ওষুধের ট্রায়াল, নিয়ন্ত্রক অনুমোদন দ্রুত করতে এআইয়ের দিকে ঝুঁকছে প্রস্তুতকারকরা
নতুন ওষুধ আবিষ্কারের সবচেয়ে কঠিন ধাপ—যে ধাপে একেবারে নতুন অণু (মলিকিউল) খুঁজে বের করে বড় ধরনের চিকিৎসা অগ্রগতি আনা হয়—সে ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এখনো প্রত্যাশিত সাফল্য দিতে পারেনি। তবে শিল্পসংশ্লিষ্ট নির্বাহীদের মতে, ওষুধ উন্নয়ন প্রক্রিয়ার তুলনামূলক কম আলোচিত কিন্তু সময়সাপেক্ষ অংশগুলোকে ইতোমধ্যে অনেক সহজ ও দ্রুত করে তুলছে এআই।
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত জেপি মরগান হেলথকেয়ার কনফারেন্সে সাতটি বড় ওষুধ কোম্পানি ও ছয়টি ছোট বায়োটেক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা জানান, এআই এখন ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের জন্য অংশগ্রহণকারী, ট্রায়াল সাইট নির্বাচন এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার জন্য প্রয়োজনীয় নথিপত্র তৈরিতে সহায়তা করছে। এর ফলে শ্রমঘন এই প্রক্রিয়াগুলোতে কয়েক সপ্তাহ সময় সাশ্রয় হচ্ছে।
ওষুধ কোম্পানিগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, একটি নতুন ওষুধ বাজারে আনতে সাধারণত প্রায় এক দশক সময় এবং প্রায় ২০০ কোটি ডলার ব্যয় হয়। এনভিডিয়ার মতো শীর্ষস্থানীয় চিপ নির্মাতার সঙ্গে অংশীদারিত্বে থাকা এলি লিলিসহ বহু ফার্মাসিউটিক্যাল প্রতিষ্ঠান আশা করছে, এআই নতুন ওষুধের সাফল্যের হারও বাড়াতে পারবে।
অন্যান্য শিল্পখাতের মতোই, ইন্টারনেটের পর সবচেয়ে বড় প্রযুক্তিগত পরিবর্তন হিসেবে বিবেচিত এআইয়ের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে ওষুধ কোম্পানিগুলো একের পর এক চুক্তি ঘোষণা করছে।
পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ম্যাককিনসি গত বছর পূর্বাভাস দিয়েছিল, স্বল্প মানবীয় হস্তক্ষেপে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করতে সক্ষম 'এজেন্টিক এআই' আগামী পাঁচ বছরে ক্লিনিক্যাল ডেভেলপমেন্টের উৎপাদনশীলতা প্রায় ৩৫ থেকে ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়াতে পারে।
ইসরায়েলভিত্তিক তেভা ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ জানিয়েছে, নতুন ওষুধ সফলভাবে বাজারে আনার মূল লক্ষ্যে মনোযোগ দিতে তারা বিভিন্নভাবে এআই ব্যবহার করছে।
তেভার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রিচার্ড ফ্রান্সিস বলেন, "এর চারপাশে থাকা সবকিছু যতটা সম্ভব দক্ষ ও ছোট পরিসরের হতে হবে। এখানেই এআই ডিজিটালাইজেশন, আধুনিকীকরণ ও প্রক্রিয়া উন্নয়ন—এই তথাকথিত কম আকর্ষণীয় বিষয়গুলো, যেগুলো নিয়ে আমরা ওষুধ শিল্পসংশ্লিষ্টরা আসলে বেশ উচ্ছ্বসিত—বড় পার্থক্য গড়ে দেয়।"
হাজার হাজার নথিপত্র
বিশ্বের বড় ওষুধ কোম্পানি অ্যাস্ট্রাজেনেকা, রোশ ও ফাইজারের পাশাপাশি স্পাইর ও নিউভ্যালেন্টের মতো তুলনামূলক ছোট বায়োটেক প্রতিষ্ঠানের নির্বাহীরা জানান, নিয়ন্ত্রক সংস্থার জন্য তাদের হাজার হাজার পৃষ্ঠার নথিপত্র সামলাতে হয়। এর মধ্যে ক্লিনিক্যাল, নিরাপত্তা ও উৎপাদন–সংক্রান্ত রেকর্ড অন্তর্ভুক্ত থাকে।
অ্যাস্ট্রাজেনেকার প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা (সিএফও) আরাধনা সারিন বলেন, এসব নথি একত্র করা, পরস্পরের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা এবং বিভিন্ন দেশ বা অঞ্চলে একই রকমভাবে উপস্থাপন করা অত্যন্ত জটিল কাজ, যার জন্য অনেক সময় ব্যয়বহুল বহিরাগত ঠিকাদারের সহায়তা নিতে হয়।
ভেঞ্চার ক্যাপিটাল প্রতিষ্ঠান আন্দ্রিসেন হরোউইটজের জেনারেল পার্টনার জর্জে কন্ডে ওষুধ উন্নয়নের এই ধাপকে "অগোছালো মধ্যভাগ" বলে আখ্যা দেন। এর সমাধানে তিনি বিনিয়োগ করছেন। এ লক্ষ্যে তিনি স্টার্টআপ অ্যালিভিয়েট হেলথে ৪৩ লাখ ডলার বিনিয়োগ করেছেন।
কন্ডে ট্রায়াল এনরোলমেন্টকে একটি "ছিদ্রযুক্ত ফানেল" হিসেবে বর্ণনা করেন, যেখানে অংশগ্রহণকারীরা ধাপে ধাপে ঝরে পড়ে। তাঁর মতে, অ্যালিভিয়েট এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে রোগী যোগাযোগ, সচেতনতা, স্ক্রিনিং ও সময়সূচি নির্ধারণে সহায়তা করতে পারে।
টিডি কাউয়েনের বিশ্লেষক ব্রেন্ডন স্মিথ বলেন, প্রশাসনিক কাজে—মাইক্রোসফট কপাইলটের মতো বড় ভাষাভিত্তিক মডেলসহ—এআইয়ের ব্যবহার ওষুধ শিল্পে এখন বেশ সাধারণ ঘটনা হয়ে উঠেছে।
তবে এআই আসলে কতটা দ্রুত ওষুধ উন্নয়ন প্রক্রিয়া এগিয়ে নিচ্ছে, তা বিনিয়োগকারীরা পরিমাপ করতে আরও এক থেকে তিন বছর সময় লাগতে পারে বলে তিনি মনে করেন। সাশ্রয়ের পরিমাণ নির্ণয় করা কঠিন, কারণ তা নির্ভর করে এআই টুল কোথায় ও কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে তার ওপর।
হৃদরোগের ওষুধে নোভার্টিসের এআই ব্যবহার
সুইস ওষুধ প্রস্তুতকারক নোভার্টিস ২০২৩ সালে এআইয়ের সাহায্য নেয়, যখন তারা কোলেস্টেরল কমানোর ওষুধ লেকভিওর জন্য ১৪ হাজার রোগী নিয়ে একটি বড় পরিসরের, শেষ ধাপের হৃদ্রোগ–সংক্রান্ত ট্রায়াল শুরু করছিল বলে জানান প্রতিষ্ঠানটির প্রধান চিকিৎসা কর্মকর্তা শ্রীরাম আরাধ্যে।
সাধারণত চার থেকে ছয় সপ্তাহ সময় লাগা ট্রায়াল সাইট নির্বাচন প্রক্রিয়া এআইয়ের সাহায্যে মাত্র দুই ঘণ্টার একটি বৈঠকে সম্পন্ন হয়, কারণ এআই উচ্চ কার্যক্ষমতাসম্পন্ন সাইট চিহ্নিত করতে সহায়তা করে। এর ফলে নির্ধারিত লক্ষ্যের মাত্র ১৩ জন বেশি রোগী নিয়েই অংশগ্রহণকারীদের নিবন্ধন শেষ করতে পেরেছে নোভার্টিস, বলেন আরাধ্যে।
তিনি যোগ করেন, "এআই এখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নয়, বরং সহায়ক বুদ্ধিমত্তা হিসেবে কাজ করছে।"
নোভার্টিসের এক মুখপাত্র বলেন, এআই ব্যবহারে যে সময় সাশ্রয় হচ্ছে, তা পুরো ওষুধ উন্নয়ন কর্মসূচিতে যোগ করলে কয়েক মাস পর্যন্ত গড়াতে পারে।
জিএসকে, জেনম্যাব ও আইটিএমের সাশ্রয় পরিকল্পনা
ব্রিটিশ ওষুধ প্রস্তুতকারক জিএসকে জানিয়েছে, তারা ডিজিটাল ও এআই টুলের সমন্বয়ে হাতে–কলমে ডেটা সংগ্রহ ও একত্র করার কাজ কমাচ্ছে এবং ট্রায়াল এনরোলমেন্ট দ্রুত করছে। এভাবে সব ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল ১৫ শতাংশ দ্রুত শেষ করার লক্ষ্য নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
জিএসকের এক মুখপাত্রের মতে, এর ফলে গত বছর হাঁপানির ওষুধ এক্সডেনসুরের শেষ ধাপের গবেষণায় প্রায় ৮০ লাখ পাউন্ড (প্রায় ১ কোটি ৮৭ লাখ ডলার) সাশ্রয় হয়েছে। ওষুধটি গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রে অনুমোদন পেয়েছে।
ডেনমার্কভিত্তিক অ্যান্টিবডি উন্নয়নকারী জেনম্যাব জানিয়েছে, তারা ক্লিনিক্যাল উন্নয়নের অগ্রাধিকারগুলোতে সহায়তার জন্য অ্যানথ্রোপিকের ক্লড চ্যাটবট–চালিত এজেন্টিক এআই ব্যবহারের পরিকল্পনা করছে।
জেনম্যাবের এআই প্রধান হিশাম হামাদেহ বলেন, ট্রায়াল–পরবর্তী কাজ—ডেটা বিশ্লেষণ এবং সেগুলোকে গ্রাফ, টেবিল, চিত্র ও ক্লিনিক্যাল স্টাডি রিপোর্টে রূপান্তর—স্বয়ংক্রিয় করাই তাদের লক্ষ্য।
জার্মান রেডিওফার্মাসিউটিক্যালস প্রতিষ্ঠান আইটিএম রয়টার্সকে জানিয়েছে, তারা এআই ব্যবহার করে দীর্ঘ ট্রায়াল রিপোর্টকে যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন–এফডিএর নির্ধারিত টেমপ্লেটে রূপান্তরের উপায় বের করেছে। এতে কয়েকজন কর্মীর কয়েক সপ্তাহের শ্রম বাঁচতে পারে, তবে এখনো এটি পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা হয়নি।
অ্যামজেনের গবেষণা প্রধান জে ব্র্যাডনার বলেন, ওষুধ উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রক নথিপত্র প্রস্তুতের একাধিক ধাপে এআই ইতোমধ্যে কার্যকর ফল দিচ্ছে।
তিনি বলেন, "সবাই যে প্রশ্নটির অপেক্ষায় আছে, তা হলো—এআই দিয়ে তৈরি ওষুধ কবে আসবে? আমি আসলে মনে করি, সেই মলিকিউলগুলো এখনই পাইপলাইনে রয়েছে।"
