যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তেজনার মধ্যেই সামরিক ঘাঁটিতে ‘কংক্রিট শিল্ড’ তৈরি করছে ইরান
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তীব্র উত্তেজনা এবং আঞ্চলিক যুদ্ধের হুমকির মধ্যেই নিজেদের একটি সংবেদনশীল সামরিক ঘাঁটিতে নতুন 'কংক্রিট শিল্ড' বা সুরক্ষাবলয় তৈরি করেছে ইরান। স্যাটেলাইটে ধরা পড়া ছবিতে দেখা গেছে, সম্প্রতি তারা একটি নতুন কাঠামোর ওপর এই কংক্রিট ঢালাই দিয়ে সেটি মাটির নিচে চাপা দিয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, ২০২৪ সালে ইসরায়েলি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর জায়গাটিতে নতুন করে এই সুরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে।
স্যাটেলাইটের ছবিতে আরও দেখা গেছে, গত বছর ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধের সময় ওয়াশিংটন যে পারমাণবিক কেন্দ্রটিতে বোমা হামলা চালিয়েছিল, সেটির সুড়ঙ্গ প্রবেশপথগুলো মাটি দিয়ে ভরাট করে ফেলা হয়েছে। এ ছাড়া আরেকটি ঘাঁটির সুড়ঙ্গপথগুলো আরও মজবুত করা হয়েছে এবং হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিগুলো মেরামত করা হয়েছে।
অঞ্চলজুড়ে যখন বড় ধরনের সংঘাতের আশঙ্কা বাড়ছে, তখনই এই ছবিগুলো সামনে এল। পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক বৃহস্পতিবার তার দেশের নাগরিকদের 'অবিলম্বে' ইরান ত্যাগের নির্দেশ দিয়েছেন এবং 'কোনো অবস্থাতেই' দেশটিতে না যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
তেহরান থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত প্যারচিন কমপ্লেক্স ইরানের অন্যতম সংবেদনশীল সামরিক ঘাঁটি। পশ্চিমা গোয়েন্দাদের দাবি, ২০ বছরেরও বেশি সময় আগে তেহরান সেখানে পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণ সংক্রান্ত পরীক্ষা চালিয়েছিল। তবে ইরান বরাবরই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টার কথা অস্বীকার করে আসছে।
২০২৪ সালের অক্টোবরে ইসরায়েল প্যারচিনে হামলা চালায় বলে খবর পাওয়া যায়। হামলার আগের ও পরের স্যাটেলাইট ছবিতে একটি আয়তাকার ভবনের ব্যাপক ক্ষতি এবং পরবর্তীতে ৬ নভেম্বর থেকে সেখানে পুনর্নির্মাণ কাজ শুরুর দৃশ্য দেখা গেছে। ২০২৫ সালের অক্টোবরের ছবিতে নতুন কাঠামোর কঙ্কাল এবং এর পাশে দুটি ছোট কাঠামো দেখা যায়।
চলতি বছরের ১৬ ফেব্রুয়ারির ছবিতে দেখা যায়, বড় কাঠামোটি আর দেখা যাচ্ছে না; বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি একটি কংক্রিট কাঠামোর নিচে ঢেকে ফেলা হয়েছে। ইনস্টিটিউট ফর সায়েন্স অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটি (আইএসআইএস) একে 'তালেঘান ২' নামে চিহ্নিত করেছে এবং একে 'কংক্রিট সারকোফ্যাগাস' বা বিশেষ সুরক্ষাবলয় বলে অভিহিত করেছে।
সংস্থাটির প্রতিষ্ঠাতা ডেভিড অলব্রাইট এক্সে লিখেছেন, 'আলোচনা ঝুলিয়ে রাখার সুবিধা আছে: গত দুই-তিন সপ্তাহে ইরান নতুন তালেঘান ২ স্থাপনাটি মাটির নিচে চাপা দিতে ব্যস্ত ছিল... এটি শীঘ্রই একটি অচেনা বাংকারে পরিণত হতে পারে, যা বিমান হামলা থেকে উল্লেখযোগ্য সুরক্ষা দেবে।'
গত জুনে ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র ইসফাহান কমপ্লেক্সের তিনটি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ প্ল্যান্টে বোমা হামলা চালায়। আইএসআইএস জানায়, ফেব্রুয়ারির শুরুর দিকে ওই কমপ্লেক্সের সুড়ঙ্গপথগুলোর সব প্রবেশমুখ 'পুরোপুরি ভরাট' করে ফেলা হয়েছে। এ ছাড়া নাতাঞ্জ থেকে ২ কিলোমিটার দূরে পাহাড়ের নিচের আরেকটি সুড়ঙ্গ কমপ্লেক্সের প্রবেশপথগুলো ১০ ফেব্রুয়ারি থেকে 'শক্তিশালী ও প্রতিরক্ষামূলক' করার কাজ চলছে।
ওয়াশিংটন তেহরানের সঙ্গে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার চেষ্টা করছে, একই সঙ্গে আলোচনা ব্যর্থ হলে সামরিক পদক্ষেপের হুমকিও দিচ্ছে। মঙ্গলবার জেনেভায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদের বৈঠকে কিছু 'গাইডলাইন' বা নীতিমালার বিষয়ে সমঝোতা হলেও বড় কোনো অগ্রগতি হয়নি।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে পারমাণবিক ইস্যুর বাইরে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও আঞ্চলিক মিত্রদের সহায়তার বিষয়টিও চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য চাপ দিচ্ছেন। তবে তেহরান সাফ জানিয়ে দিয়েছে, এসব বিষয় আলোচনার অযোগ্য।
এদিকে, দুই পক্ষই সামরিক চাপ বাড়াচ্ছে। ইরানের ইসলামিক রিভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) সোম ও মঙ্গলবার হরমুজ প্রণালীতে মহড়া চালিয়েছে। বুধবার ওমান সাগরে রাশিয়ার সঙ্গে যৌথ নৌ মহড়ার ঘোষণা দিয়েছে তেহরান।
যুক্তরাষ্ট্রও এ অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি জোরদার করেছে। ট্রাম্প প্রশাসন দ্বিতীয় বিমানবাহী রণতরী পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছে। প্রথমটি, ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন, ইতিমধ্যে ইরানের উপকূল থেকে ৭০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছে।
হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট বুধবার বলেন, 'যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি করা ইরানের জন্য বুদ্ধিমানের কাজ হবে।' ট্রাম্প সোশ্যাল মিডিয়ায় হুমকি দিয়ে লিখেছেন, ইরান চুক্তি না করলে 'অত্যন্ত অস্থিতিশীল ও বিপজ্জনক এই সরকারকে নির্মূল করতে' ভারত মহাসাগরের চাগোস দ্বীপপুঞ্জের বিমানঘাঁটি ব্যবহার করা হতে পারে।
