সাইবেরিয়ার অরণ্যে এক শতাব্দী: যাদের সময় ভুলে গিয়েছিল—‘পুরোনো বিশ্বাসীরা’
১৯৭৮ সালের গ্রীষ্মে, দক্ষিণ সাইবেরিয়ায় অনুসন্ধানে নামা একদল ভূতত্ত্ববিদ হীরের চেয়েও দুর্লভ এক আবিষ্কার করেছিলেন। পশ্চিম সায়ান পর্বতমালার খাড়া পাহাড় ও বনঘেরা গিরিখাতের মধ্যে হেলিকপ্টার অবতরণের জায়গা খুঁজতে গিয়ে তাঁদের পাইলট হঠাৎ এক দৃশ্য দেখে চমকে ওঠেন—নিকটতম বসতি থেকে প্রায় ১৫০ মাইল দূরে, যেন একটি বাগান। যতটা সম্ভব নিচে নেমে উড়তে গিয়ে তিনি একটি ঘরও দেখতে পান। তখনও কোনো মানুষ চোখে পড়েনি তাদের, কিন্তু বাগানটি যে কেউ না কেউ যত্নে দেখাশোনা করছে, তা স্পষ্ট। দীর্ঘদিন ধরে মানববসতির অনুপযুক্ত বলে বিবেচিত দুর্গম এই এলাকায় একটি বাড়ি দেখে পাইলট ও ভূতত্ত্ববিদেরা বিস্ময়ে হতবাক হয়ে পড়েন।
এরপরে ওই চারজন ভূতত্ত্ববিদ সেখান থেকে ১০ মাইল দূরে তাদের শিবির স্থাপন করেন। কিন্তু, তাঁদের মাথায় ঘুরছিল সেই রহস্যময় বসতবাড়ির কথাই। এখানে কারা থাকে? তাঁরা কি সোভিয়েত যুগের (সরকারপ্রধান তখন ব্রেজনেভ) শেষ আদিবাসী কোনো সম্প্রদায়? কৌতূহল ধীরে ধীরে বাড়ছিল তাদের।
শেষে আর থাকতে না পেরে, ওখানে যাওয়ারই সিদ্ধান্ত নেন তারা। রহস্যময় ওই বাসিন্দাদের জন্য সঙ্গে নেন কিছু উপহার, আর সতর্কতা হিসেবে সাথে রাখেন একটি পিস্তল।
সেখানে যাওয়ার পর রুশ ভূতত্ত্ববিদদের অভ্যর্থনা করেন চটের পোশাক পরা এক বয়স্ক, আগোছালো চেহারার ব্যক্তি। তার কাপড়ের ছত্রে ছত্রে অসংখ্য জোড়াতালি। ইনি ছিলেন কার্প ওসিপোভিচ লাইকভ, পরিবারটির কর্তা। ছোট, অন্ধকার কুঁড়েঘরের ভেতরে পাওয়া যায় তাঁর দুই প্রাপ্তবয়স্ক কন্যা নাতালিয়া ও আগাফিয়াকে—তাঁরা প্রার্থনায় মগ্ন ছিলেন আর কাঁদছিলেন। চার মাইল দূরে নদীর ধারে থাকতেন কার্পের দুই মধ্যবয়সী পুত্র—সাভিন ও দিমিত্রি। দ্রুতই জানা যায়, এই বৃদ্ধের পরিবারের কেউই গত কয়েক দশক ধরে বাইরের জগতের মানুষের সংস্পর্শে আসেননি।
রুটি কী জিনিস—লাইকভ পরিবারের কোনো সন্তানই দেখেনি। ভূতত্ত্ববিদেরা যখন তাদের পাউরুটি আর কিছু জ্যাম দেন, তাঁরা তা নিতে অস্বীকৃতি জানান। "আমাদের এটা খাওয়ার অনুমতি নেই," —পরে এই বাক্যটি ভূতত্ত্ববিদরা আরও অনেকবার শোনেন। নাতালিয়া ও আগাফিয়ার কথা বোঝা ছিল কঠিন, সেটা শুধু তাদের দুর্বোধ্য শব্দভাণ্ডারের কারণে নয়, বরং অদ্ভুত এক গীত গাইবার ভঙ্গিতে কথা বলত তারা; পড়ে এক ভূতত্ত্ববিদ একে বর্ণনা করেন "ধীর, ঝাপসা কোকিলধ্বনির মতো"।
লাইকভরা ছিলেন 'ওল্ড বিলিভার'—অর্থডক্স খৃষ্টানদের এক বিভক্ত সম্প্রদায়ের সদস্য, যাদের ইতিহাস রাশিয়ার অরণ্য ও গ্রামীণ জনপদের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। ১৭শ শতকের মাঝামাঝি, রুশ অর্থডক্স চার্চের প্রধান প্যাট্রিয়ার্ক নিকন গ্রিক অর্থডক্স রীতির সঙ্গে মিল আনতে ধর্মীয় আচার সংস্কার করেন। এতে 'যিশু' শব্দের বানান বদলানো হয়—এবং ক্রুশচিহ্ন আঁকার সময় দুই আঙুলের বদলে তিন আঙুল ব্যবহারের নিয়ম চালু হয়।
এই সংস্কার যারা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, তাঁরাই পরিচিত হন 'ওল্ড বিলিভার' বা আদি বিশ্বাসী নামে। দ্রুতই বহু শাখায় বিভক্ত এই বিদ্রোহীদের কাছে নিকনের সংস্কার ছিল অগ্রহণযোগ্য।
ধর্মীয় এই বিভেদের শুরুর দিকে, ওল্ড বিলিভারদের জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়, নির্যাতন করা হয় ও কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়। অনেককে গর্ত খুঁড়ে তাতে নিক্ষেপ করা হয়েছিল। তাঁদের বিশ্বাস ছিল, ঈশ্বরের সত্য বাণী রক্ষার এক মহাভার তাঁদের কাঁধে—আর সেই দায়িত্ববোধই তাঁদের চরম জীবনযাপনকে আকার দিয়েছিল। পৃথিবী যখন পাপে নিমজ্জিত, তাঁরা তখন নিজেদের পবিত্রতা রক্ষা করতেন। পৃথিবীর শেষের অপেক্ষায় তাঁরা খাদ্য, পোশাক, দৈনন্দিন আচরণ ও নতুন প্রযুক্তি গ্রহণে কঠোর বিধি মানতেন। কেউ কেউ আত্মদাহ পর্যন্ত করেছিলেন; এমনকী কিছু এলাকায় গোটা সম্প্রদায় নিজেদের গির্জায় তালা দিয়ে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল।
১৯শ শতকে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের আবারও মূল ধারায় ফিরতে বাধ্য করতে চেষ্টা হয়। কিন্তু, ততদিনে ওল্ড বিলিভারদের হারানো অতীত সংরক্ষণের সক্ষমতা নিয়ে এক নস্টালজিক মোহও জন্ম নেয় জনমনে। সে সময়ের জনপ্রিয় ও প্রভাবশালী উপন্যাস 'ইন দ্য ফরেস্টস' -এ পাভেল মেলনিকভ-পেচেরস্কি এই আদি বিশ্বাসীদের নিয়ে যেভাবে লিখেছেন– তা ছিল সাহিত্যের মাধ্যমে এক স্মৃতিস্তম্ভ রচনা। এই উপন্যাস ছিল ওল্ড বিলিভারদের নৃতাত্ত্বিক বিবরণ আর স্থানীয় উদ্ভিদ-প্রাণীর তালিকা দিয়ে ভরা। অনেক উদ্ভিদের নাম ছিল খুবই কাব্যিক রূপকে উচ্চারিত। যেমন সাদা মোছওয়ালা, তারা গলা লতা ইত্যাদি।
তবে পরিহাস এই যে, ওল্ড বিলিভারদের সবচেয়ে বিখ্যাত কথাসাহিত্যিক ইতিহাসকার নিজেই ছিলেন তাদের নিয়ে তদন্তকারী এক আমলা। নিঝনি নভগোরোদের ভোলগা তীরে তিনি ধর্মান্তরের লক্ষ্যেই তাদের ওপর অধ্যয়ন করতেন। শুরুতে এই সম্প্রদায় তাঁকে ঘৃণা করত—পরিদর্শন, তল্লাশি, গ্রেপ্তার ও জোরপূর্বক ধর্মান্তরের জন্য। তাদের লোককথায় তিনি শয়তানের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ এক চরিত্র হয়ে ওঠেন। কিন্তু ১৮৫০-এর দশকের শেষে তিনি অবস্থান বদলে নিপীড়ন বন্ধের পক্ষে আওয়াজ তোলেন।
মেলনিকভের সাহিত্যে অরণ্য হয়ে ওঠে পবিত্র নিরাপত্তার কালহীন ক্ষেত্র। এক দৃশ্যে সলোভকি মঠের সন্ন্যাসীদের এক ভাসমান আইকন অরণ্যে পথ দেখায়। সাইবেরিয়ার শঙ্কুবনে ভরা তাইগা হয়ে ওঠে প্রতিশ্রুত ভূমির রুশ রূপ। তিনি কিতেজ শহরের মিথের সঙ্গেও ওল্ড বিলিভারদের যুক্ত করেন—যেখানে ঈশ্বরীয় ডুবনে শহর রক্ষা পায়। তেমনি ওল্ড বিলিভাররা অরণ্যে অপেক্ষা করত পৃথিবীর শেষ আর স্বর্গরাজ্যের আগমনের।
১৯০৫ সালে জার দ্বিতীয় নিকোলাস সংখ্যালঘুদের ওপর ধর্মীয় নিপীড়ন বন্ধ করেন। কিন্তু বলশেভিকরা ক্ষমতায় এসে রাষ্ট্রীয়ভাবে নাস্তিকতা চাপালে ওল্ড বিলিভারদের বহু সম্প্রদায় আরও গভীর অরণ্যে সরে যায়।
১৯২০-এর দশক পর্যন্ত কার্পের পরিবার আলতাই অঞ্চলের এক প্রত্যন্ত গ্রামে শান্তিতে ছিল। চীন ও মঙ্গোলিয়া সীমান্তঘেঁষা এই পাহাড়ি বনভূমি কর্তৃপক্ষের খবরদারি এড়াতে চাওয়া মানুষের কাছে প্রিয় বাসভূমি ছিল। বাগান, ফসল, গোচারণ, শিকার ও মাছধরাই ছিল তাঁদের ভরসা। মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে তারা লবণ ও লোহা পেতেন। কিন্তু পরিবেশ ছিল স্যাঁতসেঁতে, কুয়াশাচ্ছন্ন—আর নতুন সরকার ওল্ড বিলিভারদের তালিকা করছে এমন গুঞ্জনও ছিল।
এই ভয়ে তারা আরও উজানে সরে যান। কিন্তু সেখানেও টেকা যায়নি বেশিদিন। ১৯৩২ সালে সেখানে প্রকৃতি সংরক্ষণ এলাকা হলে শিকার নিষিদ্ধ হয়। সরকারের কাজের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলে এলাকা ছাড়তে বলা হয়। ১৯৩৪-এ কর্তৃপক্ষের চাপ বেড়ে গেলে আবারও পাততাড়ি গোটাতে হয়।
ক্রমবর্ধমান সহিংস কর্তৃপক্ষের হাত থেকে বাঁচতে অরণ্যই ছিল সবচেয়ে কার্প পরিবারের নিরাপদ আশ্রয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তাদের নিশ্চিহ্ন করার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বনে তল্লাশি করেও তাদের আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।
১৯৭৮-এর আগে ১৯৫৮ সালে পর্যটকদের একবারই দেখা পেয়েছিল পরিবারটি। ১৯৬১-এর দেরি করে আসা তুষারপাতে দুর্ভিক্ষের মুখে পড়েন তারা। এসময় পরিবারের কর্ত্রী ও কার্প লিয়াকভের স্ত্রী আকুলিনা অনাহারে মারা যান। খাদ্যাভাবের সময়টা তারা পার করেছেন খর, যবের দানা, গাছে শেকড়, বাকল সেদ্ধ করে খেয়ে। এমনকী এক পর্যায়ে চামড়ার জুতোও উঠেছিল খাদ্যের তালিকায়। যবের সব দানাই খেয়েছিল পরিবারটি, কিন্তু কোনোভাবে বাইরে পড়েছিল একটা দানা, সেখান থেকে পরের মৌসুমে বরফ গলে একটি শীষ গজালে, তারা এটিকে ঈশ্বরের অলৌকিক দান হিসেবেই দেখেন, এবং স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।
সোভিয়েত আমলে যখন তার পরিবারের সন্ধান পান রুশ ভূতত্ত্ববিদেরা তখনও কার্প তাঁরা জার পিটারকে দায়ী করতেন। পিটারকে কার্প বলতেন "মানবদেহে খ্রিস্টবিরোধী"। এমনকি বিশ্বযুদ্ধের দায়ও তাঁর ঘাড়ে চাপাতেন।
আগাফিয়া কখনো চাকা দেখেনি। আগুন জ্বালাতেন টিন্ডারবক্সে। বার্চ গাছের বাকলে তৈরি জুতা পরতো সবাই। খাবার খেতো নুন ছাড়াই। অরণ্যভূমিতে গাজর ফলিয়ে খেত পরিবারটি। কিন্তু, একবার গাজরের বীজ ইঁদুরে খেয়ে ফেললে পরে ভূতত্ত্ববিদদের দেওয়া বীজে ক্যারোটিন ঘাটতি কাটে। আলু, পাইন বাদাম, শালগম, পেঁয়াজ, মটর, রাই—এই ছিল খাদ্য। আলুকে একসময় 'শয়তানি উদ্ভিদ' ভাবলেও পরে তারা এটিকে গ্রহণ করেন।
সময় গড়াতে তাইগা বনই ক্যালরির প্রধান উৎস হয়ে ওঠে। কারণ পরিবারটি তাদের প্রাচীন কৃষিপদ্ধতি ছেড়ে গ্রহণ করেছিল নিওলিথিক যুগের শিকারী ও খাদ্য সংগ্রাহক মানুষের জীবিকা। তাইগার বনভূমি থেকে সংগ্রহ করা বার্চ গাছের বাকলের রস, মাশরুম, নানান রকম বন্য বেরি ফল, বুনো পেঁয়াজ, মাছ খেত তারা।
দিমিত্রি পরিবারের প্রথম সদস্য হিসেবে একদিন একটি সাইবেরিয় হরিণ শিকার করে আনেন বাড়িতে। নতুন শিকারের মাংসের সাথে পোশাক আর জুতো তৈরির নতুন চামড়ারও জোগান হয় এভাবে।
তিনি ছিলেন শ্রেষ্ঠ ট্র্যাকার—তুষারে খালি পায়ে হাঁটতেন, শীতে বনেই ঘুমাতেন। বনের প্রাণীদের খবরাখবর সব ছিল তার নখদর্পণে, আর বাড়িতে এসে সবাইকে সেগুলোই শোনাতেন। কোথায় কোন কাঠবেড়ালি পরিবারসহ বাসা বেধেছে, কোথায় বুনো তিতিররা শীতের প্রকোপ থেকে বাচতে জড়ো হয়েছে, সব বলতেন তিনি। এমনকি তাদের বাড়ির কাছাকাছি আস্তানা গড়া এক ভালুকের সাথেও নাকি দিমিত্রির ভারী দোস্তি হয়েছিল। বাইরের দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন কার্প পরিবারের কাছে এই গল্পগুলোই ছিল দৈনিক সংবাদের বিকল্প।
দিমিত্রি নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়েও চিকিৎসা নেননি। ১৯৮১ সালে দিমিত্রি, সাভিন ও নাতালিয়া মারা যান। অবশিষ্ট থাকেন কার্প ও আগাফিয়া।
কার্পের মৃত্যুর পরও আগাফিয়া তাইগাতেই থাকেন। সাংবাদিক ভাসিলি পেসকভ তাঁদের কাহিনি জনপ্রিয় করেন। ১৯৯০-এর দশকে তাঁরা যেন জীবন্ত জাদুঘর। সহায়তা বাড়ে, নিয়ম শিথিল হয়।
কার্প চেয়েছিলেন আগাফিয়ার সঙ্গে থাকার জন্য কোনো স্বামী বা অন্তত একজন সঙ্গী খুঁজে দিতে। অবশ্য আগাফিয়া কিছুদিন আনন্দের সঙ্গেই কাটিয়েছিলেন তাঁর খালাদের সঙ্গে; তারা তাঁকে তাদের গ্রামে স্থায়ীভাবে থাকার আমন্ত্রণও জানিয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আগাফিয়া তাইগায় বাবার কাছেই ফিরে যান এবং তাঁর মৃত্যুর পরও সেখানেই থেকে যান। এক দূরসম্পর্কের এক চাচাতো ভাই কিছুদিন তাঁর সঙ্গে বসবাস করতে আসেন, পরে তাদের বিয়ে হয়—পুরোহিতবিহীন ওল্ড বিলিভারদের মধ্যে বিয়ে পুরোপুরি স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক ইচ্ছা ও সম্মতির ভিত্তিতেই সম্পন্ন হয়।
তবে এক সময় তাদের মধ্যে তীব্র বিরোধ বাধে একটি বন্ধুসুলভ নেকড়েকে হত্যা করা হবে কি না, তা নিয়ে; ওই নেকড়েটি আগাফিয়ার কুকুরের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তুলেছিল। আগাফিয়ার মতে, নেকড়েটি কোনো হুমকি ছিল না, কিন্তু তাঁর স্বামী তা মানতে রাজি হননি। অচিরেই তিনি শহরে ফিরে চলে যান।
লাইকভ পরিবার রুশ জনমানসে এক অশেষ কৌতূহল ও মোহের উৎসে পরিণত হয়েছিল। তারা যেন ছিল জীবন্ত, মাটিচাপা দেওয়া ধন—একটি টাইম ক্যাপসুল, রাশিয়ার 'রিপ ভ্যান উইঙ্কল', বহু আগেই হারিয়ে যাওয়া এক রাশিয়ার জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। লাইকভরা স্তালিনের শুদ্ধি অভিযান এড়াতে পেরেছিল এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধও তাদের জীবনে খুব একটা ছাপ ফেলেনি। তবে একই সঙ্গে তাদের অনাহারের অভিজ্ঞতা সোভিয়েত ইতিহাসের সবচেয়ে বেদনাদায়ক অধ্যায়গুলোর সঙ্গে গভীরভাবে মিলে যায়।
স্তালিনের কৃষি সমবায়ীকরণ নীতির সময় লাখ লাখ কৃষক পরিবার অনাহারে মারা গিয়েছিল। যুদ্ধকালে লেনিনগ্রাদের অবরোধে পুরো একটি শহর টিকে থাকার জন্য জুতার চামড়া সেদ্ধ করে খেতে বাধ্য হয়েছিল। এর চেয়ে কম নাটকীয় খাদ্যসংকটও সোভিয়েত সংবাদপত্রের প্রায় সব পাঠকের কাছেই পরিচিত ছিল। সোভিয়েত সরকার কখনোই পর্যাপ্ত ও মানসম্মত খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারেনি, আর ১৯৮০–এর দশকের দ্বিতীয়ার্ধে আবারও রেশন কার্ড চালু করা হয়।
আগাফিয়া ও তাঁর বাবা বয়সের ভারে নুয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে একা একা টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে ওঠে। পেসকভ, ভূতত্ত্ববিদেরা এবং এর মাধ্যমে সারা রাশিয়াজুড়ে থাকা অসংখ্য অনুরাগীর কাছে সহায়তা চাওয়ার ব্যাপারে লাইকভরা ক্রমেই সাহসী হয়ে ওঠে। তারা নিজেদের পুরোনো কড়াকড়ি নিয়ম কিছুটা শিথিল করে—উপহার পাওয়া পোশাক পরতে শুরু করে (তবে কেবল একেবারে নতুন হলে; ব্যবহৃত পোশাক তারা নিত না, কারণ দূষণের ভয় ওল্ড বিলিভারদের বিশ্বাসের অংশ)। একপর্যায়ে তারা মোমবাতির বদলে টর্চলাইট ব্যবহার করতে শেখেন,মাংস কিমা করার যন্ত্রও বসায়। উজ্জ্বল রঙের বেরি আঁকা এনামেল করা হাঁড়িপাতিলও ব্যবহার শুরু করে।
১৯৯০–এর দশকে এসে লাইকভরা যেন এক জীবন্ত জাদুঘরের প্রদর্শনীতে পরিণত হয়, অথবা সার্কাসের নাচের ভালুককে যেমন করে সংরক্ষিত বনে স্থানান্তর করা হয়, তেমন এক অবস্থায়। বাইরের জগতের লাগাতার হস্তক্ষেপেই তাদের 'বন্য' জীবনের ভ্রম টিকে ছিল। আগাফিয়ার বন্ধুরা তাঁকে একটি এসওএস যন্ত্রও দেয়, অসুস্থ হলে যাতে হেলিকপ্টার ডাকা যায়। কিন্তু তিনি ধীরে ধীরে সেই সুবিধার অপব্যবহার করতে থাকেন। একসময় তাঁকে বোঝাতে হয়, তাইগায় একটি হেলিকপ্টার পাঠাতে কত বিপুল খরচ হয়। তখন ছিল ১৯৯০–এর দশক—রাশিয়ার অর্থনীতি ধসে পড়েছিল, আর তাঁর এই ছেলেমানুষি আবদার মেটানোর মতো অর্থও আর ছিল না।
লাইকভরা যতই 'গৃহপালিত' হয়ে উঠছিল, রাশিয়ার বড় একটি অংশ ততই সামাজিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতায় আবার জমির দিকে ফিরে যেতে বাধ্য হচ্ছিল। ১৯৮০–এর দশকের দ্বিতীয়ার্ধে প্রেসিডেন্ট গর্বাচেভের পেরেস্ত্রইকা নীতি সদিচ্ছাপূর্ণ হলেও ছিল দুর্বলভাবে পরিকল্পিত। অপরাধী ও তথাকথিত উদ্যোক্তারা—যাদের মধ্যে প্রায়ই তফাত করা যেত না—সরকারি অর্থনৈতিক নীতির স্পষ্ট ত্রুটিগুলো কাজে লাগিয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলো লুটে নিজেদের সম্পদ গড়ে তোলে। জনগণের জন্য খাদ্য জোগানে সরকারের ব্যর্থতা স্বীকার করে গর্বাচেভ 'অ্যালটমেন্ট গার্ডেন' কর্মসূচি সম্প্রসারণ করেন, যাতে ইচ্ছে করলেই যে কেউ নিজের খাবার নিজে ফলাতে পারে।
১৯৯১ সালে ইয়েলৎসিন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট হওয়ার সময় এক নতুন শ্রেণির অত্যন্ত ধনী ও নির্দয় উদ্যোক্তার উত্থান শুরু হয়। ইয়েলৎসিনের নীতিই পরে এই শ্রেণিকে 'অলিগার্ক' হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। মূল্যনিয়ন্ত্রণ তুলে নেওয়ার পর লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধিতে সাধারণ রুশ নাগরিকদের পক্ষে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কেনা অসম্ভব হয়ে পড়ে। প্রতিটি রুশ নাগরিককে ভাউচার দেওয়া হয়, যা ছিল শিগগিরই বেসরকারিকরণ হতে যাওয়া রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে তাদের অংশীদারিত্বের প্রতীক। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ নগদের তীব্র অভাবে বা ভাউচারের প্রকৃত মূল্য না বুঝে—সেগুলো নামমাত্র দামে বিক্রি করে দেয়। শেষ পর্যন্ত বেশির ভাগ ভাউচারই গিয়ে জমা পড়ে সেই প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতেই। ১৯৯০–এর দশকে ওল্ড বিলিভারদের একটি সম্প্রদায় ঘুরে দেখা এক দর্শনার্থী বিস্ময়ের সঙ্গে মন্তব্য করেছিলেন—তাদের একজনও ভাউচার নেয়নি, সবাই তা প্রত্যাখ্যান করেছে। কারণ তারা তখনও বিদ্যুৎ ছাড়াই বাস করত। রাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল না হওয়ায়—রাষ্ট্রের পতনও তাদের স্পর্শ করতে পারেনি। এটিও ছিল লাইকভদের প্রতি মানুষের আকর্ষণের আরেকটি দিক।
১৯৯৫ সালের মধ্যে রুশ সরকারের তহবিল ফুরিয়ে যায় এবং প্রেসিডেন্ট বরিস ইয়েলৎসিনের পুনর্নির্বাচনের জন্য অর্থের প্রয়োজন পড়ে। 'লোনস-ফর-শেয়ারস' প্রকল্পের মাধ্যমে তিনি কার্যত রাশিয়ার সবচেয়ে বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো—তেল ও গ্যাস খাতসহ—বিক্রি করে দেন। এতে অলিগার্কদের অবস্থান পাকাপোক্ত হয়; ইয়েলৎসিনকে দেওয়া তাদের অর্থের বিনিময়ে তারা পায় রাশিয়ার সবচেয়ে মূল্যবান অর্থনৈতিক সম্পদ ও রাষ্ট্রপতির সমর্থন। দেশটিকে যেন টুকরো টুকরো করে বিক্রি করা হচ্ছিল, সাধারণ মানুষের প্রয়োজন ভুলে গিয়ে। ১৯৯৮ সালের অর্থনৈতিক সংকটের পর পুরুষদের গড় আয়ু নেমে আসে মাত্র ৫৮.৯ বছরে,যুদ্ধবিহীন একটি দেশের জন্য যা ছিল নজিরবিহীন। সামাজিক চাপজনিত মৃত্যুহার—হৃদ্রোগ, স্ট্রোক, আত্মহত্যা, খুন, অতিরিক্ত মাদক সেবন, সড়ক দুর্ঘটনা—হঠাৎ বেড়ে যাওয়াই এর কারণ ছিল।
এই সময় মানুষ কীভাবে টিকে ছিল—এ প্রশ্নের উত্তরে প্রায় সবাই একটাই শব্দ বলত: আলু। আত্মীয়, বন্ধু ও প্রতিবেশীদের মধ্যে আলুর বস্তা হাতবদল হতো। খোসাও নষ্ট করা হতো না। ফসল তোলার সময় চোরের হাত থেকে বাঁচাতে মানুষ ক্ষেতের পাশেই ঘুমাত। ২০০৪ সালে নভগোরোদ অঞ্চলের এক বৃদ্ধ আলুর প্রতি রাশিয়ার সম্মিলিত ভালোবাসার প্রকাশ ঘটান, যখন তিনি আলুর একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করেন। তাতে লেখা ছিল—রাশিয়ায় আলু আনার জন্য ক্রিস্টোফার কলম্বাস ও পিটার দ্য গ্রেটকে ধন্যবাদ। প্রতিদিন আলুর জন্য ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানানো লাইকভদের জগৎ তখন বিস্ময়করভাবে সমকালীন বলে মনে হয়।
২০১৩ সালে তাঁর ৭০তম জন্মদিন উপলক্ষে নেওয়া এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে আগাফিয়া লাইকোভার কণ্ঠে তখনও ছিল সামান্য জড়তা, এক ধরনের আনন্দময় অসামঞ্জস্য। তখন হয়তো বিচ্ছিন্নতার চেয়ে দাঁত পড়ে যাওয়াই এর কারণ ছিল বেশি। তাঁর মুখ প্রশস্ত, নাক দৃঢ় ও উঁচু; চোখে ছিল কৌতূহলী, শিশুসুলভ ঝিলিক। কষ্ট ও একাকিত্বে ভরা জীবন সত্ত্বেও তিনি সাক্ষাৎকারে অন্য অনেক সত্তরোর্ধ্ব নারীর চেয়ে বেশি বয়সী মনে হননি, বরং অনেকের চেয়ে বেশি সুখীই লাগছিল। তখনও তিনি স্কি পরে হ্রদের বরফে কাটা গভীর গর্ত থেকে পানি আনতে যেতেন, যেখানে তাঁর বসতির চারপাশের খাড়া ঢালে সারিবদ্ধ লম্বা, সরু কনিফার গাছগুলো প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে থাকত।
কিন্তু সময় যত গড়িয়েছে, আগের মতো জীবনযাপন করা তার পক্ষে তত কঠিন হয়ে পড়েছে। এখন যিনি তার দেখভালের দায়িত্বে থাকা পার্ক রেঞ্জার, তাঁর সহায়তায় আগাফিয়া রাশিয়ার শীর্ষস্থানীয় অলিগার্কদের একজন ওলেগ দেরিপাস্কার কাছে নতুন একটি ঘরের আবেদন জানান। ১৯৯০–এর দশকে আগাফিয়ার বসতির কাছাকাছি অঞ্চলের একটি সদ্য বেসরকারিকৃত অ্যালুমিনিয়াম কারখানায় শেয়ার কিনে দেরিপাস্কার সম্পদের ভিত্তি গড়ে ওঠে; পরে সেটিকেই তিনি বিশ্বের সবচেয়ে বড় অ্যালুমিনিয়াম কোম্পানি রুসালে রূপ দেন।
২০২১ সালে দেরিপাস্কার সহায়তায় নির্মিত নতুন কেবিনে আগাফিয়া উঠে আসেন। তিনি পুতিনকে সেখানে আসার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন, যদিও তিনি তা গ্রহণ করেননি। আগাফিয়া কখনো ভাউচার পাননি, কিন্তু বেসরকারিকরণ থেকে তিনি অনেক রুশ নাগরিকের চেয়ে বেশি উপকারই পেয়েছেন। ২০২৩ সালে আঞ্চলিক সংবাদে তাঁর লগ কেবিনে বসে পার্ক রেঞ্জারের কাছ থেকে জন্মদিনের উপহার হিসেবে ধূসর রঙের উলের শাল গ্রহণের একটি ভিডিও প্রচারিত হয়। রাশিয়া তখন আবারও যুদ্ধের মধ্যে ছিল, কিন্তু আগাফিয়া যেন সে বিষয়ে সম্পূর্ণ অচেতন ছিলেন।
২০২৫ সালে বড়দিনের আগের রাতে তীব্র শীতকালীন ঝড় আঘাত হানে। আগাফিয়া অক্ষত ছিলেন, কিন্তু ছুটিতে আসার কথা থাকা অতিথিরা পরিকল্পনা অনুযায়ী উড়তে পারেননি। তবে এর মানে এই নয় যে তিনি উৎসব একা কাটিয়েছেন; এখন মস্কো থেকে আসা এক তরুণ ওল্ড বিলিভার শিক্ষানবিশ তাঁর সহায়তায় রয়েছেন—এই সেবাকে তিনি এক ধরনের আধ্যাত্মিক 'কীর্তি', আত্মত্যাগের পবিত্র কাজ হিসেবে দেখেন। প্রাচীন যুগের সাধুদের মতো একাকী নন, আগাফিয়া ও সেই শিক্ষানবিশের এখন একটি টেলিফোন রয়েছে, যাতে সংবাদমাধ্যম ও উদ্ধারকারী সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ রাখা যায়। সম্প্রতি এক সাবেক আঞ্চলিক গভর্নর অভিযোগ করেছিলেন, হেলিকপ্টারে করে নিত্যপণ্য পৌঁছে দেওয়াসহ আগাফিয়ার দেখভালে রাষ্ট্রের লাখ লাখ রুবল খরচ হচ্ছে এবং জাতীয় উদ্যানে বসবাস করা আইনত অবৈধ। কিন্তু বিপন্ন এক প্রজাতির শেষ প্রতিনিধি, এক জাতীয় সম্পদ হিসেবে আগাফিয়ার অবস্থান এসব আপত্তির ঊর্ধ্বে।
ইউটিউবে আগাফিয়া—যিনি জীবনের বড় অংশ কাটিয়েছেন রুটি বা চাকা না দেখেই—এক বৈপরীত্যপূর্ণ সুপারস্টার। তাঁকে নিয়ে ভিডিওতে মিলিয়ন মিলিয়ন ভিউ হয়। এমনকি তাঁর নামে একটি এআই-তৈরি অ্যাকাউন্টও আছে, যা নিজেকে তাঁর ভিডিও ডায়েরি বলে চালানোর চেষ্টা করে। তাঁর জনপ্রিয়তা প্রমাণ করে বনে-জঙ্গলে আত্মনির্ভর জীবনের মোহ কতটা শক্তিশালী—যদিও তাঁর জীবনের শেষ অধ্যায়গুলোই দেখিয়ে দেয়, তাইগায় একা দীর্ঘদিন টিকে থাকা শেষ পর্যন্ত কেবলই একটি রোমান্টিক কল্পনা।
