এপস্টিন ইস্যুতে সাক্ষ্য দিতে সাবেক প্রিন্স অ্যান্ড্রুর ওপর চাপ বাড়ছে
যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টিনের ভুক্তভোগীদের পক্ষে থাকা বিশিষ্ট আইনজীবী গ্লোরিয়া অলরেড বলেন, অ্যান্ড্রু মাউন্টব্যাটেন-উইন্ডসরের উচিত তার জানা তথ্যগুলো সাক্ষ্য হিসেবে উপস্থাপন করা। তিনি বিবিসিকে বলেন, 'এখনও খুব বেশি দেরি হয়ে যায়নি এবং তার কাছে এমন তথ্য আছে যা তিনি শেয়ার করতে পারেন।'
তবে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের প্রকাশিত সর্বশেষ ইমেইল গুলোতে দেখা গেছে, এপস্টিন তদন্তে সহায়তা করতে অ্যান্ড্রুর কাছে এর আগেই একাধিকবার অনুরোধ জানিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃপক্ষ। এর মধ্যে ২০২০ সালে যুক্তরাজ্যের হোম অফিসে পাঠানো একটি আনুষ্ঠানিক অনুরোধও ছিল।
রাজপরিবারের সূত্র থেকেও একই ধরনের আহ্বান এসেছিল। সেখানে বলা হয়, 'যাদের কাছে তথ্য রয়েছে, তাদের উচিত যেকোনো তদন্তে সহায়তার কথা বিবেচনা করা। তবে শেষ পর্যন্ত এটি অ্যান্ড্রু মাউন্টব্যাটেন-উইন্ডসর ও তার বিবেকের বিষয়।'
২০১৯ সালে এমিলি মেইটলিসকে দেওয়া অ্যান্ড্রুর বহুল আলোচিত নিউজনাইট সাক্ষাৎকারের কথা উল্লেখ করে অলরেড বলেন, 'তিনি কেন বিবিসির সঙ্গে এক ঘণ্টার এক বিপর্যয়কর টেলিভিশন সাক্ষাৎকার দিতে রাজি হলেন, কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে কথা বলতে রাজি হলেন না?'
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমারও এ বিষয়ে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, 'সাক্ষ্য দেওয়ার ক্ষেত্রে আমি সবসময় বলেছি, যার কাছে তথ্য আছে তাকে তা শেয়ার করার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। আপনি যদি তা করতে প্রস্তুত না হন তবে আপনি ভুক্তভোগী-কেন্দ্রিক হতে পারেন না।'
রাজপরিবারের সূত্রগুলো বলছে, বাকিংহাম প্যালেসের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য না আসাকে উদাসীনতা হিসেবে দেখা উচিত নয়। জনমনে যে ক্ষোভ রয়েছে, তা রাজকীয় সহকারীরা পুরোপুরি বুঝতে পারছেন।
প্রাসাদ এই বিষয়ে প্রকাশিত ফাইলগুলোর ওপর নজর রাখছে। বাকিংহাম প্যালেসের আনুষ্ঠানিক অবস্থান হলো—রাজা ও রানি 'সব ধরনের নির্যাতনের ভুক্তভোগী ও বেঁচে থাকা মানুষদের প্রতি তাদের চিন্তা ও গভীর সহানুভূতি আগেও ছিল, এখনো আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে।'
এখন পর্যন্ত অ্যান্ড্রু সাক্ষ্য দিতে আগ্রহী—এমন কোনো লক্ষণ দেখাননি। তিনি সব সময়ই কোনো ধরনের অনিয়মের অভিযোগ দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করে আসছেন।
গত শরতে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটরা সাবেক এই রাজপুত্রকে এপস্টিনের বিষয়ে তার জানা তথ্য জানাতে নভেম্বর পর্যন্ত সময় দিয়েছিলেন। তবে তিনি এর কোনো জবাব দেননি।
সর্বশেষ প্রকাশিত ইমেইল গুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তার সাক্ষ্য আদায়ের আগের প্রচেষ্টার ব্যাপ্তি প্রকাশ পেয়েছে।
২০২০ সালের শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ ও অ্যান্ড্রুর আইনজীবীদের মধ্যে একাধিক ইমেইল আদান–প্রদান হয়। সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃপক্ষ তার সাক্ষ্য দেওয়ার সময় ও স্থান নির্ধারণের চেষ্টা করেছিল।
এই সাক্ষ্য যুক্তরাজ্য বা যুক্তরাষ্ট্র—যেকোনো জায়গায় দেওয়া যেত। তবে উভয় পক্ষের আইনজীবীদের মধ্যে শীতল যোগাযোগের কারণে কোনো অগ্রগতি হয়নি, যদিও উভয় পক্ষই তদন্তে সহায়তার বিষয়ে অ্যান্ড্রুর প্রকাশ্য প্রতিশ্রুতির কথা উল্লেখ করেছিল।
একপর্যায়ে হতাশা প্রকাশ করে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ জানায়, 'আগের আলোচনাগুলো আবার টেনে আনার কোনো অর্থ নেই', এবং তারা পুনরায় প্রশ্ন তোলে—'প্রিন্স অ্যান্ড্রু সাক্ষাৎকার দিতে রাজি কি না এবং হলে তা কবে অনুষ্ঠিত হবে।'
আরেক ইমেইলে যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃপক্ষ জানায়, 'স্বেচ্ছায় সাক্ষাৎকার নেওয়ার সব প্রচেষ্টা শেষ হয়ে গেছে।'
এরপর যুক্তরাষ্ট্রের আইনগত কর্তৃপক্ষকে যুক্তরাজ্যের সহায়তা চাইতে হয়, যা 'মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স' নামে পরিচিত। এই প্রক্রিয়ায় এক দেশ অন্য দেশের সহায়তায় বিদেশে থাকা কোনো সাক্ষীকে সাক্ষ্য দিতে বাধ্য করতে পারে।
ইমেইল গুলোতে দেখা যায়, ২০২০ সালের এপ্রিল মাসে হোম অফিসে এমন একটি অনুরোধ পাঠানো হয়েছিল। এক মার্কিন আইনি প্রতিনিধির ইমেইলে উল্লেখ করা হয়, লন্ডনে যখন কোভিড-১৯ মহামারির চূড়ান্ত পর্যায় আসতে যাচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছিল, ঠিক তখনই অনুরোধটি পৌঁছানোয় তারা বিস্মিত হন।
পরবর্তীতে যুক্তরাজ্যে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূতও বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। ২০২১ সালের আগস্টে ভার্জিনিয়া জিউফ্রের করা মামলার প্রভাব নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। ওই মামলায় জিউফ্রে অ্যান্ড্রু ও এপস্টিনের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ আনেন।
এই পরিস্থিতিতে অ্যান্ড্রু একজন সাক্ষী না হয়ে অভিযুক্তে পরিণত হন, যা চলমান মামলার সময় তার কাছ থেকে বক্তব্য নেওয়ার বিষয়টিকে আরও জটিল করে তোলে।
মার্কিন পক্ষ থেকে এমন মন্তব্যও আসে যে, এ বিষয়ে যুক্তরাজ্যের কর্তৃপক্ষ 'হাত গুটিয়ে বসে আছে'।
শেষ পর্যন্ত জিউফ্রের করা মামলাটি ২০২২ সালে আদালতের বাইরে নিষ্পত্তি হয়। অ্যান্ড্রু সব অভিযোগ অস্বীকার করেন এবং তাকে কোনো সাক্ষ্য দিতে হয়নি।
