রুবিওর সম্পর্ক মেরামতের চেষ্টার মধ্যেই ইউরোপকে কাছে টানতে চাইছে চীন
জার্মানিতে আয়োজিত মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে এক সমঝোতামূলক বক্তব্যে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ঘোষণা করেন, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপ 'একে অপরের অবিচ্ছেদ্য অংশ।' তার এ ঘোষণার ঠিক কয়েক মিনিট পরেই তার চীনা সমকক্ষ নিজের প্রস্তাব নিয়ে মঞ্চে হাজির হন।
শনিবার একই মঞ্চ থেকে বক্তব্য দেওয়ার সময় চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই উপস্থিত শ্রোতাদের উদ্দেশে বলেন, 'চীন এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন হলো অংশীদার, প্রতিদ্বন্দ্বী নয়।'
তিনি আরও বলেন, 'যতদিন আমরা এই বিষয়টি দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরব, ততদিন আমরা চ্যালেঞ্জের মুখে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হব, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বিভক্তির দিকে যাওয়া থেকে রক্ষা করতে পারব এবং মানব সভ্যতার নিরন্তর অগ্রগতিকে ত্বরান্বিত করতে পারব।'
রুবিও এবং ওয়াং-এর এই পর্যায়ক্রমিক উপস্থিতি এমন এক সময়ে ঘটল যখন মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির আমূল পরিবর্তন পশ্চিমা মিত্রদের সাথে আমেরিকার দীর্ঘদিনের সুসম্পর্ককে নাড়িয়ে দিয়েছে। এই মিত্ররা এখন প্রকাশ্যেই ঘোষণা করছেন যে, মার্কিন সমর্থিত বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও নিয়ম-নীতির যুগ শেষ হয়ে গেছে।
এখন, এরপর কী ঘটতে যাচ্ছে তার রূপরেখা তৈরির প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেছে।
বার্ষিক এই নিরাপত্তা সম্মেলনের আসরে মার্কো রুবিও তার বক্তব্য ব্যবহার করেছেন ইউরোপীয় নেতাদের এটি আশ্বস্ত করতে যে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন তাদের জোটের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ; যদিও এই প্রশাসন বিশ্বাস করে যে, জোটটিকে টিকিয়ে রাখতে ইউরোপীয় দেশগুলোর আরও অনেক কিছু করার প্রয়োজন রয়েছে এবং বর্তমান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাটিকে 'পুনর্নির্মাণ' করা উচিত।
অন্যদিকে ওয়াং ই—একজন অভিজ্ঞ কূটনীতিক যিনি এক দশকেরও বেশি সময় ধরে নেতা শি জিনপিংয়ের পররাষ্ট্রনীতির প্রধান মুখ হিসেবে কাজ করছেন—তিনি তার অত্যন্ত সুপরিকল্পিত জবাব নিয়ে তৈরি ছিলেন।
ওয়াং ই বলেন, বর্তমান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার সমস্যাগুলো মূলত জাতিসংঘের কারণে নয়, বরং 'এমন কিছু দেশের কারণে যারা বিভেদকে বড় করে দেখে, কান্ট্রি-ফার্স্ট বা নিজের দেশকে আগে রাখার নীতি অনুসরণ করে, জোটগত দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয় এবং স্নায়ুযুদ্ধের মানসিকতাকে আবারও পুনরুজ্জীবিত করতে চায়।'
মার্কিন নীতি ও কূটনীতির প্রতি এক ধরনের প্রচ্ছন্ন হুঁশিয়ারি দিয়ে ওয়াং ই আরও বলেন, চীন ও ইউরোপের উচিত একসঙ্গে মিলে 'একতরফা কর্মকাণ্ড' বর্জন করা, মুক্ত বাণিজ্য রক্ষা করা এবং জোটগত সংঘাতের বিরোধিতা করা।
সাইডলাইন বৈঠক
তবে ওয়াং ইউরোপের কাছে চীনের এই প্রস্তাব এমন এক সময়ে তুলে ধরলেন যখন বেইজিং যুক্তরাষ্ট্রের সাথেও তাদের সম্পর্ক স্থিতিশীল রাখতে চাইছে। উল্লেখ্য, এই বসন্তের শেষের দিকে ট্রাম্প চীন সফরে যেতে পারেন।
এই যুগান্তকারী বৈঠকের গুরুত্ব অপরিসীম, যা বিশ্বের দুই বৃহত্তম অর্থনীতির মধ্যে বিদ্যমান আপেক্ষিক স্থিতিশীলতাকে আরও সুসংহত করতে পারে। এই স্থিতিশীলতার সূত্রপাত হয়েছিল গত শরতে দক্ষিণ কোরিয়ায় শি এবং ট্রাম্পের মধ্যকার বৈঠকের মাধ্যমে।
আসন্ন (ট্রাম্পের) সফরের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে, ওয়াং ই মিউনিখের শ্রোতাদের জানান, তিনি চীন-মার্কিন সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে 'আত্মবিশ্বাসী'। তবে তিনি সতর্ক করেন যে, এই সম্পর্ক সঠিক পথে না চললে বিপদ ডেকে আনতে পারে।
তিনি বলেন, দুই দেশের সম্পর্কের সামনে 'দুটি ভিন্ন সম্ভাবনা' রয়েছে— একটি হলো যেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চীনকে 'যৌক্তিকভাবে বুঝতে' পারবে এবং সহযোগিতা করবে; আর অন্যটি হলো যেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চীনের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করতে চাইবে, 'অন্ধভাবে' চীনের বিরোধিতা করবে এবং তাইওয়ানসহ চীনের 'রেড লাইন' বা চূড়ান্ত সীমাগুলো লঙ্ঘন করবে।
তিনি আরও বলেন, শেষের পথটি বেছে নেওয়া হলে তা সম্ভবত 'চীন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে সংঘাতের দিকে ঠেলে দেবে'।
শনিবার সম্মেলনে মার্কো রুবিও চীন-মার্কিন সম্পর্ক নিয়েও কথা বলেন। কট্টর চীন-বিরোধী হিসেবে পরিচিত রুবিও একটি প্রশ্নোত্তর পর্বে শ্রোতাদের বলেন, যদি 'এই পৃথিবীর বড় দুটি শক্তি' তাদের স্বার্থের অমিল থাকা বিষয়গুলো সামলাতে একে অপরের সাথে যোগাযোগ না রাখে, তবে তা হবে একটি 'ভৌগোলিক-রাজনৈতিক কৌশলগত ব্যর্থতা'।
রুবিও এবং ওয়াং শুক্রবার সম্মেলনের ফাঁকেও একটি সাইডলাইন বৈঠক করেন, যা মূলত ট্রাম্পের প্রত্যাশিত চীন সফরের প্রেক্ষাপট তৈরিতে সহায়ক বলে মনে হচ্ছে।
শুক্রবার সেই বৈঠকের পর ওয়াং ই জানান, দুই দেশের শীর্ষ কূটনীতিকদের মধ্যে 'ইতিবাচক ও গঠনমূলক' আলোচনা হয়েছে এবং তারা তাদের নিজ নিজ নেতাদের মধ্যে হওয়া 'গুরুত্বপূর্ণ ঐকমত্যগুলো যৌথভাবে বাস্তবায়ন' করবেন।
শ্রোতারা কি ইতিবাচক?
ওয়াং এবং তার প্রতিনিধি দল মিউনিখে সম্ভবত যে মূল বিষয়টি যাচাই করছেন তা হলো—ইউরোপ তাদের বৃহত্তর প্রস্তাবগুলো ঠিক কতটা গুরুত্ব দিয়ে শুনছে।
বেইজিং দীর্ঘকাল ধরে বিশ্বের জন্য এমন এক নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি প্রচার করতে চাইছে যা আর মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোট বা প্রতিষ্ঠানগুলোর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হবে না—বরং তাদের নিজস্ব স্বার্থের জন্য আরও অনুকূল হবে। চীন ইউরোপকে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ 'মেরু' হিসেবে দেখে, যাদের সহজেই যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ নেওয়া উচিত নয়।
ওয়াং ই সম্মেলনে তার বার্তার মাধ্যমে চীনকে 'শান্তির এক অটল শক্তি' এবং 'স্থিতিশীলতার জন্য এক নির্ভরযোগ্য শক্তি' হিসেবে তুলে ধরেন। বর্তমান সময়ের সংকট মোকাবিলায় বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থা পুনর্গঠনের জন্য তিনি শি জিনপিংয়ের নেওয়া উদ্যোগগুলোকে সমাধান হিসেবে উপস্থাপন করেন।
তবে বেইজিংয়ের এই বার্তার সামনে এখন এক কঠিন শ্রোতামণ্ডলী দাঁড়িয়ে আছে; কারণ ইউরোপীয় নেতারা চীনের সাথে তাদের বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি এবং কৌশলগত সরবরাহ শৃঙ্খলের ওপর চীনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চরম উদ্বিগ্ন।
তাছাড়া, ইউক্রেন যুদ্ধের সময় রাশিয়ার প্রতি চীনের সমর্থন এবং দক্ষিণ চীন সাগর ও তাইওয়ানের চারপাশে চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক আগ্রাসনের কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইউরোপের সাথে তাদের সম্পর্কের টানাপোড়েন বেড়েছে। উল্লেখ্য যে, স্বশাসিত গণতান্ত্রিক তাইওয়ানকে চীন নিজের ভূখণ্ড বলে দাবি করে।
রোববার তাইওয়ানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লিন চিয়া-লুং চীনকে একটি শান্তিকামী শক্তি হিসেবে ওয়াং-এর দেওয়া বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানান। তিনি বলেন, চীনের সাম্প্রতিক 'সামরিক উস্কানি' জাতিসংঘের নীতির সম্পূর্ণ পরিপন্থী। (তবে চীন দাবি করে যে তাদের সামরিক মহড়া মূলত 'জাতীয় সার্বভৌমত্ব' রক্ষার জন্য; এমনকি মিউনিখের মঞ্চে ওয়াং তার বক্তব্যে কিছু দেশের বিরুদ্ধে 'তাইওয়ানকে চীন থেকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টার' অভিযোগ তোলেন এবং চীনকে নয়, বরং জাপানকে আঞ্চলিক হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেন)।
নানা উদ্বেগ থাকা সত্ত্বেও, বেইজিং এখন একটি বড় সুযোগ দেখতে পাচ্ছে; কারণ পশ্চিমা নেতারা আমেরিকার সাথে তাঁদের পরিবর্তিত সম্পর্কের প্রেক্ষিতে নিজেদের পররাষ্ট্রনীতিকে নতুন করে সাজাচ্ছেন।
ইতোমধ্যেই সাম্প্রতিক মাসগুলোতে আমেরিকার মিত্র হিসেবে পরিচিত বেশ কয়েকটি দেশের নেতারা বেইজিং সফর করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বিভিন্ন তিক্ততার মুখোমুখি হয়ে তারা এখন চীনের সঙ্গে সহযোগিতা এবং সংলাপ আরও গভীর করতে চাইছেন।
মিউনিখ সম্মেলনের আগে আয়োজকরা ঘোষণা করেছিলেন যে, ১৯৪৫-পরবর্তী মার্কিন নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাটি 'এখন ধ্বংসের মুখে', যেখানে খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই সবচেয়ে শক্তিশালী 'ধ্বংসাত্মক শক্তি' হিসেবে কাজ করছে।
রুবিওর বক্তব্যের পর ইউরোপীয়রা হয়তো কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে। কিন্তু গত মাসে তাদের ন্যাটো মিত্র ডেনমার্কের অঞ্চল গ্রিনল্যান্ড দখল করার বিষয়ে ট্রাম্পের দেওয়া হুমকি এখনও ইউরোপীয়দের কানে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।
আর ঠিক এই সুযোগেই বেইজিং আশা করছে যে, ইউরোপ অন্তত তাদের নিজস্ব প্রস্তাবগুলো আগের চেয়ে একটু বেশি মনোযোগ দিয়ে শুনবে।
