সংসার সামলানোর স্বীকৃতি, নাকি ভোটের সমীকরণ? ভারতে নারীদের অর্থ সহায়তার নেপথ্যে
ভারতের মধ্যপ্রদেশের একটি গ্রামের বাসিন্দা প্রমিলা। কোনো চাকরি না করলেও প্রতি মাসে তার হাতে আসে নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা। এটি কোনো মজুরিও নয়। এটি হলো সরকারের পক্ষ থেকে বিনা শর্তে দেওয়া এক ধরনের অর্থ সহায়তা বা 'আনকন্ডিশনাল ক্যাশ ট্রান্সফার'।
প্রমিলা জানান, এই অর্থ দিয়ে তিনি ওষুধ, সবজি এবং তার ছেলের স্কুলের ফি পরিশোধ করেন। এই ১,৫০০ রুপি (প্রায় ১৬ ডলার) সামান্য মনে হলেও, এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী—এটি তার জন্য একটি নিশ্চিত আয়, নিজের জীবনের ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং স্বাধীনতার এক নতুন স্বাদ।
সারা ভারতজুড়ে এখন এমন গল্প ক্রমেই সাধারণ হয়ে উঠছে। দেশের ১২টি অঙ্গরাজ্যে প্রায় ১১ কোটি ৮০ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক নারী নিয়মিত এই ধরনের অর্থ সহায়তা পাচ্ছেন। এটি ভারতকে বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম এবং কম আলোচিত সামাজিক-নীতি বা সোশ্যাল পলিসি এক্সপেরিমেন্টের ক্ষেত্র হিসেবে গড়ে তুলেছে।
দীর্ঘদিন ধরে ভারত সরকার শস্য, জ্বালানি এবং গ্রামীণ কর্মসংস্থানে ভর্তুকি দিয়ে আসছে। তবে এখন তারা আরও মৌলিক একটি পদক্ষেপে এগিয়েছে: প্রাপ্তবয়স্ক নারীদের আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে, কারণ তারা পরিবার পরিচালনা করেন, বিনা পারিশ্রমিকে যত্নের বোঝা বহন করেন এবং ভারতের নির্বাচনী ব্যবস্থায় একটি বিশাল ভোট ব্যাংক গঠন করেন।
এ ধরনের প্রণোদনার যোগ্যতার মানদণ্ড রাজ্যভেদে ভিন্ন—কোথাও বয়স বা আয়সীমা আছে, কোথাও সরকারি চাকরিজীবী, করদাতা, গাড়ির মালিক কিংবা বড় জমির মালিকদের বাদ দেওয়া হয়।
কিংস কলেজ লন্ডনের আইন ও সামাজিক ন্যায়বিচার বিষয়ের অধ্যাপক প্রভা কোটিশ্বরন বলেন, 'বিনা শর্তে নগদ অর্থ প্রদান বা আনকন্ডিশনাল ক্যাশ ট্রান্সফার ভারতীয় রাজ্যগুলোর কল্যাণমূলক ব্যবস্থায় নারীদের পক্ষে একটি উল্লেখযোগ্য সম্প্রসারণের ইঙ্গিত দেয়।'
এই সহায়তার পরিমাণ মাসে ১,০০০ থেকে ২,৫০০ রুপি (প্রায় ১,৪০০ থেকে ৩,৫০০ টাকা)। এটি সংসারের মোট আয়ের মাত্র ৫ থেকে ১২ শতাংশের সমান, কিন্তু এটি নিয়মিত পাওয়া যায়। বর্তমানে ভারতে ৩০ কোটি নারীর ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থাকায় প্রশাসনিকভাবে এই টাকা পাঠানোও সহজ হয়েছে।
নারীরা সাধারণত এই টাকা শিশুদের শিক্ষা, মুদি খরচ, রান্নার গ্যাস, চিকিৎসা, জরুরি প্রয়োজন, ছোটখাটো ঋণ শোধ এবং মাঝেমধ্যে নিজের জন্য সোনার গয়না বা শখের জিনিস কিনতে খরচ করেন।
মেক্সিকো, ব্রাজিল বা ইন্দোনেশিয়ায়ও শর্তসাপেক্ষে এমন অর্থ দেওয়া হয়। কিন্তু ভারতের বিষয়টি আলাদা, কারণ এখানে টাকা পেতে কোনো শর্ত মানতে হয় না। শিশু স্কুলে যাক বা না যাক, পরিবার দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকুক বা না থাকুক—নারীরা এই টাকা পাচ্ছেন।
রাজনীতির নতুন হাতিয়ার
২০১৩ সালে গোয়া প্রথম নারীদের জন্য এই অর্থ সহায়তা প্রকল্প চালু করে। এরপর ধারাবাহিকভাবে বিষয়টি আরও গতি পায় ২০২০ সালের ঠিক আগে, যখন উত্তর-পূর্ব ভারতের আসাম ঝুঁকিপূর্ণ নারীদের জন্য এমনই একটি কর্মসূচি চালু করে। এরপর থেকে এই অর্থ সহায়তা একটি রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন রাজ্যের এসব নগদ সহায়তা মূলত প্রাপ্তবয়স্ক নারীদের লক্ষ্য করে চালু হচ্ছে। কয়েকটি রাজ্য নারীদের বিনা পারিশ্রমিকের গার্হস্থ্য ও যত্নমূলক শ্রমকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিচ্ছে। তামিলনাড়ু এই সহায়তাকে 'অধিকার অনুদান' হিসেবে বিবেচনা করেছে। পশ্চিমবঙ্গের প্রকল্পেও একইভাবে নারীদের বিনা পারিশ্রমিকের অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
অন্যান্য রাজ্যে এই স্বীকৃতি আসে পরোক্ষভাবে। নীতিনির্ধারকরা ধারণা করেন, নারীরা এই অর্থ সহায়তা পরিবারের ও গৃহস্থালির কল্যাণেই ব্যয় করবেন—এমনটাই বলছেন বিশেষজ্ঞরা।
নারীদের অর্থনৈতিক ভূমিকায় এই গুরুত্ব রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলেছে। ২০২১ সালে তামিল অভিনেতা থেকে রাজনীতিবিদ বনে যাওয়া কমল হাসান 'গৃহিণীদের জন্য বেতন' দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তার নতুন দল হেরে গেলেও, ২০২৪ সাল নাগাদ মহারাষ্ট্র, ঝাড়খণ্ড, ওড়িশা, হরিয়ানা এবং অন্ধ্রপ্রদেশে নারী-কেন্দ্রিক নগদ অর্থ সহায়তার প্রতিশ্রুতি রাজনৈতিক দলগুলোকে জয় এনে দিয়েছে।
বিহারের সাম্প্রতিক নির্বাচনে নগদ সহায়তার রাজনৈতিক শক্তি স্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়েছে। দেশের দরিদ্রতম এই রাজ্যে ভোটের কয়েক সপ্তাহ আগে সরকার জীবিকা সহায়তা প্রকল্পের অধীনে ৭.৫ মিলিয়ন নারী ব্যাংক হিসাবে ১০ হাজার রুপি করে (১১২ ডলার) পাঠায়। পুরুষের তুলনায় বেশি সংখ্যক নারী ভোট দিয়েছেন, যা নির্বাচনের ফলাফলকে দৃশ্যমানভাবে প্রভাবিত করেছে।
সমালোচকেরা এটিকে 'ভোট কেনার নির্লজ্জ চেষ্টা' বলে মন্তব্য করলেও ফলাফল ছিল পরিষ্কার—নারীরাই বিজেপি নেতৃত্বাধীন জোটকে ভূমিধস জয়ে পৌঁছে দিয়েছেন। অনেকে মনে করেন, এই নগদ সহায়তা ছিল এক ধরনের সংকেত, যা দেখিয়েছে অর্থনৈতিক প্রণোদনা কীভাবে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার হতে পারে।
তবে বিহার কেবল বৃহত্তর ছবির একটি অংশ। সারা ভারতজুড়ে শর্তহীন নগদ সহায়তা এখন নিয়মিতভাবে কোটি কোটি নারীর হাতে পৌঁছাচ্ছে।
শুধু মহারাষ্ট্রেই ২ কোটি ৫০ লাখ নারীর জন্য এই সুবিধার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে; আর ওড়িশার প্রকল্পটি রাজ্যের ৭১% নারী ভোটারের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে।
কিছু নীতিনির্ধারণী মহলে এসব প্রকল্পকে 'ভোট কেনার ফ্রি সুবিধা' হিসেবে ব্যঙ্গ করা হয়। একই সঙ্গে এগুলো রাজ্যের অর্থনীতিতেও চাপ তৈরি করছে—চলতি অর্থবছরে ১২টি রাজ্য এ ধরনের ভাতা বাবদ প্রায় ১৮ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করতে যাচ্ছে।
থিংক-ট্যাংক 'পিআরএস লেজিসলেটিভ রিসার্চ'-এর মতে, এই রাজ্যগুলোর অর্ধেকই রাজস্ব ঘাটতির মুখে পড়েছে।
তবে অনেকে মনে করেন, এর মাধ্যমে নারীবাদীদের দীর্ঘদিনের একটি দাবি ধীরে ধীরে স্বীকৃতি পাচ্ছে। সেটি হলো—নারীর অবৈতনিক গৃহকর্ম ও সেবার অর্থনৈতিক মূল্য। 'টাইম ইউজ সার্ভে ২০২৪' অনুযায়ী, ভারতে নারীরা দিনে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা বিনা পারিশ্রমিকে ঘরের কাজ করেন, যা পুরুষদের তুলনায় তিন গুণেরও বেশি। এই অর্থ সহায়তা অন্তত সেই ভারসাম্যহীনতাকে স্বীকার করে নিচ্ছে।
বাস্তব চিত্র কী বলে?
২০২৫ সালের এক গবেষণায় দেখা যায়, মহারাষ্ট্রে যোগ্য নারীদের ৩০ শতাংশ নানা জটিলতায় নিবন্ধনই করতে পারেননি। তবে যারা নিবন্ধন করেছেন, তাদের প্রায় সবাই নিজেদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নিজেরাই পরিচালনা করছেন।
পশ্চিমবঙ্গে ২০২৩ সালের একটি জরিপে দেখা গেছে, ৯০ শতাংশ নারী নিজেদের অ্যাকাউন্ট নিজেরা চালান এবং ৮৬ শতাংশ নারী টাকা খরচের সিদ্ধান্ত নিজেরাই নেন। তারা মূলত খাবার, শিক্ষা ও চিকিৎসায় এই টাকা খরচ করেন।
অধ্যাপক প্রভা কোটিশ্বরন ও তার সহকর্মীদের গবেষণায় মিশ্র ফলাফল পাওয়া গেছে। আসামে নারীরা এই টাকাকে সম্মানের বিষয় হিসেবে দেখলেও খুব কম সংখ্যকই একে তাদের কাজের স্বীকৃতি মনে করেন। তামিলনাড়ুর নারীরা মানসিক প্রশান্তি ও দাম্পত্য কলহ কমার কথা জানিয়েছেন। কর্ণাটকে নারীরা ভালো খাবার এবং পারিবারিক সিদ্ধান্তে মতামতের সুযোগ পাওয়ার কথা বলেছেন।
অধ্যাপক প্রভা কোটিশ্বরন বলেন, 'প্রমাণ বলছে, নিজেদের ও পরিবারের তাৎক্ষণিক প্রয়োজন মেটাতে এই অর্থ সহায়তা নারীদের জন্য দারুণভাবে উপকারী। এটি সেই নারীদের মর্যাদা ফিরিয়ে দেয়, যারা অন্যথায় প্রতিটি ছোটখাটো খরচের জন্য স্বামীর ওপর নির্ভরশীল।'
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, গবেষণায় এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি যে এই টাকার কারণে নারীরা চাকরি খোঁজা বন্ধ করে দিয়েছেন বা এটি লিঙ্গবৈষম্য বাড়িয়ে দিচ্ছে। বরং এটি নারীদের আর্থিক স্বায়ত্তশাসন এবং দরকষাকষির ক্ষমতা কিছুটা হলেও বাড়িয়েছে।
ভবিষ্যৎ কী?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই প্রকল্পের যোগ্যতার নিয়ম আরও সহজ করা উচিত, বিশেষ করে যারা কঠোর পরিশ্রম করেন তাদের জন্য। টাকা দেওয়ার প্রক্রিয়াটি নিঃশর্ত এবং বৈবাহিক অবস্থার ওপর নির্ভরশীল হওয়া উচিত নয়।
তবে প্রচারণায় নারীর অধিকার এবং অবৈতনিক কাজের মূল্যের ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন। গবেষকদের মতে, নগদ অর্থ কখনোই কর্মসংস্থানের বিকল্প হতে পারে না। অনেক নারী জানিয়েছেন, তারা আসলে এমন কাজ চান যার বিনিময়ে উপযুক্ত পারিশ্রমিক ও সম্মান মিলবে।
অধ্যাপক কোটিশ্বরন বলেন, 'যদি এই নগদ সহায়তার সঙ্গে নারীদের অবৈতনিক কাজের স্বীকৃতির বার্তা স্পষ্টভাবে যোগ করা যায়, তাহলে ভবিষ্যতে যখন আয়ের সুযোগ তৈরি হবে, এটি ঘরের ভেতর-বাইরে কাজের লিঙ্গভিত্তিক বিভাজন ভাঙতে সাহায্য করতে পারে।'
ভারতের এই নিঃশর্ত নগদ সহায়তার নীরব পরিবর্তন এখনো শুরু পর্যায়ে। তবুও এটি দেখাচ্ছে—নিয়মিতভাবে নারীর হাতে পৌঁছানো সামান্য অর্থও সমাজে ক্ষমতার ভারসাম্যে নীরবে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
শেষ পর্যন্ত এটি নারীর ক্ষমতায়নে পরিণত হবে নাকি শুধু রাজনৈতিক সুবিধা অর্জনের আরেকটি কৌশল হয়ে থাকবে—তা নির্ভর করছে ভবিষ্যতে ভারত এই আর্থিক সহায়তাকে ঘিরে কী ধরনের ব্যবস্থা ও নীতি গড়ে তোলে তার ওপর।
