পর্যটন কেন্দ্র থেকে বিশ্ববাণিজ্যের কেন্দ্র: হাইনানকে বিশ্বের বৃহত্তম মুক্ত-বাণিজ্য বন্দর বানাচ্ছে চীন
গ্রীষ্মমণ্ডলীয় দ্বীপ হাইনানকে বিশ্বের বৃহত্তম মুক্ত-বাণিজ্য বন্দরে (এফটিপি) রূপান্তরের সিদ্ধান্তকে ঘিরে নতুন করে আশা দেখছেন চীনা কর্মকর্তারা। গত ডিসেম্বরে কার্যকর হওয়া এই উদ্যোগকে তারা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য চীনের বিশাল বাজারে প্রবেশের একটি 'বড় লাফ' হিসেবে বর্ণনা করছেন।
বিশ্ববাণিজ্যে উত্তেজনা ও অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে এটিকে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন সংরক্ষণবাদিতার বিপরীতে চীনের অবস্থানের প্রকাশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে। যদিও অতীতে হাইনান নিয়ে নানা প্রচারণা চালানো হয়েছে, বালুকাময় সৈকত ও বিলাসবহুল রিসোর্টের বাইরে দ্বীপটি তেমন সাড়া ফেলতে পারেনি। এবার পরিস্থিতি কি ভিন্ন হবে—সেই প্রশ্নই এখন সামনে।
২০১৮ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং প্রথম হাইনানের জন্য মুক্ত-বাণিজ্য পরিকল্পনার ঘোষণা দেন। তখন কেউ কেউ ধারণা করেছিলেন, তিনি হয়তো হংকংয়ের মতো একটি নতুন মুক্ত-বাণিজ্য কেন্দ্র গড়ে তুলতে চাইছেন—যা চীনের বাজারে প্রবেশের দরজা এবং একটি আর্থিক কেন্দ্র হিসেবে কাজ করবে।
আপাতত হাইনানের লক্ষ্য তুলনামূলকভাবে সীমিত হলেও এফটিপির আওতাধীন এলাকাটি বিশাল। আয়তনে দ্বীপটি প্রায় তাইওয়ানের সমান এবং হংকংয়ের চেয়ে প্রায় ৩০ গুণ বড়। তবু এটিকে একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবেই দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
নতুন এফটিপির আওতায় এখন ৭৪ শতাংশ পণ্য শুল্ক ছাড়াই হাইনানে প্রবেশ করতে পারবে। দ্বীপে প্রক্রিয়াজাত করে যদি কোনো পণ্যের মূল্য অন্তত ৩০ শতাংশ বাড়ানো যায়, তবে সেটি মূল ভূখণ্ডেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পাঠানো যাবে। বিনিয়োগকারী ও দক্ষ জনশক্তিকে আকৃষ্ট করতে কৌশলগত খাত এবং উচ্চ আয়ের ওপর করহার ১৫ শতাংশে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে, যেখানে মূল ভূখণ্ডে এই হার যথাক্রমে ৩৫ ও ৪৫ শতাংশ।
হাইনান মূলধন স্থানান্তর সহজ করতে চাইলেও এটি হংকংয়ের মতো পুরোপুরি স্বাধীন হবে না। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রসহ ৮৬টি দেশের নাগরিকদের জন্য ভিসামুক্ত প্রবেশের সুযোগ রাখা হয়েছে।
শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে 'বিশ্বব্যাপী প্রভাবশালী' এফটিপি হওয়ার লক্ষ্য পূরণে হাইনানকে দীর্ঘদিনের 'পশ্চাৎপদ' তকমা কাটাতে হবে। সাম্রাজ্যবাদী আমল থেকেই এই দুর্নাম বয়ে বেড়াচ্ছে দ্বীপটি। সে সময় রাজদরবারের বিরাগভাজন রাজনীতিক ও কবিদের এখানে নির্বাসনে পাঠানো হতো।
১৯৮৪ সালে কেন্দ্রীয় সরকার যখন হাইনানকে বিদেশি পণ্য আমদানির অনুমতি দেয়, তখন দ্বীপটি ব্যাপক মুনাফালোভী কেলেঙ্কারির জন্য কুখ্যাত হয়ে ওঠে। চার বছর পর গুয়াংডং থেকে আলাদা হয়ে এটি স্বতন্ত্র প্রদেশে পরিণত হয়। একই সঙ্গে এটি হয়ে ওঠে চীনের একমাত্র প্রাদেশিক-স্তরের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (এসইজেড), যেখানে উদার অর্থনৈতিক সংস্কারের নানা পরীক্ষা চালানো হয়। তবে সেই ফলাফল ছিল মিশ্র।
পর্যটন খাতে অবশ্য হাইনান উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছে। শীতকালে চীনের উত্তরাঞ্চলের বাসিন্দা এবং রাশিয়ান পর্যটকেরা এখানে ভিড় করেন। বসন্তে বোয়াও ফোরামের সময় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেতা ও নীতিনির্ধারকেরা আসেন, যাকে অনেকেই 'চীনের ডাভোস' বলে থাকেন। মহাকাশপ্রেমী ও রোমাঞ্চপ্রেমীরাও হাইনানে যান, কারণ চীনের সবচেয়ে শক্তিশালী রকেটগুলো এখানকার উপকূল থেকেই উৎক্ষেপণ করা হয়।
তবে দ্বীপটির সামগ্রিক অর্থনৈতিক পারফরম্যান্স তেমন শক্তিশালী নয়। একসময়কার বিনিয়োগ উন্মাদনা শেষ পর্যন্ত আবাসন খাতের ধস এবং পরিত্যক্ত থিম পার্কে গিয়ে ঠেকেছে।
২০২৪ সালে হাইনানের মাথাপিছু জিডিপি ছিল প্রায় ৭৬ হাজার ইউয়ান (১০ হাজার ৯০০ ডলার), যা চীনের অন্যান্য এসইজেড এবং জাতীয় গড়ের চেয়ে কম। ওই বছর প্রদেশটির মোট জিডিপি ছিল প্রায় ১১৪ বিলিয়ন ডলার, যা দেশের সর্বনিম্নগুলোর একটি। হংকং সীমান্তবর্তী সমৃদ্ধ শেনঝেনের তুলনায় হাইনান অনেকটাই নির্জন। মূল ভূখণ্ড থেকে ২০ থেকে ৩০ কিলোমিটার সমুদ্রপথের বিচ্ছিন্নতা এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা দ্বীপটির অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করেছে।
তবে বেইজিংয়ের আমলাতন্ত্র থেকে প্রায় ২ হাজার ৩০০ কিলোমিটার দূরত্ব এফটিপি প্রকল্পের জন্য আশীর্বাদও হতে পারে। দ্বীপটি নিজেকে সংস্কার পরীক্ষার জন্য উপযুক্ত মনে করছে, কারণ এখানে কোনো ব্যর্থতার প্রভাব চীনের অন্য অঞ্চলে তুলনামূলকভাবে কম পড়বে। গত বছর চালু হওয়া একটি পাইলট প্রকল্পে কোম্পানিগুলো কম বিধিনিষেধযুক্ত ইন্টারনেট ব্যবহারের জন্য আবেদন করতে পারছে। এর ফলে ব্যবহারকারীরা গুগল ও এক্সের মতো সাইট ব্যবহার করতে পারেন, যা মূল ভূখণ্ডে নিষিদ্ধ।
চীনের নেতৃত্ব মনে করছে, কিছুটা ঝুঁকি নেওয়াই হতে পারে লাভজনক। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধীর হলেও তারা বিনিয়োগকারীদের বোঝাতে চান যে দেশ এখনো সংস্কারের পথে আছে। প্রেসিডেন্ট শি এফটিপি উদ্যোগকে 'উন্মুক্ত বিশ্ব অর্থনীতি' এগিয়ে নেওয়ার জন্য একটি 'যুগান্তকারী' পদক্ষেপ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। প্রকল্পটির সমর্থকও কম নয়।
সরকারি উপদেষ্টা ও সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক লি দাওকুই বলেন, 'দলের সবচেয়ে তরুণ ও সাহসী ছাত্রটিকে গভীর পানিতে সাঁতার কাটার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। পুরো ক্লাস এখন দেখবে হাইনান কী করে।'
নতুন বাণিজ্য নীতির বড় সুবিধাভোগী হিসেবে হাইনান চিকিৎসা পর্যটন খাতের দিকে তাকিয়ে আছে। এ লক্ষ্যে 'বোয়াও হোপ সিটি' নামে একটি বিশেষ মেডিকেল জোন গড়ে তোলা হয়েছে। নারিকেল গাছের সারির মধ্যে বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে বিদেশে অনুমোদিত কিন্তু চীনে অনুমোদন না পাওয়া ওষুধ ও যন্ত্রপাতি ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। কিছু হাসপাতাল রোগী সংকটে পড়লেও একটি হাসপাতালে বার্ষিক সদস্যপদের জন্য কেউ ৫ লাখ ইউয়ান, কেউ আবার ১০ লাখ ইউয়ান পর্যন্ত খরচ করছেন। রিসোর্টের মতো সাজানো কক্ষগুলো ধনী চীনারা আগেই বুক করে রেখেছেন।
প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পেও এফটিপির প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। চীনের জনপ্রিয় কোল্ড ড্রিংক কোম্পানি 'মিক্সু' হাইনানে কারখানা স্থাপন করেছে। শুল্কমুক্ত কফি বিন আমদানি করে পানীয় তৈরি করে তারা বাড়তি শুল্ক ছাড়াই সারা দেশে বিক্রি করতে পারছে। একইভাবে হংকংয়ের সোয়্যার প্যাসিফিক একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে চীনের বাজারের জন্য কোকা-কোলা বোতলজাত করার নতুন কারখানা গড়ে তুলছে।
তবে কিছু বিদেশি ব্যবসায়ীর মতে, দক্ষ জনবল ও সুসংহত সরবরাহ চেইনের অভাবে হাইনানের পক্ষে মূল ভূখণ্ডের প্রতিষ্ঠিত উৎপাদন কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা কঠিন হবে। এক অটোমোবাইল নির্বাহী বলেন, 'এখানে ব্যবসার কোনো যুতসই কারণ নেই।'
