রাশিয়ায় হু হু করে বাড়ছে নিত্যপণ্যের দাম; জীবন চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন সাধারণ মানুষ
'জীবনটা বড্ড বেশি খরুচে হয়ে যাচ্ছে', আক্ষেপের সুরে কথাগুলো বলছিলেন আলেকজান্ডার। তিনি মস্কোভিত্তিক একটি কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন বিশেষজ্ঞ। তার এই আক্ষেপের কারণ, মাত্র এক মাসের ব্যবধানে তার মাসিক খাবারের বাজেট ২২ শতাংশের বেশি বেড়েছে। আগে যেখানে তার ৩৫ হাজার রুবল লাগত, এখন সেখানে খরচ হচ্ছে ৪৩ হাজার রুবল।
ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধের চতুর্থ বছর ঘনিয়ে আসছে। দেশটির অর্থনীতি এখন স্থবিরতা ও পতনের মাঝামাঝি ঝুলে আছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়তে শুরু করেছে সাধারণ রুশ নাগরিকদের ওপর। যুদ্ধের জেরে পকেটে টান পড়ছে তাঁদের।
আলেকজান্ডার লক্ষ করেছেন, স্থানীয় সুপারমার্কেটগুলোতে ডিম, মুরগির মাংস থেকে শুরু করে মৌসুমি সবজি—প্রায় সব নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে। এমনকি অফিসে যাওয়ার পথে প্রতিদিন আলেকজান্ডার শখ করে যে এক কাপ আমেরিকানো কফি খেতেন, হুট করে সেটার দামও ২৬ শতাংশ বেড়ে গেছে। ২৩০ রুবলের কফি এখন তাঁকে কিনতে হচ্ছে ২৯০ রুবলে।
ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রায় সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকেই রাশিয়ায় নিত্যপণ্যের দাম ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। এর প্রধান কারণ হলো, দেশটির কেন্দ্রীয় বাজেটের সিংহভাগই এখন ব্যয় হচ্ছে যুদ্ধ আর প্রতিরক্ষা খাতে।
শুরুতে এই বিপুল যুদ্ধব্যয়ের ফলে রাশিয়ায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মানও কিছুটা বেড়েছিল। বিশেষ করে মস্কো ও সেন্ট পিটার্সবার্গের মতো বড় শহরগুলোতে মুদ্রাস্ফীতির আঁচ সেভাবে পাওয়া যায়নি। সরকারের বিশাল খরচ আর বিনিয়োগ পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা ও বিদেশি বিনিয়োগ চলে যাওয়ার সংকটকে অনেকটা আড়াল করে রেখেছিল।
তবে ২০২৫ সালে এসে সেই দ্রুত প্রবৃদ্ধির চাকা হঠাৎ ধীর হয়ে যায়। মানুষের বেতন যে হারে বাড়ছে, মুদ্রাস্ফীতি বাড়ছে তার চেয়েও দ্রুতগতিতে। ফলে সাধারণ মানুষের পকেটে টান পড়তে শুরু করেছে।
রাশিয়ার সরকারি পরিসংখ্যান সংস্থা 'রোসস্ট্যাট'-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শুরুতেই মাত্র এক মাসের ব্যবধানে সুপারমার্কেটগুলোতে পণ্যের দাম গড়ে ২ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়ে গেছে। বছরের শুরু থেকেই মাংস, দুধ, লবণ, আটা, আলু, পাস্তা ও কলার মতো খাদ্যপণ্যের পাশাপাশি সাবান, টুথপেস্ট, মোজা, ডিটারজেন্ট এমনকি প্রয়োজনীয় ওষুধের দামও এক লাফে অনেকটা বেড়ে গেছে।
২০১৯ সাল থেকে প্রতি দুই বছর অন্তর জানুয়ারিতে মস্কোর একটি নির্দিষ্ট সুপারমার্কেট চেইন 'প্যাতেরোচকা' থেকে ৫৯টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনে বিবিসি। এই তালিকায় সবজি ও ফলমূল থেকে শুরু করে দুগ্ধজাত পণ্য, মাংস, টিনজাত খাবার, ইনস্ট্যান্ট নুডলস, মিষ্টি ও পানীয়ও থাকে।
২০২৪ সালে এই এক ঝুড়ি পণ্যের দাম ছিল ৭ হাজার ৩৫৮ রুবল। মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে গত মাসে এর দাম দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ৭২৪ রুবলে। অর্থাৎ এই সময়ে খরচ বেড়েছে ১৮ দশমিক ৬ শতাংশ। এই চিত্র রাশিয়ার সরকারি পরিসংখ্যান সংস্থা 'রোসস্ট্যাট'-এর তথ্যের সঙ্গেই মিলে যায়। তাদের হিসাবে, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের শেষ পর্যন্ত খাদ্যপণ্যে সামগ্রিক মুদ্রাস্ফীতির হার ছিল ১৮ দশমিক ১ শতাংশ।
বিবিসির সংগৃহীত তথ্যে দেখা গেছে, ২০২৪ সালের পর থেকে ফল ও সবজির দাম বেড়েছে প্রায় ১৫ শতাংশ। রাশিয়া এসব পণ্যের জন্য মূলত আমদানির ওপর নির্ভরশীল। তাই রুবলের বিনিময় হার ওঠানামা করলে কিংবা সরবরাহ ব্যবস্থায় কোনো বিঘ্ন ঘটলে সরাসরি এর প্রভাব পড়ে বাজারের ওপর। ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর এই দুটি সংকটই প্রকট হয়েছে।
তবে সবচেয়ে বেশি দাম বেড়েছে দুগ্ধজাত পণ্যের। গত দুই বছরে এই খাতে দাম বাড়ার হার ৪১ শতাংশ, যা বিবিসির বাজার করা তালিকার মধ্যে সর্বোচ্চ। দুগ্ধজাত পণ্য রাশিয়ায় স্থানীয়ভাবেই উৎপাদিত হয়। কিন্তু খামার পরিচালনার খরচ বৃদ্ধি, ঋণের চড়া সুদ এবং শ্রমিকের সংকটের কারণে এই পণ্যগুলোর দাম এখন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।
রাশিয়ায় জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ার পেছনে নতুন যুক্ত হয়েছে বাড়তি করের বোঝা। গত ১ জানুয়ারি থেকে দেশটিতে ভ্যাট বা মূসক ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২২ শতাংশ করা হয়েছে। রুশ অর্থ মন্ত্রণালয় লুকোছাপা না করেই জানিয়েছে, দেশের 'প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা' অর্থাৎ ইউক্রেন যুদ্ধের খরচ জোগাতেই এই বাড়তি কর আরোপ করা হয়েছে।
যুদ্ধের এই অর্থনৈতিক প্রভাব রাশিয়ার মানুষের খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রায় বড় পরিবর্তন আনছে। মস্কোর বাসিন্দা আলেকজান্ডার তাঁর খাদ্যাভ্যাস বদলাতে না চাইলেও অনেকের পক্ষেই তা আর সম্ভব হচ্ছে না।
৬৮ বছর বয়সী নাদেজদা যেমন এখন আর গরুর মাংস কেনার সামর্থ্য রাখেন না। আমিষের চাহিদা মেটাতে তিনি এখন সস্তা মাছের ওপর নির্ভর করছেন। নাদেজদা ও তাঁর স্বামী দুজনেই অবসরপ্রাপ্ত। নাদেজদা জানান, মাসে তিনি যে ৩২ হাজার রুবল পেনশন পান, তার পুরোটা এখন খাবার কিনতেই শেষ হয়ে যায়। ফলে অন্য সব খরচ তাঁদের বন্ধ রাখতে হয়েছে। গাড়ি মেরামতের জন্য জমানো টাকা খরচ হচ্ছে খাবারে। এমনকি তাঁর স্বামীর জন্য একটি নতুন শীতের জ্যাকেট কেনাও আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে।
২০২৫ সালের মাঝামাঝিতে রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর এলভিরা নাবিউলিনা বলেছিলেন, দেশটির অর্থনীতি একটি স্থিতিশীল পরিস্থিতির দিকে যাচ্ছে। তবে অনেক অর্থনীতিবিদই এখন ভিন্ন কথা বলছেন। তাঁদের মতে, রাশিয়ার অর্থনীতি এখন স্থবিরতা, এমনকি সংকোচনের ঝুঁকিতে রয়েছে।
এ বছর রাশিয়ার অর্থনীতির বড় ঝুঁকি হতে পারে তেলের বাজার। দেশটির জাতীয় বাজেট মূলত তেলের উচ্চমূল্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। কিন্তু বছরের শুরু থেকেই তেলের দাম কমছে, যা বাড়ার খুব একটা সম্ভাবনাও আপাতত নেই। এর ওপর নতুন করে যুক্ত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা। ফলে ভারতের মতো বড় ক্রেতাদের কাছে রাশিয়ার তেল বিক্রি কমে গেছে।
বিদেশি বিনিয়োগের অভাব আর উচ্চ সুদের হারের কারণে রাশিয়ার পক্ষে এখন নতুন করে ঋণ নেওয়াও কঠিন। এমন পরিস্থিতিতে বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকার আবারও কর বাড়াতে পারে কিংবা জনকল্যাণমূলক খাতে খরচ কমিয়ে দিতে পারে। এর ফলে সাধারণ মানুষের আয় আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
এই অর্থনৈতিক মারপ্যাঁচ সাধারণ রুশ নাগরিকদের জন্য খুব একটা স্বস্তির খবর নয়। বাজারের থলে ছোট হওয়া আর সঞ্চয় ফুরিয়ে আসার মধ্য দিয়ে সেই তেতো স্বাদ তাঁরা হাড়েই হাড়েই টের পাচ্ছেন।
