'আঙুল ট্রিগারে', মার্কিন হামলার জবাব দিতে প্রস্তুত: ট্রাম্পের হুমকির জবাবে ইরান
যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য যেকোনো হামলার জবাবে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী 'তাৎক্ষণিক ও শক্তিশালীভাবে' প্রতিক্রিয়া জানাতে প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দেশটির বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার হুমকি আবারও দেওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর তিনি এই মন্তব্য করেন।
বুধবার সন্ধ্যায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আরাগচি লেখেন, 'আমাদের সাহসী সশস্ত্র বাহিনী—আঙুল ট্রিগারে রেখে—আমাদের প্রিয় ভূমি, আকাশ ও সমুদ্রের বিরুদ্ধে যেকোনো আগ্রাসনের জবাবে তাৎক্ষণিক ও শক্তিশালীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাতে প্রস্তুত।'
তিনি বলেন, গত বছরের জুনে ইসরায়েলের ১২ দিনব্যাপী সামরিক হামলা থেকে ইরান 'গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা' অর্জন করেছে। উল্লেখ্য, সেই সময় ট্রাম্প প্রশাসনও ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে নিজস্ব হামলা চালিয়েছিল।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, '১২ দিনের যুদ্ধ থেকে পাওয়া মূল্যবান শিক্ষা আমাদের আরও শক্তিশালী, দ্রুত এবং গভীরভাবে (হামলার) জবাব দিতে সক্ষম করেছে।'
আরাগচির এই মন্তব্যগুলো এমন এক সময়ে এল, যার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগেই ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক হামলা চালানোর হুমকি পুনরায় ব্যক্ত করেছেন। সম্প্রতি সরকারবিরোধী বিক্ষোভের ওপর কঠোর দমনপীড়নের কারণে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে ইরানের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ তৈরি হয়েছে।
ট্রাম্প তার 'ট্রুথ সোশ্যাল' প্ল্যাটফর্মে একটি দীর্ঘ পোস্টে বলেছেন, 'একটি বিশাল নৌবহর ইরানের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।' তিনি আরও বলেন, এই নৌবহর 'প্রয়োজনে অত্যন্ত দ্রুততা ও সহিংসতার সাথে তাদের মিশন সম্পন্ন করতে প্রস্তুত, ইচ্ছুক এবং সক্ষম'।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, 'আশা করি ইরান দ্রুত আলোচনার টেবিলে ফিরে আসবে এবং একটি ন্যায্য ও সামঞ্জস্যপূর্ণ চুক্তি করবে—যেখানে কোনো পারমাণবিক অস্ত্র থাকবে না—যা সব পক্ষের জন্য মঙ্গলজনক হবে। সময় ফুরিয়ে আসছে, সময় অত্যন্ত মূল্যবান! আমি ইরানকে আগেও একবার বলেছি, চুক্তি করো!'
ট্রাম্প পারমাণবিক অস্ত্রের প্রসঙ্গটি এমন সময় টেনেছেন যখন তিনি নিজেই বারবার দাবি করে আসছেন যে, গত বছরের মার্কিন হামলা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে 'পুরোপুরি ধ্বংস' করে দিয়েছে।
গত জুনে ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় মার্কিন বোমা হামলার প্রতি ইঙ্গিত করে প্রেসিডেন্ট আরও সতর্ক করেছেন, তেহরান যদি একটি চুক্তিতে সম্মত হতে ব্যর্থ হয়, তবে পরবর্তী হামলা হবে 'আরও অনেক বেশি ভয়াবহ'।
ক্ষমতা প্রদর্শন
এই মাসে তেহরানের সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনের জবাবে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বিবেচনা করছেন বলে ট্রাম্প বারবার ইঙ্গিত দিয়েছেন, যার ফলে পুরো অঞ্চলে উত্তেজনা বেড়েছে।
আরাগচি এই মাসের শুরুতে বলেছিলেন, ওয়াশিংটন যদি ইরানকে 'পরীক্ষা' করতে চায়, তাহলে দেশটি যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত।
বিক্ষোভ দমন হওয়ার পর পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হতে দেখা যায়। সে সময় ট্রাম্প বলেন, ইরান বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত কোনো মৃত্যুদণ্ড কার্যকর না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
কিন্তু চলতি সপ্তাহে ট্রাম্প প্রশাসন 'ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন' নামক বিমানবাহী রণতরিটি এই অঞ্চলে পাঠানোর পর উত্তেজনা আবারও তুঙ্গে উঠেছে, যা একটি সামরিক সংঘাতের আশঙ্কাকে ত্বরান্বিত করেছে।
কাতার বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক আদনান হায়াজনেহ বলেন, বিমানবাহী রণতরি মোতায়েন করা ওয়াশিংটনের একটি 'ক্ষমতা প্রদর্শন', যার উদ্দেশ্য তেহরানকে এই বার্তা পাঠানো যে— 'তোমরা যদি আমাদের কথা হুবহু না শোনো, তবে আমরা মিসাইল হামলা চালাব।'
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত কূটনীতির পথ বেছে নেবে নাকি সামরিক পদক্ষেপ নেবে তা দেখার বিষয়, তবে এই হুমকিগুলো হলো ইরানকে আলোচনার টেবিলে নিয়ে আসার একটি 'মার্কিন কৌশল'।
হায়াজনেহ বলেন, ওয়াশিংটন চায় ইরানের পারমাণবিক ও মিসাইল কর্মসূচি বন্ধ করতে, যা এই অঞ্চলে ইসরায়েলের আধিপত্যের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আর তারা এটি এমন এক সময়ে করতে চাইছে যখন তেহরান অভ্যন্তরীণ, আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিকভাবে দুর্বল অবস্থায় রয়েছে।
তেহরান জোর দিয়ে বলছে, তাদের কর্মসূচির উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ বেসামরিক এবং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অধিকার তাদের রয়েছে। তবে গত জুনের হামলার পর থেকে দেশটির উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কোথায় রয়েছে, তা এখনও অজানা।
কূটনৈতিক তৎপরতা
মঙ্গলবার ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান সর্বশেষ মার্কিন 'হুমকি'র তীব্র সমালোচনা করে বলেন, এগুলোর লক্ষ্য 'অঞ্চলের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করা এবং অস্থিরতা ছাড়া এগুলো আর কিছুই বয়ে আনবে না'।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচি বুধবার আরও বলেন, হামলার হুমকির মুখে থাকলে ইরান পারমাণবিক ইস্যুতে আলোচনা পুনরায় শুরু করবে না।
রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমকে আরাগচি বলেন, 'সাম্প্রতিক দিনগুলোতে আমার এবং মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফের মধ্যে কোনো যোগাযোগ হয়নি এবং আমাদের পক্ষ থেকেও আলোচনার কোনো অনুরোধ করা হয়নি।'
তিনি আরও বলেন, 'আমাদের অবস্থান পরিষ্কার। হুমকির মুখে কোনো আলোচনা চলে না; আলাপ-আলোচনা কেবল তখনই হতে পারে যখন আর কোনো ভয়ভীতি বা অতিরিক্ত চাহিদা থাকবে না।'
তবে আরাগচি তার সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে উল্লেখ করেছেন, ইরান সবসময়ই হুমকিহীন এমন একটি 'পারস্পরিক লাভজনক, ন্যায্য এবং সামঞ্জস্যপূর্ণ' পারমাণবিক চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছে যা— 'হুমকিমুক্ত হবে এবং 'ইরানের শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক প্রযুক্তি ব্যবহারের অধিকার নিশ্চিত করবে ও কোনো পারমাণবিক অস্ত্র থাকবে না—এমন নিশ্চয়তা দেবে।'
ইরানের রাজধানী তেহরান থেকে আল জাজিরার আলী হাশেম জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রকাশ্য হুমকির আড়ালে পর্দার অন্তরালে অনেক কিছুই ঘটছে, কারণ মধ্যস্থতাকারীরা এই সংকটের একটি সমাধান খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন।
তিনি (আলী হাশেম) বলেন, 'মনে হচ্ছে কূটনৈতিক ফ্রন্টে অনেক কিছু ঘটছে। মধ্যস্থতাকারীরা একটি সমাধান খুঁজে পেতে তাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন কারণ বর্তমান পরিস্থিতি সত্যিই খুব উদ্বেগজনক।'
হাশেম ব্যাখ্যা করে বলেন, প্রকাশ্যে ইরান লড়াই করার প্রস্তুতির সংকেত দিচ্ছে, পাশাপাশি তাদের পক্ষ থেকে আলোচনার প্রস্তুতিও রয়েছে 'যখনই আলোচনার পরিবেশ যথাযথ হবে' এবং যখন সামরিক হুমকির মাধ্যমে তাদের ওপর কিছু চাপিয়ে দেওয়া হবে না।
বুধবার আল জাজিরার সাথে আলাপকালে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানও ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, 'ইরান পুনরায় পারমাণবিক ইস্যু নিয়ে আলোচনা করতে প্রস্তুত।'
আঞ্চলিক উত্তেজনা
এদিকে, সামরিক অভিযানের এই হুমকি পুরো অঞ্চলজুড়ে উত্তেজনা বাড়িয়ে দিয়েছে।
তেহরান এবং মার্কিন বিমানবাহিনী—উভয়ই হরমুজ প্রণালীর কাছে সামরিক মহড়ার ঘোষণা দিয়েছে। একই সঙ্গে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস সতর্ক করে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি কোনো হামলায় প্রতিবেশী দেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে, তাহলে সেই দেশগুলোকে 'শত্রু' হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
গত জুনে মাসে পারমাণবিক স্থাপনায় বোমা হামলার প্রতিক্রিয়ায় তেহরান কাতারে অবস্থিত আল উদেইদ বিমানঘাঁটিতে মোতায়েন করা মার্কিন বাহিনীর ওপর হামলা চালিয়েছিল।
সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত, যারা উভয়ই মার্কিন বাহিনীকে আতিথ্য দেয়, তারা ইঙ্গিত দিয়েছে যে তারা কোনো হামলার জন্য তাদের আকাশসীমা ব্যবহার করতে দেবে না।
মিশরের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বুধবার জানিয়েছে, তাদের শীর্ষ কূটনীতিক বদর আবদেলাতি 'অঞ্চলটি যাতে নতুন করে অস্থিতিশীলতার আবর্তে না পড়ে, সেই লক্ষ্যে শান্ত অবস্থা বজায় রাখতে' আরাগচি এবং উইটকফের সাথে আলাদাভাবে কথা বলেছেন।
তবে কাতার বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হায়াজনেহ বলেন, উত্তেজনা কমানোর জন্য আঞ্চলিক পক্ষগুলোর এই আহ্বান ইরানের ওপর হামলা চালানো হবে কি না—সেই মার্কিন সিদ্ধান্তে বড় কোনো ভূমিকা রাখার সম্ভাবনা কম।
তিনি বলেন, 'ট্রাম্প আসলে আঞ্চলিক পক্ষগুলোর কথা খুব একটা গায়ে মাখেন না। দিনশেষে, তিনি নিজের মনের কথাই শোনেন।'
