থার্টি ফার্স্ট নাইটে সুইজারল্যান্ডের বারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ৪০ জন নিহতের জন্য দায়ী শ্যাম্পেনের স্পার্কলার
থার্টি ফার্স্ট নাইট উদ্যাপনের সময় বুধবার সুইজারল্যান্ডের অভিজাত স্কি রিসোর্ট 'ক্র্যান্স-মন্টানা'র একটি বারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় অন্তত ৪০ জন নিহত এবং ১১৯ জন আহত হওয়ার পর দেশটির কর্তৃপক্ষ তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেছে।
ভ্যালাই ক্যান্টনের অ্যাটর্নি জেনারেল বেয়াত্রিস পিলু এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, আগুনের উৎস নিয়ে একাধিক সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে প্রাথমিকভাবে তদন্তকারীরা ধারণা করছেন, শ্যাম্পেন বোতলের সঙ্গে লাগানো স্পার্কলার ছাদের খুব কাছাকাছি চলে যাওয়ায় আগুনের সূত্রপাত হয়।
তিনি বলেন, 'আমরা কোনো সম্ভাবনাই বাদ দিচ্ছি না। তবে বর্তমানে যে ধারণা সবচেয়ে জোরালো, তা হলো স্পার্কলার থেকেই আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।' ঘটনাস্থল থেকে প্রাথমিক আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
নতুন বছরের প্রথম প্রহরে ঘটে যাওয়া এই দুর্ঘটনাকে সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম ভয়াবহ দুর্ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করছেন সুইস কর্মকর্তারা।
সে রাতের দুটি ছবি বিবিসির হাতে এসেছে। বিবিসি ভেরিফাই নিশ্চিত করেছে, অনলাইনে শেয়ার হওয়া ছবি দুটি সুইজারল্যান্ডের ক্র্যান্স-মন্টানা স্কি রিসোর্টের নাইটক্লাবের ভেতরে তোলা হয়েছে। দাবি করা হচ্ছে, ছবিগুলো নববর্ষের রাতে আগুন লাগার শুরুর সময়ের।
প্রথম ছবিতে দেখা যায়, কয়েকজন মানুষ বোতল উঁচিয়ে ধরেছেন। বোতলগুলোর সঙ্গে জ্বলন্ত স্পার্কলার লাগানো এবং ছাদের ওপর আগুনের মতো কিছু দৃশ্যমান।
এই ছবিটির কোনো পুরোনো সংস্করণ বা আগের কপি পাওয়া যায়নি। তবে ছবির কিছু অংশ—বার, দেয়ালের সাজসজ্জা ও পাইপলাইন—ক্লাবের পুরোনো ছবির সঙ্গে মিল পাওয়া গেছে।
ছবিটি চারটি এআই শনাক্তকরণ টুলে পরীক্ষা করা হয়েছে। কোনো টুলই ছবিটিকে এআই দিয়ে তৈরি বলে চিহ্নিত করেনি, তবে একটি টুল জানিয়েছে ছবিটি এডিট করা হতে পারে। ডিজিটাল ম্যানিপুলেশন শনাক্তকারী টুলে কোনো পরিবর্তনের প্রমাণ মেলেনি।
পুলিশ জানিয়েছে, আহত ১১৯ জনের মধ্যে এখন পর্যন্ত ১১৩ জনের আনুষ্ঠানিক পরিচয় নিশ্চিত করা হয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন— ৭১ জন সুইস, ১৪ জন ফরাসি ও ১১ জন ইতালীয় নাগরিক। এছাড়া সার্বিয়া, বসনিয়া, বেলজিয়াম, লুক্সেমবার্গ, পোল্যান্ড ও পর্তুগালের নাগরিকও আছেন। কয়েকজনের পরিচয় এখনো নিশ্চিত করা যায়নি এবং সংখ্যাগুলো পরিবর্তিত হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন কর্মকর্তারা।
প্রসিকিউটর পিলু বলেন, বদ্ধ স্থানে স্পার্কলার (জন্মদিনের মোমবাতির মতো আতশবাজি) ব্যবহার করা ঠিক ছিল কি না, তা তদন্ত করা হবে।
নিহত ৪০ জনের পরিচয় শনাক্তের কাজ চলছে। সুইস জুডিশিয়াল পুলিশের প্রধান পিয়ের-অঁতোয়ান লঁজঁ এটিকে 'সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার' হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, 'কোনো ভুলের সুযোগ নেই। আমাদের নিশ্চিত করতে হবে, সঠিক মরদেহ সঠিক পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।'
এই কাজে ডিজাস্টার ভিকটিম আইডেন্টিফিকেশন (ডিভিআই) কাঠামো ব্যবহার করা হচ্ছে, যেখানে পুলিশ, ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ, চিকিৎসক ও দন্তচিকিৎসকেরা একসঙ্গে কাজ করছেন।
ভ্যালাই ক্যান্টনের প্রেসিডেন্ট ম্যাথিয়াস রেনার্ড বলেন, উত্তর না পাওয়া প্রতিটি মিনিট নিহত ও নিখোঁজদের স্বজনদের জন্য 'অসহনীয়'। তিনি জানান, উদ্ধার ও চিকিৎসা কার্যক্রমের পাশাপাশি দ্রুত পরিচয় শনাক্তে সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে। ৯ জানুয়ারি ক্র্যান্স-মন্টানায় একটি স্মরণানুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে এবং অনলাইনে একটি শোকবার্তার বই খোলা হবে।
ভ্যালাই হাসপাতালের মহাপরিচালক এরিক বনভ্যাঁ জানান, ঘটনার রাতে গুরুতর আহত ৫৫ জনকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ বাড়ি ফিরেছেন, আবার অনেকে এখনো চিকিৎসাধীন।
চারজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক এবং তারা নিবিড় পরিচর্যায় রয়েছেন। প্রায় ৫০ জন আহতকে ফ্রান্স ও ইতালিসহ অন্যান্য ইউরোপীয় দেশের বিশেষায়িত বার্ন সেন্টারে পাঠানো হয়েছে।
এর আগে জেনেভার এক চিকিৎসক জানান, গুরুতর দগ্ধ রোগীদের মধ্যে ১৫ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীরাও রয়েছে। কর্তৃপক্ষ বলছে, তদন্ত এখনো চলমান এবং কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে সময় লাগবে।
