রাউন এস্টেটের।
এদিকে রেস্তোরাঁটি রক্ষার এই পিটিশনে এরই মধ্যে ২০ হাজারের বেশি মানুষ সই করেছেন। এর মধ্যে রেমন্ড ব্লাঙ্ক, মিশেল রউক্স ও রিচার্ড কোরিগ্যানের মতো বিখ্যাত শেফরাও রয়েছেন। পিটিশনে একটি 'ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠান' এবং 'ভারত-ব্রিটিশ সাংস্কৃতিক সম্পর্কের প্রতীক' রক্ষায় রাজার হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়েছে।
২৫ বছর আগে লন্ডনে আসার পর থেকেই বীরাস্বামীর নিয়মিত গ্রাহক সিনান আর্টার। তিনি বলেন, 'জনস্বার্থের কথা বিবেচনা করে ক্রাউন এস্টেটের উচিত এই মূল্যবান প্রতিষ্ঠানটিকে রক্ষা করা। এই জায়গাকে কোনোভাবেই অফিসে পরিণত করা ঠিক হবে না। যখনই আমি এখানে আসি, মনে হয় নিজের বাড়িতেই আছি।'
দীর্ঘ এই পথচলায় ২০১৬ সালে রেস্তোরাঁটি মর্যাদাপূর্ণ 'মিশেলিন স্টার' খেতাবও অর্জন করে।
ক্রাউন এস্টেটের সঙ্গে বীরাস্বামীর এই দ্বন্দ্বের শুরু মূলত ভবনটি সংস্কারের পরিকল্পনা থেকে। ভিক্টরি হাউস নামের এই ভবনটি যুক্তরাজ্যের 'গ্রেড-টু' তালিকাভুক্ত একটি ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা। ভবনমালিক এটি আধুনিকায়নের ঘোষণা দিয়েছেন। সংস্কারের যে নকশা করা হয়েছে, তাতে ভবনের বর্তমান প্রবেশপথটি বদলে ফেলা হবে। এতে রেস্তোরাঁটিতে প্রবেশের আর কোনো উপায় থাকবে না।
এ বিষয়ে ক্রাউন এস্টেটের একজন মুখপাত্র বলেন, রেস্তোরাঁটি ওয়েস্ট এন্ড এলাকায় নতুন কোনো জায়গায় সরিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের সহায়তা এবং আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেওয়ারও প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল।
তিনি বলেন, 'যুক্তরাজ্যের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সম্পদ গড়ে তোলা এবং সরকারি ব্যয়ের জন্য সরকারের কাছে লভ্যাংশ পৌঁছে দিতে ক্রাউন এস্টেটের আইনি দায়বদ্ধতা রয়েছে। তাই রেস্তোরাঁটি সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্তটি আমরা হালকাভাবে নিইনি।'
ক্রাউন এস্টেটের এই মুখপাত্র আরও বলেন, 'রেস্তোরাঁ কর্তৃপক্ষের দেওয়া প্রস্তাবসহ বেশ কিছু বিকল্প প্রস্তাব আমরা বিশেষজ্ঞদের সাহায্যে পর্যালোচনা করেছি। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, এমন কোনো বিকল্প পাওয়া যায়নি; যা ঐতিহ্যবাহী এই ভবনের রক্ষক হিসেবে আমাদের দায়িত্ব, আইনি বাধ্যবাধকতা এবং জনগণের অর্থের সঠিক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।'
