‘মোদি ট্রাম্পকে ফোন করেননি বলে বাণিজ্য চুক্তি আটকে গেছে’—মার্কিন বাণিজ্যমন্ত্রীর দাবি নাকচ ভারতের
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ফোন না করায় দুই দেশের মধ্যে প্রস্তাবিত বাণিজ্য চুক্তিটি ভেস্তে গেছে—মার্কিন বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লাটনিকের এমন দাবি নাকচ করেছে ভারত।
গত আগস্টে দুই দেশের আলোচনা থমকে যাওয়ার পর ট্রাম্প ভারতীয় পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেন। এর মধ্যে রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনার জন্য আরোপিত জরিমানাও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
বর্তমানে উভয় পক্ষ ফের চুক্তির বিষয়ে আলোচনা শুরু করলেও এটি কবে নাগাদ চূড়ান্ত রূপ পাবে, সে বিষয়ে কোনো স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়নি। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি অনানুষ্ঠানিক সময়সীমাও পার হয়ে গেছে।
কৃষি খাতসহ আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এখনো উভয় পক্ষের মধ্যে মতপার্থক্য রয়ে গেছে। ওয়াশিংটন ভারতের কৃষি বাজারে আরও বেশি প্রবেশাধিকার চাইলেও দিল্লি তার কৃষকদের স্বার্থ রক্ষায় অনড় অবস্থান নিয়েছে।
তবে লাটনিক দাবি করেছেন, আলোচনার শুরুতে চুক্তিটি প্রায় চূড়ান্ত হয়ে গিয়েছিল।
শুক্রবার প্রকাশিত এক পডকাস্টে লাটনিক বলেন, 'সবকিছু প্রস্তুত ছিল। আমি (ভারতীয় পক্ষকে) বলেছিলাম আপনাদের উচিত মোদিকে দিয়ে প্রেসিডেন্টকে ফোন করানো। তারা কাজটি করতে অস্বস্তি বোধ করছিল, তাই মোদি আর ফোন করেননি।'
লাটনিকের এই মন্তব্যের বিষয়ে হোয়াইট হাউস এখন পর্যন্ত কোনো মন্তব্য করেনি। তবে ভারত শুক্রবার বলেছে, দিল্লি ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার আলোচনার বিষয়ে লাটনিকের বক্তব্য 'সঠিক নয়'।
দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল সাংবাদিকদের বলেন, 'ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র গত বছরের ১৩ ফেব্রুয়ারি থেকেই দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তির লক্ষ্যে আলোচনার বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিল। এরপর থেকে ভারসাম্যপূর্ণ ও পারস্পরিক সুবিধাজনক চুক্তিতে পৌঁছাতে উভয় পক্ষ কয়েক দফা আলোচনা করেছে। বেশ কয়েকবার আমরা চুক্তির খুব কাছাকাছিও পৌঁছেছিলাম।'
তিনি আরও বলেন, গত বছর মোদি ও ট্রাম্পের মধ্যে আটবার ফোনালাপ হয়েছে। সেখানে তাদের 'বিস্তৃত অংশীদারিত্বের বিভিন্ন দিক' নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
ব্যবসায়িক ও প্রযুক্তিবিষয়ক 'অল-ইন পডকাস্ট'-এ আলাপকালে লাটনিক বলেন, ট্রাম্পের চুক্তি করার দর্শন অনেকটা 'সিঁড়ির' মতো—অর্থাৎ 'যে প্রথম ধাপে থাকে, সে-ই সবচেয়ে ভালো সুযোগ পায়'।
তিনি বলেন, ব্রিটেনের পর দ্বিতীয় দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির আলোচনায় বসেছিল ভারত। দিল্লিকে চুক্তি চূড়ান্ত করার জন্য 'তিন শুক্রবার' সময় দিয়েছিল ওয়াশিংটন। লাটনিক বলেন, তার দায়িত্ব ছিল চুক্তির শর্তগুলো নিয়ে আলোচনা করে সব গুছিয়ে রাখা, কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন ট্রাম্প নিজে। আর ভারত ফোন করতে গড়িমসি করায় পুরো চুক্তি প্রক্রিয়াটি সংকটে পড়ে।
তিনি আরও বলেন, এর পরপরই ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনামসহ অন্যান্য দেশের সাথে বেশ কিছু চুক্তি সম্পন্ন করে যুক্তরাষ্ট্র।
লাটনিক বলেন, পরে ভারত যখন প্রাথমিক চুক্তিতে রাজি হওয়ার কথা জানিয়ে ফিরে আসে, ততক্ষণে 'ট্রেন স্টেশন ছেড়ে গেছে'।
তবে ভারত যে চুক্তি হাতছাড়া করেছে বলে লাটনিক দাবি করছেন, সেই চুক্তির শর্তাবলি এখনও অস্পষ্ট। উদাহরণস্বরূপ, কৃষি খাত আলোচনার একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে—ওয়াশিংটন ভারতের কৃষি বাজারে আরও প্রবেশাধিকারের জন্য চাপ দিলেও দিল্লি শুরু থেকেই এর সুরক্ষায় অনড়।
ডিসেম্বরে মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিশন গ্রিয়ার ওয়াশিংটনে সিনেটরদের বলেছিলেন, এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র 'সেরা প্রস্তাব' পেয়েছে ভারতের কাছ থেকে। তবে তিনি ভারতকে 'কঠিন প্রতিপক্ষ' হিসেবেও অভিহিত করেন।
সাম্প্রতিক সময়ে ভারত ও মোদিকে নিয়ে বেশ কিছু মন্তব্য করেছেন ট্রাম্প। এর মধ্যে অন্যতম হলো, দিল্লি যদি রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধ না করে, তবে শুল্ক আরও বাড়ানোর হুঁশিয়ারি।
ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর মস্কো থেকে সস্তায় তেল কেনার পরিমাণ বাড়িয়েছিল ভারত। দিল্লি এই সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলেছিল, তাদের বিশাল জনগোষ্ঠীর জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়টি আগে ভাবতে হবে।
তবে বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্পের শুল্ক কার্যকর হওয়ার পর থেকে ভারতের তেল পরিশোধনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো মস্কো থেকে তেল কেনা কমিয়ে দিয়েছে।
লাটনিকের এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এল, যার দুদিন আগেই মার্কিন সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম জানিয়েছিলেন, ট্রাম্প রাশিয়ার ওপর একটি কঠোর নিষেধাজ্ঞা বিলে 'সবুজ সংকেত' দিয়েছেন। বিলটি কংগ্রেসে পাশ হলে মস্কোর সঙ্গে ব্যবসা করা দেশগুলোর ওপর আরও চড়া হারে সেকেন্ডারি ট্যারিফ ও নিষেধাজ্ঞা আরোপের সুযোগ তৈরি হবে।
শুক্রবার জয়সওয়াল বলেন, ভারত 'প্রস্তাবিত বিল সম্পর্কে অবগত' এবং 'ঘটনাপ্রবাহ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে'। সেই সাথে তিনি দেশের মানুষের জ্বালানি চাহিদার বিষয়ে ভারতের অবস্থান আবারও পুনর্ব্যক্ত করেন।
৫০ শতাংশ শুল্ক থাকা সত্ত্বেও গত নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের পণ্য রপ্তানি আগের বছরের তুলনায় ২২ শতাংশের বেশি বেড়েছে।
তবে এই শুল্কারোপ ও পাল্টাপাল্টি মন্তব্য ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। ট্রাম্পের সঙ্গে মোদির উষ্ণ সম্পর্ক ছিল। প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের শপথ গ্রহণের পর হোয়াইট হাউস সফরকারী প্রথম বিশ্বনেতাদের একজন ছিলেন মোদি।
কিন্তু এরপর থেকে সম্পর্কের অবনতি ঘটতে শুরু করে।
গত বছরের মে মাসে চার দিনের সংঘাতের পর ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি করিয়ে দিয়েছেন বলে ট্রাম্প যে দাবি করেছিলেন, দিল্লি তা বরাবর অস্বীকার করেছে। জুনে ভারত দাবি করেছিল, মোদি ট্রাম্পকে বলেছেন যে কাশ্মীর ইস্যুতে পাকিস্তানের সঙ্গে কোনো তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতা দিল্লি কখনোই মেনে নেবে না।
