সাবেক প্রিন্স অ্যান্ড্রু ও যৌন নিপীড়নের অভিযোগ আনা নারীর ছবি আসল; ইমেইলে সত্যতা মিলেছে
প্রিন্স অ্যান্ড্রু মাউন্টব্যাটেন উইন্ডসরের সঙ্গে যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টিন কাণ্ডের ভুক্তভোগী ভার্জিনিয়া জিউফ্রের কোমরে হাত দিয়ে দাড়ানো ছবিটি আসল বলে ধারণা করা হচ্ছে। কারণ এটি জেফ্রি এপস্টিন সংক্রান্ত সর্বশেষ প্রকাশিত নথিতে থাকা একটি ইমেইল থেকে পাওয়া গেছে। ইমেইলটি গিলেইন ম্যাক্সওয়েলের লেখা বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সাবেক এই রাজপুত্র বরাবরই তার বিরুদ্ধে আনা যৌন নির্যাতনের অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন। তিনি এর আগেও দাবি করেছিলেন, ভার্জিনিয়া জিউফ্রের সঙ্গে তার কখনো দেখা হয়নি এবং ছবিটি হয়তো কারসাজি করে বানানো হতে পারে।
তবে ২০১৫ সালের একটি বার্তা সেই দাবিকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। 'ড্রাফট স্টেটমেন্ট' শিরোনামের ওই ইমেইলটি 'জি ম্যাক্সওয়েল' নামের একজনের কাছ থেকে জেফ্রি এপস্টিনকে পাঠানো হয়েছিল। সর্বশেষ এপস্টিন ফাইলসের অংশ হিসেবে ইমেইলটি প্রকাশ করা হয়েছে। এতে ম্যাক্সওয়েল লিখেছেন, '২০০১ সালে আমি যখন লন্ডনে ছিলাম, তখন তিনি (নাম অস্পষ্ট) প্রিন্স অ্যান্ড্রুসহ আমার বেশ কয়েকজন বন্ধুর সাথে দেখা করেছিলেন। একটি ছবি তোলা হয়েছিল কারণ আমি মনে করি তিনি এটি তার বন্ধু এবং পরিবারকে দেখাতে চেয়েছিলেন।'
২০২৫ সালে মারা যাওয়া ভার্জিনিয়া জিউফ্রের পরিবার বিবিসির নিউজনাইট অনুষ্ঠানে জানিয়েছে, এই ইমেইলটি প্রমাণ করে যে তিনি (ভার্জিনিয়া) সত্যবাদী ছিলেন এবং তিনি আজ কলঙ্কমুক্ত হয়েছেন।
জিউফ্রের ভাই স্কাই রবার্টস বলেন, 'এটি সত্যিই ভার্জিনিয়াকে কলঙ্কমুক্ত করল... সে পুরোটা সময় মিথ্যা বলেনি।'
তিনি আরও বলেন, 'এটি এমন একটি মুহূর্ত, যখন আমরা আমাদের বোনকে নিয়ে সত্যিই গর্বিত।'
যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ (ডিওজে) প্রকাশিত ওই ইমেইলে আরও বলা হয়েছে, 'জি ম্যাক্সওয়েল' তার বাড়িতে 'অনুচিত কিছু' ঘটেছে—এমন কোনো বিষয় সম্পর্কে অবগত ছিলেন না।
প্রকাশিত বিবৃতির সংস্করণে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নাম মুছে ফেলা হয়েছে (রেডাক্টেড)। তবে বিবরণ থেকে স্পষ্ট ইঙ্গিত মেলে যে, জিউফ্রেকে নিয়ে আলোচনা করছিলেন গিলেইন ম্যাক্সওয়েলই।
ভার্জিনিয়া জিউফ্রে—যিনি জেফ্রি এপস্টিন ও গিলেইন ম্যাক্সওয়েলের বিরুদ্ধে অন্যতম প্রধান অভিযোগকারী—অভিযোগ করেছিলেন, কিশোরী বয়সে প্রিন্স অ্যান্ড্রু মাউন্টব্যাটেন-উইন্ডসর তার সঙ্গে তিনবার যৌন সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন।
প্রিন্স অ্যান্ড্রু বরাবরই এই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন। ২০২২ সালে তিনি জিউফ্রের সঙ্গে আদালতের বাইরে একটি সমঝোতায় পৌঁছান। তবে ওই সমঝোতায় দায় স্বীকার বা ক্ষমা প্রার্থনার কোনো বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল না।
এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য বিবিসি নিউজ প্রিন্স অ্যান্ড্রুর প্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে।
এদিকে, গত বছর, মার্কিন হাউজ ওভারসাইট কমিটির ডেমোক্র্যাটদের দ্বারা প্রকাশিত জুলাই ২০১১-এর একটি ইমেইলেও এটি নিশ্চিত হওয়া গিয়েছিল যে, সাবেক রাজপুত্রের (অ্যান্ড্রু) সাথে জিউফ্রের ছবি তোলা হয়েছিল।
জেফ্রি এপস্টাইনের পাঠানো বার্তায়—যিনি ওই ছবিটি তোলার সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে—লেখা হয়েছিল, 'হ্যাঁ, সে [জিউফ্রে] আমার বিমানে ছিল এবং হ্যাঁ, প্রিন্স অ্যান্ড্রুর সঙ্গে তার ছবি তোলা হয়েছিল।'
২০১৯ সালে নিউজনাইট-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মাউন্টব্যাটেন-উইন্ডসর জিউফ্রের সঙ্গে দেখা হওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেন এবং দাবি করেন, ছবিটি—বা এর কিছু অংশ—ভুয়া হতে পারে।
সে সময় তিনি বলেন, 'কেউ প্রমাণ করতে পারবে না যে ওই ছবিটি কারসাজি করা কি না, তবে আমার মনে পড়ে না যে এমন কোনো ছবি তোলা হয়েছিল।'
ওই বহুল সমালোচিত সাক্ষাৎকারে তিনি আরও দাবি করেন, সংশ্লিষ্ট সময়ে তিনি গিলেইন ম্যাক্সওয়েলের বাড়িতে ছিলেন না; বরং যুক্তরাজ্যের ওকিং শহরের একটি পিজা এক্সপ্রেস রেস্তোরাঁয় ছিলেন।
বুধবার বিবিসি নিউজনাইট-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ভার্জিনিয়া জিউফ্রের ভাবি আমান্ডা রবার্টস কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, তথাকথিত এপস্টিন ফাইলস থেকে নথি প্রকাশের ঘটনাটি ছিল এক ধরনের 'ঝড়ো অভিজ্ঞতা'।
তিনি বলেন, 'এটি এমন এক মুহূর্ত, যখন আমি তীব্র আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েছি, কারণ আমি চাই সে এখানে থাকত এবং এসব দেখতে পেত। সে এত কঠিন লড়াই করেছে, এত দীর্ঘ সময় ধরে, তবুও সে ছিল ভীষণ শক্তিশালী।'
আমান্ডা আরও বলেন, 'আমরা তাকে এবং তার অর্জনগুলো নিয়ে গর্বিত, কিন্তু এই মুহূর্তে আমরা তাকে ভীষণভাবে মিস করছি। এই মুহূর্তটি উপভোগ করার কথা ছিল তারই।'
এর আগে নিউজনাইট-কে দেওয়া এক বিবৃতিতে পরিবারটি জানায়, তারা 'আশা করছেন যে অ্যান্ড্রুর বিরুদ্ধে ফৌজদারি অভিযোগ আনা হবে'।
জেফ্রি এপস্টাইনের সঙ্গে সম্পর্কের কারণে সাবেক এই রাজপুত্রকে এখনো নানা বিতর্ক ও সমালোচনার মুখে পড়তে হচ্ছে।
সোমবার তিনি উইন্ডসরের বাসভবন রয়্যাল লজ ছেড়ে নরফোকের স্যান্ড্রিংহাম এস্টেটে চলে যান।
এপস্টাইনের নির্যাতনের শিকারদের একজন অ্যাশলি রুবরাইট জানান, মাউন্টব্যাটেন-উইন্ডসর রয়্যাল লজ ছেড়ে চলে গেছেন—এই খবর শুনে তিনি 'কেঁদে ফেলেছিলেন'।
বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, জেফ্রি এপস্টাইনের সঙ্গে জড়িতদের জবাবদিহিতার আওতায় আনার জন্য যুক্তরাজ্যের এই প্রচেষ্টায় তিনি অত্যন্ত 'উল্লসিত' এবং নিজেকে 'কলঙ্কমুক্ত' মনে করছেন।
তিনি বলেন, 'এটি এমন এক অনুভূতি যা আমি ভাষায় বর্ণনা করতে পারব না। অন্য একটি দেশের পদক্ষেপ এবং সাধারণ কিছু প্রশ্নও যদি আমাকে এতটা শান্তি দিতে পারে, তবে নিজের দেশে যদি আমার নির্যাতনকারীর ব্যক্তিগতভাবে বিচার হতো, তবে কেমন লাগত তা আমি কল্পনাও করতে পারছি না।'
গত বছরের অক্টোবরে বাকিংহাম প্যালেস ঘোষণা দেয়, মাউন্টব্যাটেন-উইন্ডসর তার বাসভবন ছাড়বেন। একই সময়ে তার রাজকীয় উপাধিও কেড়ে নেওয়া হয়।
শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ (ডিওজে) প্রকাশিত সর্বশেষ নথিগুলোর মধ্যে এমন কিছু ছবিও রয়েছে, যেখানে মাউন্টব্যাটেন-উইন্ডসরকে মাটিতে শুয়ে থাকা এক নারীর ওপর চার হাত-পায়ে ভর দিয়ে হাঁটু গেড়ে থাকতে দেখা যায়।
এছাড়া অন্যান্য নথিতেও বারবার তার নাম উল্লেখ করা হয়েছে। একটি বার্তায় দেখা গেছে, তিনি এপস্টাইনকে বাকিংহাম প্যালেসে আসার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন।
দণ্ডিত যৌন অপরাধী এপস্টিন যুক্তরাষ্ট্রে অপ্রাপ্তবয়স্কদের যৌন প্রস্তাব দেওয়ার অভিযোগে দোষ স্বীকার করার পরও তার সঙ্গে মাউন্টব্যাটেন-উইন্ডসরের মধ্যে অসংখ্যবার যোগাযোগ হয়েছিল।
উল্লেখ্য, যৌন পাচারের অভিযোগে বিচারের অপেক্ষায় থাকা অবস্থায় ২০১৯ সালের ১০ আগস্ট নিউইয়র্কের একটি কারাগারে এপস্টিনের মৃত্যু হয়।
