পরীক্ষার প্রশ্ন এতই কঠিন যে পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন দক্ষিণ কোরিয়ার কর্মকর্তা, আপনি পারবেন উত্তর দিতে?
দৃশ্যটা একবার কল্পনা করুন। আপনি দক্ষিণ কোরিয়ার একজন কিশোর। বসেছেন দেশটির অন্যতম কঠিন এক কলেজ ভর্তি পরীক্ষায়। টানা ৮ ঘণ্টার যুদ্ধ। এই পরীক্ষার জন্য আপনি মাসের পর মাস, হয়তো কয়েক বছর ধরে প্রস্তুতি নিয়েছেন। ইংরেজির প্রশ্নে চোখ রাখতেই দেখলেন এমন এক প্রশ্ন, যা দেখে মাথা চক্কর দেওয়ার জোগাড়!
প্রশ্ন ৩৪: শূন্যস্থান পূরণ করুন
কান্ট আইনের শাসনকে খুব গুরুত্ব দিতেন। তিনি মনে করতেন, এটা শুধু নিরাপত্তা বা শান্তিই দেয় না, স্বাধীনতাও বাঁচিয়ে রাখে। তার বিশ্বাস ছিল, সমাজ ধীরে ধীরে আরও যুক্তিনির্ভর হচ্ছে। আর সমাজকে টিকিয়ে রাখতে দরকার কঠোর আইন। কারণ একমাত্র আইনই পারে মানুষকে মিলেমিশে রাখতে। তবে কান্ট কিন্তু মানুষকে খুব ভালো মনে করতেন না। এদিক থেকে তার সঙ্গে টমাস হবস-এর মিল আছে। হবস ভাবতেন, মানুষের স্বভাবই হলো মারামারি করা। তাই শান্তি রাখতে হলে শক্ত আইন দরকার। মানুষের দয়ার ওপর ভরসা করা বোকামি। একদল 'শয়তান'-কেও যদি আইনের শাসনে রাখা যায়, তারাও শান্তিতে থাকতে পারে। আসল কথা হলো, যুক্তিবাদী মানুষ যে রাজনৈতিক নীতিগুলো নিজের ইচ্ছায় বেছে নিত, আইন হলো তারই রূপ। এখন কথা হলো, আইন যদি মানুষকে এমন কিছু করতে মানা করে—যা তারা এমনিতেও করত না, তবে সেই আইনকে _____________________ চলে না।
ক)স্বাধীনতার লাগাম টানা হচ্ছে বলে মনে করা
খ)বিচার ব্যবস্থার রক্ষাকবচ হিসেবে দেখা
গ)স্বাধীনতার পথে বাধা হিসেবে গণ্য করা
ঘ)খারাপ স্বভাব দমনে কার্যকর ভাবা
ঙ)আদর্শ আইনের কাঠামোর অংশ হিসেবে মেনে নেওয়া
এটা যদি কঠিন মনে হয়, তবে পরের প্রশ্নটা দেখুন।
প্রশ্ন ৩৬: নিচের অংশগুলো সাজিয়ে লিখুন।
আমরা ঘড়ি বলতে সাধারণত দেয়াল ঘড়ি বা হাতঘড়ি বুঝি। কিন্তু ঘড়ি আসলে একটা যন্ত্রের ভেতর চলা প্রক্রিয়া ছাড়া কিছুই নয়। আর এই প্রক্রিয়ার মূল কথা হলো 'পুনরাবৃত্তি' বা বারবার একই কাজ করা।
(A) আসলে, কোনো কিছু বারবার না ঘটলে সেটা দিয়ে ঘড়ি বানানো অসম্ভব। যেমন—দাগ কাটা মোমবাতি। এখানেও কিন্তু মোমের অণুগুলো বারবার পুড়ছে। অর্থাৎ এটাও একটা পুনরাবৃত্তিমূলক প্রক্রিয়া, যদিও প্রথমে তা মনে হয় না।
(B) কার্বন ডেটিং বা পুরোনো জিনিসের বয়স বের করার পদ্ধতিটাও অনেকটা দীর্ঘমেয়াদি ঘড়ির মতো। মনে হতে পারে সময়টা মসৃণভাবে যাচ্ছে। কিন্তু আসলে তা নয়। এখানেও কার্বন-১৪ পরমাণুর ক্ষয় বারবার ঘটে।
(C) আসলে যে প্রক্রিয়ায় বারবার একই ঘটনা ঘটে, তাকেই ঘড়ি বলা যায়। যেমন—জলঘড়িতে ফোঁটা ফোঁটা পানি পড়া কিংবা কোয়ার্টজ ক্রিস্টালের কাঁপুনি।
ক)(A) – (C) – (B)
খ)(B) – (A) – (C)
গ)(B) – (C) – (A)
ঘ)(C) – (A) – (B)
ঙ)(C) – (B) – (A)
সঠিক উত্তর: ৩৪(গ), ৩৬(ঘ)
গত নভেম্বরে দক্ষিণ কোরিয়ার শিক্ষার্থীরা 'সুনেউং' নামের পরীক্ষায় এমনই সব প্রশ্নের মুখে পড়েছিল। প্রশ্ন দেখে এতটাই হইচই শুরু হয় যে, শেষমেশ গত সপ্তাহে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার প্রধানকে পদত্যাগ করতে হয়েছে। দেশটির গণমাধ্যম কেবিএস এ খবর জানিয়েছে।
চলতি মাসের শুরুতে সংস্থাটি আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমাও চেয়েছে। তারা মেনে নিয়েছে, ইংরেজি অংশের প্রশ্ন একটু বেশিই কঠিন হয়ে গেছে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, 'পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকদের উদ্বেগের জন্য আমরা গভীরভাবে দুঃখিত।' ভবিষ্যতে স্কুলের পড়ার সঙ্গে মিল রেখে প্রশ্ন করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে তারা।
কিন্তু এতেও মন গলছে না ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের। তাদের কথা, শুধু ক্ষমা চাইলে তো আর ফলের ক্ষতি পোষাবে না। দক্ষিণ কোরিয়ায় ভালো ভবিষ্যৎ গড়তে হলে এই পরীক্ষায় ভালো করা চাই-ই চাই। ভালো কলেজ বা ভার্সিটিতে ভর্তির এটাই একমাত্র চাবিকাঠি।
পরিসংখ্যান বলছে, ইংরেজি অংশে মাত্র ৩ শতাংশ শিক্ষার্থী সর্বোচ্চ নম্বর পেয়েছে। ২০১৮ সালের পর পাসের হার এতটা নিচে আর নামেনি।
সুনেউং-এর ওয়েবসাইটে 'চই' নামের একজন লিখেছেন, 'কর্তা তো ভুল স্বীকার করে সরে গেলেন। কিন্তু আমরা যারা ভুক্তভোগী, আমাদের কী হবে? এর কোনো বিহিত হবে না?'
আরেকজন লিখেছেন, 'আগামী বছর কী করবেন তা জেনে আমাদের কী লাভ? এবারের ক্ষতি কি তাতে মিটবে?'
'ঘাতক প্রশ্ন' বা কিলার কোয়েশ্চেনস
সুনেউং পরীক্ষাটি এর কঠিন প্রশ্ন আর কিশোর-কিশোরীদের ওপর তীব্র মানসিক চাপের জন্য কুখ্যাত। বাচ্চারা কথা ফোটার আগেই যেন এই প্রতিযোগিতায় নেমে পড়ে। ভালো স্কুলে ভর্তির জন্য অভিভাবকদের দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়ে যায় শিশুকালেই।
স্কুলে ওঠার পর তো কথাই নেই। ক্লাস শেষ করেই ছোটো কোচিং সেন্টারে, যাকে বলা হয় 'হাগওয়ন'। সেখানে পড়াশোনা চলে গভীর রাত পর্যন্ত। পরিবারের লক্ষ্য একটাই—সন্তান যেন সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পায় আর ভালো চাকরি বাগাতে পারে।
শুধু পরিবার নয়, পুরো দেশ এই দিনটি নিয়ে তটস্থ থাকে। গত ১৩ নভেম্বর ৫ লাখের বেশি শিক্ষার্থী পরীক্ষায় বসেছিল। বিশ্বাস করবেন কি না জানি না, পরীক্ষার লিসেনিং বা শ্রুতিলিখন অংশের সময় আধা ঘণ্টা সারা দেশে বিমান চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছিল! যাতে শব্দের কারণে পরীক্ষার্থীদের মনোযোগ না ভাঙে। শেয়ার বাজার খোলা হয় এক ঘণ্টা দেরিতে। আর পরীক্ষার্থীরা যাতে সময়মতো কেন্দ্রে পৌঁছাতে পারে, তার জন্য রাস্তায় রাস্তায় পুলিশ মোতায়েন ছিল।
তবে এই তীব্র প্রতিযোগিতার একটা অন্ধকার দিকও আছে। এতে ধনী-গরিবের বৈষম্য বাড়ে। বড়লোকদের সন্তানরা বেশি সুযোগ-সুবিধা পায়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অবৈধ প্রশ্ন ফাঁসের ব্যবসাও। এ বছর ১২৬ জনকে আটক করেছে পুলিশ।
শিক্ষার্থীদের ওপর এই চাপ মানসিক স্বাস্থ্যের বারোটা বাজিয়ে দিচ্ছে। ২০২০ সালের তথ্যমতে, ওইসিডি দেশগুলোর মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়ায় আত্মহত্যার হার সবচেয়ে বেশি।
এমনকি সন্তান না নেওয়ার পেছনেও এই পরীক্ষার ভূমিকা আছে। পড়াশোনার বিশাল খরচ, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা আর আবাসন সংকটের কারণে দক্ষিণ কোরিয়ানরা এখন আর সন্তান নিতে চাইছে না।
সরকার অবশ্য চেষ্টা করছে কোচিং বাণিজ্য কমাতে। ২০২৩ সালে ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল, সিলেবাসের বাইরের কঠিন সব 'কিলার কোয়েশ্চেন' বাদ দেওয়া হবে। কারণ এতে কোচিং করা ধনী শিক্ষার্থীরা অন্যায্য সুবিধা পায়।
কিন্তু এবারের প্রশ্ন দেখে বোঝা গেল, যা আছে তা-ও কম কঠিন নয়।
ওয়েবসাইটের মন্তব্যের ঘরে 'জং' নামের একজন লিখেছেন, 'রাগে গা জ্বলে যাচ্ছে। বাচ্চাদের জীবন নিয়ে আপনারা আর কত খেলবেন?'
